প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

রংপুরে নির্বাচনী জনসভায় শেখ হাসিনা
ধানের শীষঅলাদের গায়ে মানুষ পোড়ানোর গন্ধ

উন্নয়ন অব্যাহত রাখতে তরুণসহ গোটা দেশবাসীর প্রতি নৌকা মার্কায় ভোট দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা বলেন, ‘তারুণ্যের কাছে ভোট চাই, মা-বোনদের কাছে ভোট চাই, বয়োবৃদ্ধ মুরব্বি—সবার কাছে ভোট চাই। আপনারা ভোট দিন, আমরা উন্নয়ন দেব, সমৃদ্ধি দেব, সুন্দর জীবন দেব, উন্নত জীবন দেব। দোয়া করবেন, যেন ভালোভাবে কাজ করতে পারি।’

পীরগঞ্জ উপজেলা নিয়ে গঠিত রংপুর-৬ আসনে ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে জয়ী হন শেখ হাসিনা। এটি তাঁর শ্বশুরবাড়ির এলাকা। দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয়ী হওয়ার পর শেখ হাসিনা এই আসন ছেড়ে দিলে উপনির্বাচনে ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী জয়ী হন। পরে তিনি জাতীয় সংসদের স্পিকার হন। এবারও শিরীন শারমিন চৌধুরী এ আসনের প্রার্থী। তাঁর সমর্থনে পীরগঞ্জ সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের মাঠে জনসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্য দেন শেখ হাসিনা।

এর আগে তারাগঞ্জে আরেকটি জনসভায় বক্তব্য দেন শেখ হাসিনা। সেখানে আওয়ামী লীগের প্রার্থী আবুল কালাম মো. আহসানুল আলম চৌধুরী ডিউকের পক্ষে ভোট চান তিনি। পীরগঞ্জের জনসভায় জেলার অন্য দুই দলীয় প্রার্থী টিপু মুন্সী ও এইচ এন আশিকুর রহমানকে পরিচয় করিয়ে তাঁদের পক্ষেও ভোট চান শেখ হাসিনা। তিনি বলেন, ‘নৌকার পালে হাওয়া লেগেছে। আমি বিশ্বাস করি, নৌকার বিজয় হবেই।’

সকালে বিমানে ঢাকা থেকে সৈয়দপুরে আসেন শেখ হাসিনা। এরপর সৈয়দপুর থেকে সড়কপথে সরাসরি তারাগঞ্জ আসেন তিনি। সেখানে জনসভায় সংক্ষিপ্ত বক্তব্য দেন। এরপর যান শ্বশুরালয় পীরগঞ্জের ফতেহপুর গ্রামে। সেখানে স্বামী বিশিষ্ট পরমাণু বিজ্ঞানী ড. এম এ ওয়াজেদ মিয়ার কবর জিয়ারত করেন তিনি। এরপর বিকেলে পীরগঞ্জে বক্তব্য দেন শেখ হাসিনা।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে দেখতে রাস্তার দুই ধারে শীতের সকালে ঠাণ্ডার মধ্যে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করে নারী-পুরুষ, শিশু-কিশোর, আবাল-বৃদ্ধ-বনিতা। সৈয়দপুর থেকে তারাগঞ্জ, তারাগঞ্জ থেকে পীরগঞ্জ এবং ফতেহপুর পর্যন্ত মানুষের ঢল নামে রাস্তার দুই পাশে। পীরগঞ্জের জনসভা শেষ করে তিনি দিনাজপুর যাওয়ার পথেও পথসভায় বক্তব্য দেন। এরপর সন্ধ্যায় বিমানে সৈয়দপুর থেকে ঢাকায় ফেরেন প্রধানমন্ত্রী।

পীরগঞ্জে শেখ হাসিনা বলেন, ‘আজকে যারা ধানের শীষ করে—বিএনপি-জামায়াত জোট। এরা একাত্তর সালের মানবতাবিরোধী যুদ্ধাপরাধী। গণহত্যা চালিয়েছে, আগুন দিয়ে মানুষ পুড়িয়ে মেরেছে; সেই বিএনপি-জামায়াত বাসে আগুন দিয়ে মানুষ পুড়িয়েছে, গ্রাম পুড়িয়েছে, রাস্তঘাট কেটে দিয়েছে, গাছ কেটেছে, আপনারা তাদের কথা একবার চিন্তা করুন।’

কারাবন্দি খালেদা জিয়া ও তাঁর ছেলে পলাতক তারেক রহমানের সমালোচনায় শেখ হাসিনা বলেন, ‘তাদের নেত্রী খালেদা জিয়া চুরি করে আজকে জেলে আছেন। আর তাঁর ছেলে টাকা পাচার করেছে, ১০ ট্রাক অস্ত্র মামলায় সাজাপ্রাপ্ত, ২১ অগাস্ট গ্রেনেড হামলায় সাজাপ্রাপ্ত, এতিমের টাকা মেরে খেয়েছে। যারা একাধিক মামলায় সাজাপ্রাপ্ত, তারা দেশের কী উন্নয়ন করবে? এরা দেশের কী কল্যাণ করবে? কাজেই এদের থেকে দেশবাসীকে সাবধান থাকতে হবে।’

রংপুরবাসীর উদ্দেশে শেখ হাসিনা বলেন, ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর অবহেলিত রংপুরের উন্নয়ন কার্যক্রম শুরু হয়েছিল। তিনি বলেন, ‘আপনারা একটা কথা চিন্তা করুন, ১০ বছর আগে কোথায় ছিলেন, আর আজকে কত উন্নয়ন হয়েছে। আজ প্রতিটি মানুষের উপার্জন বেড়েছে। আমরা ডিজিটাল সেন্টার করে দিয়েছি। ছেলে-মেয়েরা সেখানে বসে কাজ করছে।’

১০ বছর আগে রংপুর এলাকার মানুষ খাবারের জন্য হাত পাততো মন্তব্য করে শেখ হাসিনা বলেন, ‘তখন থেকে অঙ্গীকার নিয়েছিলাম, যদি ক্ষমতায় আসি, এই রংপুর থেকে মঙ্গা দূর করব। প্রতিটি মানুষের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করব। ১৯৯৬ সালে ক্ষমতায় এসে মঙ্গা দূর করেছিলাম। কিন্তু বিএনপি-জামায়াত জোট, লুটেরার দল, খুনির দল, আগুন দিয়ে পুড়িয়ে মানুষ মারে, তারা ক্ষমতায় এসে আবার সেই মঙ্গা শুরু করেছিল। ২০০৮ সালের নির্বাচনে আমরা জয়ী হই, ২০০৯ সালে সরকার গঠন করি, তখন থেকে এই ২০১৮ সাল পর্যন্ত ১০টা বছর রংপুরে কোনো মঙ্গা নেই। মঙ্গা আমরা দূর করে দিয়েছি। আর জীবনে কখনো এখানে মঙ্গা-দুর্ভিক্ষ ইনশাআল্লাহ হবে না।’

শেখ হাসিনা বলেন, আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলে মানুষের উন্নতি হয়, তার যথেষ্ট উদাহরণ আপনারা দেখেছেন। আমরা যুবসমাজের জন্য ব্যাপক কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করেছি। কারো কাছে চাকরি চাইতে হবে না, নিজেরা চাকরি দিতে পারবে, সেই ব্যবস্থা আমরা করেছি। আমরা তারুণ্যের শক্তিকে কাজে লাগিয়ে দেশকে সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে নিয়ে যাব।

সবার কাছে দোয়া চেয়ে তিনি বলেন, ‘আপনাদের কাছে দোয়া চাই, আপনারা দোয়া করবেন, যেন দেশের মানুষের কল্যাণ করতে পারি। বাংলাদেশ হবে দারিদ্র্যমুক্ত, ক্ষুধামুক্ত সোনার বাংলাদেশ। যে বাংলাদেশ জাতির পিতা শেখ মুজিব চেয়েছিলেন। সেই বাংলাদেশ আমরা করে দেব।’

প্রধানমন্ত্রী বলেন, আজকে প্রত্যেক ঘরে ঘরে আলো, যার জন্য আমাদের ছেলে-মেয়েরা কাজ করার সুযোগ পাচ্ছে। সারা পীরগঞ্জে শতভাগ বিদ্যুৎ দিয়ে দিয়েছি। সারা বাংলাদেশে বিদ্যুৎ আমরা দিচ্ছি। ইনশাআল্লাহ ২০২১ সালের মধ্যে দেশের কোনো ঘর অন্ধকার থাকবে না। সব ঘর আলোকিত হবে।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরীকে নিজের মেয়ে অভিহিত করে তাঁকে এ আসনে দলীয় মনোনয়ন দেওয়ার পক্ষে যুক্তি তুলে ধরে বলেন, ‘আমার জন্মভূমি টুঙ্গিপাড়ার আসনটি আমাকে রাখতে হয়েছে। গত নির্বাচনে এ আসনে জয়ী হলেও পরে ছেড়ে দিতে হয়, যেহেতু একজন সংসদ সদস্য শুধু একটি আসনই রাখতে পারেন। তবে এখানে যাঁকে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে তিনি আমার মেয়েই। এই প্রার্থীকে (শিরীন শারমিন চৌধুরী) যদি আপনারা নির্বাচিত করেন, তাহলে তাঁকে আবারও জাতীয় সংসদের স্পিকার নির্বাচিত করা সহজ হবে।’ শেখ হাসিনা জানান, এমপি নির্বাচিত হলে সজীব ওয়াজেদ জয় ও সায়মা হোসেন ওয়াজেদ পুতুল আগের মতোই ড. শিরীন শারমিন চৌধুরীকে সহযোগিতা করে যাবেন।

আওয়ামী লীগ সভাপতির সফরসঙ্গী হিসেবে গতকাল পীরগঞ্জের জনসভায় বক্তৃতা করেন চিত্রনায়ক ফেরদৌস, নায়িকা পূর্ণিমা ও অভিনেত্রী তারিন। তাঁরা উন্নয়ন অব্যাহত রাখতে নৌকা মার্কায় ভোট চান।

এর আগে তারাগঞ্জের জনসভায় আওয়ামী লীগ সরকারের নানামুখী উদ্যোগে মঙ্গা ও দুর্ভিক্ষপীড়িত রংপুর এখন উন্নয়নের দিকে ধাবিত হয়েছে বলে মন্তব্য করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তারাগঞ্জ ডিগ্রি কলেজ মাঠে জনসভায় আওয়ামী লীগ সভাপতি বলেন, ‘পুরো রংপুরটাই ছিল একসময় দুর্ভিক্ষপীড়িত এলাকা। আজকে সেই দুর্দিন চলে গেছে, আজকে সুদিন এসে গেছে। রংপুরে আর মঙ্গা নাই, দুর্ভিক্ষ নাই। প্রত্যেকটা মানুষের খাদ্য, চিকিৎসা, বাসস্থান সব ব্যবস্থা আওয়ামী লীগ সরকার করে দিয়েছে। এটা হয়েছে একমাত্র আপনারা বারবার নৌকায় ভোট দিয়েছেন সেই কারণেই।’

দুপুর সোয়া ১২টার দিকে তারাগঞ্জ ডিগ্রি কলেজ মাঠে আসেন শেখ হাসিনা। বক্তব্যে শেখ হাসিনা রংপুরসহ সারা দেশের উন্নয়নে আওয়ামী লীগ সরকারের নানা পদক্ষেপের কথা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ‘নৌকা যখন ক্ষমতায় আসে, তখন এ দেশের মানুষের ভাগ্য পরিবর্তন হয়। এই তারাগঞ্জে আমি এসেছি, বদরগঞ্জে গিয়েছি, বাংলাদেশ আমি ঘুরেছি। আমি দেখেছি তখন দরিদ্র মানুষ, পেটে ক্ষুধার জ্বালা—এসব এলাকায় ছিল মঙ্গা।’ শেখ হাসিনা বলেন, ‘২০০৯ সালে সরকার গঠন করেছি আমরা। এরপর থেকে এই অঞ্চলে মঙ্গা আর হয় নাই। খাবার কোনো কষ্ট হয় নাই, ফসল উৎপাদন হচ্ছে, খাবারের ব্যবস্থা আমরা করতে পেরেছি।’

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘একটি মানুষও গৃহহারা থাকবে না। আশ্রয়ণ প্রকল্পের মাধ্যমে আমরা ঘরবাড়ি তৈরি করে দিচ্ছি। প্রতিটি মানুষ চিকিৎসা পাবে, কমিউনিটি ক্লিনিক করে দিয়েছি, মা-বোনেরা যাতে সেখানে গিয়ে চিকিৎসা নিতে পারেন, বিনা পয়সায় ৩০ প্রকারের ওষুধ দিচ্ছি।’ উপজেলাকেন্দ্রিক ৫৬০টি মসজিদ করা হবে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘প্রতিটি উপজেলায় মসজিদ হবে। আধুনিক মসজিদ কাম ইসলামিক কালচারাল সেন্টার আমরা করে দিচ্ছি।’ নৌকার প্রার্থীকে ভোট দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, ‘আমরা যেন আবার আপনাদের সেবা করতে পারি, আবার যেন আপনাদের জন্য কাজ করতে পারি। উন্নয়ন এগিয়ে নিয়ে যেতে পারি।’

তারাগঞ্জ উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি আতিয়ার রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত জনসভায় অন্যদের মধ্যে আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর কবির নানক ও আবদুর রহমান, সাংগঠনিক সম্পাদক আহমদ হোসেন, বি এম মোজাম্মেল হক, আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম ও খালিদ মাহমুদ চৌধুরী, কেন্দ্রীয় নেতা ও রাকসুর সাবেক ভিপি নুরুল ইসলাম ঠাণ্ডু, যুবলীগের চেয়ারম্যান ওমর ফারুক চৌধুরী, ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি মাহমুদ হাসান রিপন, ছাত্রলীগ সভাপতি রেজোয়ানুল হক চৌধুরী শোভন প্রমুখ বক্তৃতা করেন। পীরগঞ্জের জনসভায় সভাপতিত্ব করেন আজিজুর রহমান রাঙা। বক্তৃতা করেন স্থানীয় নেতা মমতাজ উদ্দিন আহমেদ, সাফিয়ার রহমান, জাতীয় পার্টির নূরে আলম জাদু, উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান সদ্য আওয়ামী লীগে যোগ দেওয়া নূর মোহাম্মদ মণ্ডল, উপজেলা আওয়ামী লীগ নেতা তাজিমুল ইসলাম প্রমুখ।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বাধিক পঠিত