প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

রাজনীতিতে বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থার তৎপরতা- ৪
বিএনপি-জামায়াতের প্রার্থী তালিকা আইএসআইয়ের তৈরি!

বাংলা ট্রিবিউন :  আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে দেশের রাজনীতিতে পাকিস্তানি গোয়েন্দা সংস্থা ইন্টার সার্ভিসেস ইন্টেলিজেন্সের (আইএসআই) বিশেষ তৎপরতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। এমনকি আসন্ন নির্বাচনে আইএসআই তাদের পছন্দের লোককে মনোনয়ন দেওয়ার জন্য বিএনপি ও জামায়াতের কাছে একটি তালিকাও তৈরি করে দিয়েছিল। সংসদ নির্বাচনে ৩০০ আসনে আইএসআইয়ের তৈরি করা একটি প্রার্থী তালিকা বিএনপির কাছে পাঠানো হয় ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহে। লন্ডনে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের হাতে এ তালিকা পৌঁছানো হয়। অনুসন্ধানে একাধিক সূত্র থেকে এই তৎপরতার তথ্য ও নথি পাওয়া গেছে।

যোগাযোগ করা হলে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য এবং নির্বাচন পরিচালনা কমিটির প্রধান নজরুল ইসলাম খান  বলেন, ‘এত খবর রাখে গভর্নমেন্ট আইএসআইয়ের দুই-একটা এজেন্টকে গ্রেফতার করতে পারে না কেন? আইএসআইয়ের সঙ্গে আমাদের কোনও সম্পর্ক নেই। সরকারের সঙ্গে হয়তো তাদের সম্পর্ক আছে, তা না হলে আমরা জানি না তারা জানে কীভাবে?’

তিনি বলেন, ‘আইএসআইয়ের সঙ্গে এত মিটিংয়ের খবর রাখে, আইএসআইয়ের দুই-একটা এজেন্টকে গ্রেফতার করলে তো বুঝতাম, যে সরকারের গুপ্তচর বিভাগ খুব কর্মক্ষম। এগুলো হলো বিএনপির বিরুদ্ধে অপপ্রচার। এগুলো মিথ্যা-বানোয়াট। একবার তারা বললেন লন্ডনে এসব হচ্ছে, ঢাকায় পাকিস্তান এম্বেসিতে ফখরুল ইসলাম আলমগীর সাহেব গেছেন। ওনারা বলেছেন, এগুলো ডাহা মিথ্যা কথা এবং অপপ্রচার। এসবের আমরা প্রমাণ চাই। এই যে কথাটা বললেন, কবে কোথায় গেছি আমরা। আপনাদের তো নানারকম যন্ত্রপাতি আছে এগুলো দিয়ে প্রমাণ করেন।’

নজরুল ইসলাম খান বলেন, ‘এই সরকার ভীতসন্ত্রস্ত্র হয়ে পড়েছে। পরাজয়ের ভয়ে ভীত। তারা এখন নানা আজেবাজে কথা বলে জনগণকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করছে। এই বৃথা চেষ্টা করে কোনও লাভ হবে না।’

যুক্তরাজ্য বিএন‌পির সভাপ‌তি এম এ মা‌লেক  ব‌লেন, ‘৩০০ আস‌নে বিএন‌পি ও ঐক্যফ্রন্ট নেতারা মিলে প্রার্থী তালিকা তৈরি ও চূড়ান্ত করেছেন।’ লন্ডনে তারেক রহমানের ঘনিষ্ট এই বিএনপি নেতা এর বাই‌রে কোনও মন্তব্য কর‌তে রা‌জি হন‌নি।

সূত্রে জানা গেছে, আইএসআইয়ের তৈরি করা বিএনপি প্রার্থীদের দুটি আলাদা তালিকা তারেক রহমানের কাছে পৌঁছে দেন দুবাইতে বিএনপির সংযুক্ত আরব আমিরাত শাখার সভাপতি জাকির হোসেন। গত ৭ ডিসেম্বর দুবাইয়ের একটি হোটেলে গোপন বৈঠকে এটি জাকির হোসেনের হাতে তুলে দেন দুবাইতে আইএসআইয়ের এজেন্ট শহীদ মেহমুদ। পরে জাকির হোসেন শহীদ মেহমুদকে নিশ্চিত করেছেন, এটি তারেক রহমানের হাতে পৌঁছেছে। তালিকার ব্যাপারে তারেক রহমানের হয়ে শহীদ মেহমুদের সঙ্গে দেনদরবারও করেছেন জাকির হোসেন।

সূত্র জানায়, দেশের রাজনীতিতে আইএসআইয়ের প্রভাব বাড়ানোর জন্যই তারা কাজ করছে। আইএসআইয়ের এজেন্ট একাজের মধ্যস্থতাকারী হিসেবে মূল ভূমিকায় রয়েছে। পাকিস্তান সেনাবাহিনীর একজন অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট কর্নেল শহীদ মেহমুদ। ২০০৪ সালে অবসরে যাওয়ার আগ পর্যন্ত তিনি আইএসআইতে নিয়োজিত ছিলেন। অবসর যাওয়ার পরও আইএসআইয়ের এজেন্ট হিসেবে তিনি কাজ করে যাচ্ছেন।

একাধিক সূত্র থেকে নিশ্চিত হওয়া গেছে, শহীদ মেহমুদ ও লন্ডনে তারেক রহমানের সঙ্গে যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে কাজ করছেন জাকির হোসেন। গত জুন থেকে ডিসেম্বর মাসের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত দুবাইতে জাকির হোসেন ও শহীদ মেহমুদ অন্তত ১১টি বৈঠক করেন। তাদের সর্বশেষ বৈঠকগুলোর বিষয়বস্তু ছিল আইএসআইয়ের তৈরি করা প্রার্থী তালিকা। সর্বশেষ ৭ ডিসেম্বরের বৈঠকে শহীদ মেহমুদ ও জাকির হোসেনের মধ্যে তালিকায় থাকা নাম নিয়ে দরকষাকষি হয়েছে। তারেক রহমান এ তালিকায় কিছু পরিবর্তন চান বলে উল্লেখ করেন বিএনপি নেতা জাকির হোসেন। এতে আইএসআই এজেন্ট শহীদ মেহমুদ জানান, পাকিস্তানের পক্ষ থেকে জরিপ চালিয়ে ‘ভালো’ এবং ‘জয়ী হওয়ার উপযোগী’ বিএনপি প্রার্থীদেরই তালিকা তৈরি করা হয়েছে।

সূত্র জানায়, আইএসআইয়ের পক্ষ থেকে তারেক রহমানের কাছে প্রথমে নভেম্বরের কোনও এক সময় ৩০০ আসনের একটি পূর্ণাঙ্গ তালিকা পাঠানো হয়। এ তালিকায় বিএনপি ছাড়াও জামায়াত নেতাদের নাম ছিল। পরে ৭ ডিসেম্বর ১০ জনের আরেকটি সংক্ষিপ্ত তালিকা পাঠানো হয়। এই তালিকাটির শিরোনাম ছিল ‘১০ জন যোগ্য ব্যক্তির অতি গুরুত্বপূর্ণ তালিকা’। এই তালিকায় যাদের নাম আছে, তারা হলেন— ব্যারিস্টার কায়সার কামাল (নেত্রকোনা-১), মাহমুদা হাবিবা (রাজশাহী-৫), আলহাজ এ কে এম মোয়াজ্জেম হোসেন (ঢাকা-১৬), জেবা আহমেদ খান (ঝালকাঠি-২), মাহমুদুর রহমান (নারায়ণগঞ্জ-২), আহম্মদ সোহেল মঞ্জুর (পিরোজপুর-২), ইয়াসির খান চৌধুরী (ময়মনসিংহ-৯), সমীরণ দেওয়ান (খাগড়াছড়ি), ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা (ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২) এবং দীপেন দেওয়ান (রাঙ্গামাটি)।

সূত্র বলছে, প্রথম তালিকা তারেক রহমানের কাছে পৌঁছানোর পর জাকির হোসেন তার প্রতিক্রিয়া হিসেবে শহীদ মেহমুদকে বলেন, ‘তালিকায় এমন একজনের নাম আছে, যিনি পাঁচ-ছয় মাস আগে মারা গেছেন।’ দ্বিতীয় দফায় পাঠানো ১০ জনের তালিকার ব্যাপারে জাকির হোসেন জানান, তার ‘বস’ মাহমুদা হাবিবাকে চেনেন না। এতে আইএসআই এজেন্ট জোর দিয়ে বলেন, ‘তারা মনে করেন মাহমুদা একজন যোগ্য প্রার্থী। তার জয়লাভের সম্ভাবনা আছে।’ জাকির হোসেন ও শহীদ মেহমুদের এই কথপোকথনে শহীদ মেহমুদ আভাস দেন, জাকির হোসেন ছাড়াও অন্য মাধ্যমেও তারা তারেক রহমানের কাছে তালিকা পাঠিয়েছেন।

সূত্র জানায়, গত ১৪ আগস্ট থেকে ৪ সেপ্টেম্বর জাকির হোসেন ও শহীদ মেহমুদের মধ্যে অনুষ্ঠিত একাধিক বৈঠক থেকে গোয়েন্দারা জানতে পারে, দেশের নির্বাচনে ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন (ইভিএম) ব্যবহারের বিতর্ক নিয়ে পাকিস্তান পক্ষের বিশেষ আগ্রহ ছিল। এ বিষয়ে জাকির হোসেন একাধিকবার শহীদ মেহমুদের কাছে সর্বশেষ অগ্রগতি জানতেও চেয়েছেন।

জানতে চাইলে নিরাপত্তা বিশ্লেষক অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আব্দুর রশিদ বলেন, ‘যেসব তথ্য-উপাত্ত মিডিয়াতে প্রকাশিত হয়েছে, তাতে দেখা যাচ্ছে, আইএসআই বিভিন্নভাবে বাংলাদেশের ইলেকশনে হস্তক্ষেপ করতে চাচ্ছে। বাংলাদেশের প্রতি নির্বাচনের আগে আমরা দেখি যে, আইএসআই বাংলাদেশের নির্বাচনের মধ্যে ঢুকে। তারা বিভিন্ন ধরনের পরিকল্পনা গ্রহণ করে— নির্বাচনের ফলাফল কোনও একটি পক্ষে নিয়ে আসার জন্য। ওই পক্ষটা তো আমরা জানি, পাকিস্তান সবসময় স্বাধীনতাবিরোধীদের পক্ষে থাকে। অতীতের ইলেকশনেও তারা ছিল, তারা ইলেকশনে অর্থেরও যোগান দেয় এবং এখানকার বিভিন্ন ধরনের জঙ্গি সংগঠন বা অন্যান্য সংগঠনের মাধ্যমে তারা সহিসংতা করানোর চেষ্টা করে।’

তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের নির্বাচন তো এখন আমরা দেখছি যে, বেশ সুন্দরভাবে সামনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। একটি অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন হচ্ছে। ফলাফলের সম্ভাব্য আভাসও তো পাচ্ছি বিভিন্ন জরিপের মাধ্যমে। তারা দেখছে, এটি যদি তাদের অনুকূলে না যায়, তাহলে তারা নির্বাচন প্রক্রিয়াকে ভণ্ডুল করার একটি অপচেষ্টা করতে পরে। এটি আমাদের শঙ্কা। বাংলাদেশে বেশ কিছু সহিংসতা অতীতে যেসব সংগঠন করেছে, তাদেরকেই তারা আবার ব্যবহার করছে। আমরা তাদের এখন সক্রিয় দেখছি। এই সক্রিয়তাই আমাদের চিন্তার কারণ।’

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বাধিক পঠিত