প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

ডাকসু তুমি কার? বদলে যাচ্ছে ভোটের হিসাব

ডেস্ক রিপোর্ট : ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) নিবার্চনে কোটা আন্দোলনকারীদের অংশ নেয়ার আকস্মিক সিদ্ধান্ত এবং প্রয়োজনে জোটবদ্ধ হওয়ার ঘোষণায় রাতারাতি পাল্টে গেছে ছাত্রলীগ ও ছাত্রদলসহ অন্যান্য ছাত্র সংগঠনের ভোটের ছক। বিশেষ করে ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগের ভাতৃপ্রতিম সংগঠন ছাত্রলীগ এতদিন নানা কৌশলে ভোটের মাঠ যেভাবে গুছিয়ে এনেছিল তা অনেকটাই এলোমেলো হয়ে পড়েছে। নিবার্চন সংশ্লিষ্টদের ধারণা, বেগতিক পরিস্থিতিতে কোটা আন্দোলনকারীরা শেষ সময়ে ছাত্রদলের সঙ্গে গাঁটছড়া বঁাধলে নিবার্চনে সহজ জয় পাওয়া দাপুটে ছাত্রলীগের জন্য যথেষ্ট কঠিন হবে।

এমনকি পরিবতির্ত প্রেক্ষাপটে তাদের ভরাডুবিরও আশঙ্কা রয়েছে। কেননা কোটা সংস্কারসহ একাধিক বড় আন্দোলনে সফল হওয়া এ নেতৃত্বে সাধারণ শিক্ষাথীের্দর একটি বড় অংশের নীরব সমথর্ন রয়েছে। তবে ছাত্রলীগ নেতাদের দাবি, কোটা আন্দোলনকারীরা নিবার্চনে অংশ নিলে ছাত্রদল ও বামপন্থি ছাত্র সংগঠনগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হবে। কারণ তাদের সমথর্কদের অনেকেই এখন কোটা আন্দোলনে নেতৃত্বদানকারী বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদের কমীর্ হয়ে গেছে। তাই কোটা আন্দোলনকারীরা নিবার্চনে অংশ নিলে এসব ভোট দু’পক্ষের মধ্যে ভাগাভাগি হবে। যাতে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে ছাত্রলীগ লাভবান হবে। অন্যদিকে কোটা আন্দোলনকারীরা ছাত্রদলের সঙ্গে জোট বঁাধলে তারা তাদের ইমেজ হারাবে। সাধারণ ভোটারদের অনেকে নীরবে তাদের পাশ থেকে সরে যাবে। যদিও তাদের এ ধারণা পুরোপুরি ভুল বলে মনে করছেন ছাত্ররাজনীতির সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা।

তাদের ভাষ্য, টানা ১০ বছর আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসীন থাকলেও ছাত্রলীগ শিক্ষাথীের্দর অধিকার আদায়ে যতটা সক্রিয় থাকার কথা ছিল, সে প্রত্যাশা তারা সামান্যও পূরণ করতে পারেনি। বরং শিক্ষাথীের্দর অধিকারের দিকে নজর না দিয়ে ছাত্রলীগের নেতাকমীর্রা নিজেদের স্বাথর্ নিয়েই বেশি ব্যস্ত থেকেছেন। তাদের অনেকে চঁাদাবাজি, টেন্ডারবাজি, দখলবাজি এবং ভতির্ বাণিজ্য ও সিট বাণিজ্যসহ বিভিন্ন সন্ত্রাসী কমর্কাÐে জড়িয়ে নিজের আখের গুছিয়েছেন। এ নিয়ে অভ্যন্তরীণ কোন্দলে দেশের বিভিন্ন শিক্ষাঙ্গন দফায় দফায় উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। তাদের সংঘষের্র মাঝে পরে বিপুল সংখ্যক সাধারণ শিক্ষাথীর্ হতাহত হয়েছে। অন্যদিকে কোটা সংস্কার আন্দোলনে ছাত্রলীগের নেতাকমীর্রা সরাসরি বিরোধিতা করায় সাধারণ শিক্ষাথীের্দর একটি বড় অংশকে সংগঠন বিমুখ করে তুলেছে। এ আন্দোলন চলাকালে ছাত্রলীগের হামলার ঘটনায় খোদ দলের কয়েকজন নেতা প্রকাশ্যে ঘোষণা দিয়ে পদত্যাগ করেছে। তাদের সঙ্গে আরো ছাত্রলীগের অসংখ্য সমথর্কও নীরবে সরে দঁাড়িয়েছে। যারা আসন্ন ডাকসু নিবার্চনে বড় ফ্যাক্টর হয়ে দঁাড়াবে বলে মনে করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররাজনীতির সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা। এদিকে কোটা আন্দোলনকারীরা নিবার্চনে অংশ নেয়ার প্রস্তুতি যে সত্যিকার অথের্ই ছাত্রলীগের জন্য মাথা ব্যথার কারণ হয়ে দঁাড়িয়েছে তা তাদের গতিবিধিতেই স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

বিশেষ করে এ নিয়ে বৃহস্পতিবার বাংলা একাডেমির ক্যান্টিনে বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদের যুগ্ম আহবায়ক নূরুল হক নূরুসহ কোটা সংস্কার আন্দোলনের বেশ কয়েকজন নেতাকে দীঘর্সময় অবরুদ্ধ রাখার ঘটনায় ছাত্রলীগের রোষের বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে। কোটা সংস্কার আন্দোলনে নেতৃত্বদানকারী একাধিক নেতা নাম প্রকাশ না করার শতের্ যায়যায়দিনকে বলেন, পরিবেশ-পরিস্থিতি বিবেচনায় তারা জোটবদ্ধ হয়ে নিবার্চন করতে পারে এ ঘোষণায় ছাত্রলীগের রাতের ঘুম হারাম হয়ে গেছে। তারা এতদিন নানা অপকৌশলে ডাকসু নিবার্চনে নিরঙ্কুশ বিজয়ের স্বপ্ন দেখলেও তা এখন তাদের কাছে দুঃস্বপ্ন হয়ে ধরা দিয়েছে। কেননা এতদিন তারা ঢাবি ক্যাম্পাসে কোণঠাসা হয়ে থাকা ছাত্রদলকে হামলা-মামলা ও আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে দিয়ে নানাভাবে ধাওয়ার ওপর রেখে অনেকটা একতরফা নিবার্চনে জয়লাভের প্রহর গুনেছে। অথচ এসব ভয় দেখিয়ে কোটা আন্দোলনকারীদের যে দমিয়ে রাখা যাবে না, তারা তার প্রমাণ আগেই পেয়েছে। তাই বেগতিক পরিস্থিতিতে যাতে কোনো আইনি ফঁাকফোকর বের করে ডাকসু নিবার্চন ফের স্থগিত করা যায় তার কৌশলী আগাম পথ খুঁজে রাখছে সংশ্লিষ্টরা যোগ করেন ওইসব নেতা। বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদের অপর একজন নেতা এ প্রতিবেদককে জানান, খুব শিগগিরই বড় ধরনের শো-ডাউনের মধ্য দিয়ে তারা আনুষ্ঠানিকভাবে নিবার্চনী প্রচার-প্রচারণায় মাঠে নামবেন। এ সময় অভ্যাসগতভাবে ছাত্রলীগ কোনো ধরনের প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টির চেষ্টা করলে তারা তার শক্ত জবাব দেবেন। এ নিয়ে তারা এরই মধ্যে গোপনে কাজ শুরু করেছেন বলে দাবি করেন কোটা আন্দোলনকারী ওই নেতা। তবে তারা সাংগঠনিকভাবে শক্তিশালী হলেও শেষ পযর্ন্ত ক্যাম্পাসে দঁাড়াতে পারবে কিনা তা নিয়ে অনেকেরই সংশয় রয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একাধিক সাধারণ শিক্ষাথীর্ একাধিক জানায়, ডাকসু নিবার্চনে ছাত্রদলের চেয়ে কোটা আন্দোলনকারীরা এখন বড় ফ্যাক্টর হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাই তাদের প্রতিহত করতে ছাত্রলীগ নানা কৌশল খুঁজছে। তবে সুবিধামতো কোনো পথ খুঁজে পাওয়া না গেলে তারা শেষ পযর্ন্ত পেশিশক্তি ব্যবহার করতে পারে সে শঙ্কাও রয়েছে বলে জানান তারা। তাদের এ আশঙ্কা যে একেবারে অমূল নয়, তা ঢাবি ছাত্রলীগের একাধিক নেতার বক্তব্যে তা প্রকাশ পেয়েছে। ছাত্রলীগের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি সঞ্জিত চন্দ্র দাশ শনিবার সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমরা মনে করি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে সকলের সহ-অবস্থান রয়েছে। এখানে আলাদা করে কাউকে এনে সহ-অবস্থান সৃষ্টি করার প্রয়োজন আছে বলে মনে করি না। তবে অছাত্র বা অন্য কেউ যদি এসে সাধারণ ছাত্রদের রোষানলে পড়েন বা গণধোলাইয়ের শিকার হন, তবে তার দায় ছাত্রলীগ নেবে না। এটা সাংবাদিকদেরও বুঝতে হবে।’ তার এ বক্তব্যে স্পষ্ট হুমকি রয়েছে বলে মনে করেন কোটা আন্দোলনকারীরা। তবে এ ধরনের বিপদ সংকুল পরিস্থিতি মোকাবেলা করেই বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদ ডাকসু নিবার্চনে অংশ নিতে চায় বলে সাফ জানান দেন তারা। সংগঠনের যুগ্ম আহবায়ক মো. রাশেদ খান  বলেন, ‘আমাদের ডাকসু নিবার্চনে আসার সিদ্ধান্ত মূলত সাধারণ শিক্ষাথীের্দর দাবির কারণেই। ডাকসু নিবার্চন হবে এমন তথ্য সামনে আসার পর থেকেই সাধারণ শিক্ষাথীর্রা আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে প্যানেল দেয়ার দাবি জানাচ্ছিল। প্রতিদিনই অসংখ্য শিক্ষাথীর্ এ বিষয়ে দাবি জানানোর প্রেক্ষিতে আমরা বৈঠক করে আমরাও নিবার্চনে অংশ নেয়ার সিদ্ধান্ত নেই। এরপর থেকে আমাদের নানাভাবে হুমকি-ধামকি দেয়া হচ্ছে। কিন্তু আমাদের যাত্রাটিই শুরু হয়েছিলো হুমকি ধামকির ভেতর দিয়েই। কোটা সংস্কার ও ‘ঘ’ অনুষদের প্রশ্নফঁাসের বিরুদ্ধে আন্দোলনসহ কোনো সময়ই আমাদের জন্য পরিবেশ অনুকূল ছিল না। তারপরও সব বাধা পেরিয়ে আমরা সামনে এগিয়েছি। ফলে আগামীতে আমাদের জন্য কেউ মাঠ ছেড়ে দেবে আর তখন গিয়ে নিবার্চন করব এমন আশা আমরা কখনো করি না। তবে আমরা অতীতের মতোই শান্তিপূণর্ কমর্সূচির মাধ্যমে ডাকসু নিবার্চনে অংশ নেব।’ জোটগতভাবে নিবার্চন করার বিষয়ে রাশেদ খান বলেন, ‘এ ধরনের প্রস্তাব বিভিন্ন মহল থেকে এসেছে। তবে আমাদের মধ্যে এ ধরনের কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। আমাদের সবের্শষ সিদ্ধান্ত অনুযায়ী একক প্যানেল দেয়ার পক্ষেই কথা হয়েছে। পরিস্থিতি অনুসারে সব বিষয়ই আলোচনায় আসতে পারে।’ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সমালোচনা করে রাশেদ খান বলেন, ‘আমরা আশাহত হই যখন দেখি আমাদের অভিভাবকরা সব শিক্ষাথীের্ক সমানভাবে দেখতে ব্যথর্ হন। দুঃখের বিষয় আমরা সরকারবিরোধী না হলেও আমাদের সঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন সঠিক আচরণটি করেনি। তবে আমরা বিশ্বাস করি, আগামীতে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন সবাইকে সমানভাবে দেখবে। বতর্মানে ক্যাম্পাসে ন্যূনতম সহ-অবস্থানের পরিবেশ নেই।’ সুষ্ঠু পরিবেশ সৃষ্টি করে প্রসাশন নিবার্চন করবে বলে প্রত্যাশা করেন তিনি। এদিকে কোটা সংস্কার আন্দোলনের প্লাটফরম বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদের আরেক যুগ্ম আহŸায়ক ফারুক হাসান যায়যায়দিনকে বলেন, ‘প্রশাসনের পক্ষ থেকে ক্যাম্পাসে সহ-অবস্থানের সুষ্ঠু পরিবেশ থাকার দাবি করা হলেও আদৌও তা নেই। তা থাকলে দিনদুপুরে তাদের নেতাদের অবরুদ্ধ করে রাখা হতো না। তাদের ওপর কোনো হামলা হতো না।’ তিনি দৃঢ়তার সঙ্গে দাবি করেন, নিবার্চনে কোনো ধরনের অনিয়ম হলে কিংবা তাদের জোর করে কেউ ক্যাম্পাসের বাইরে রাখার চেষ্টা করলে সাধারণ শিক্ষাথীর্রা তা মেনে নেবে না। বিগত সময় নানা প্রতিক‚লতার মধ্যেও কোটা আন্দোলনকারীরা ক্যাম্পাসে অবস্থান করেছে; আগামীতেও কেউ তাদের সে অবস্থান থেকে সরাতে পারবে না। সুষ্ঠু ভোট হলে তাদের জয় নিশ্চিত বলে দাবি করেন এ নেতা। যাযাদি

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বাধিক পঠিত