প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

ধানের ক্ষোভ নিজের ঘরে, নৌকা আছে ভাটায় পড়ে

আশরাফ চৌধুরী রাজু, সিলেট : দলীয় কোন্দল আর দলের সামনের সারির নেতাদের কনুই ঠেলাঠেলিতে সিলেটে জোট ও ঐক্যফ্রন্টের প্রার্থীরা পড়েছেন মহা বিপাকে। অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আব্দুল মুহিতের রাজনীতি থেকে অবসর গ্রহণের সুযোগে সিলেট-১ আসনে নৌকার হাল ধরেন তারই ভাই ড. একে আবদুল মোমেন। তিনি মাঝিমাল্লা সমেত বৈঠা হাতে নিলেও দাঁড় টানার অভাবে নৌকা এখনো ভাটিতে পড়ে আছে। যে কারণে আসনটিতে ঘটতে পারে সিলেট সিটি করপোরেশন নির্বাচনে নৌকার মেয়র প্রার্থী বদর উদ্দিন আহমদ কামরানের ভরাডুবির মত ঘটনা। এমনটা আশঙ্কা করছেন দলের শুভাকাঙ্খিরা।

আওয়ামী লীগের বিপরীত মেরুর প্রতিদ্বন্দ্বি বিএনপির প্রার্থী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদিরের ধানের ভাঁড়ারেও শত্রু রয়েছে বিভীষন। ক্ষোভের আগুন রয়েছে দলটির ঘরে। তারই প্রভাব পড়তে পারে মুক্তাদিরের ধানের ভাঁড়ারে। তাই জোট ও ঐক্যফ্রন্টের এই দুই প্রার্থীই নির্বাচনী মাঠে অস্থিত্ব সংকটে ভোগছেন।

এরই মধ্যে দলীয়ভাবে আস্থারও সংকট দেখা দিয়েছে। এমন প্রতিকূল অবস্থায় দলের অভ্যন্তরীণ সংকট কাটিয়ে উঠতে ভোটারের আস্থা অর্জন করতে পারবেন যিনি, তিনিই হবেন সিলেট-১ আসনের অভিভাবক। মূলত সিলেটে নির্বাচনী প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে নৌকার সাথে ধানের শীষের এমনটা প্রায় নিশ্চিতই বলা যায়।

ঐক্যফ্রন্টের প্রার্থী বিএনপি নেতা খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির সিলেট -১ আসনে ধানের শীষ প্রতীকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। সিলেটের এই আসনটিতে মুক্তাদিরের পিতা খন্দকার এমএ মালেক দুই বার জাতীয় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। পিতার হাত ধরে রাজনীতিতে হাতেকড়ি মুক্তাদিরের। গত আট বছর ধরে আসনটি নীরবে চষে বেড়িয়েছেন মুক্তাদির। এলাকার মানুষের ঘরে ঘরে নিজের পরিচিতি তুলে ধরেছেন। সুখে-দুঃখে মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে নিজের প্রতি সমর্থন আদায়ের চেষ্টা করেছেন। এলাকার মানুষদের সাহায্য করেছেন হাত খুলে। এত সবের পর প্রার্থী মুক্তাদিরের এখন ফসল ঘরে তোলার কথা।

কিন্তু দলের অভ্যন্তরীণ কোন্দল আর ক্ষোভের কারণে তার ফসলের ভাঁড়ারে ইঁদুর হানা দিতে পারে। বিএনপির নেতৃত্বাধীন ঐক্যফ্রন্টের অন্যতম শরীক জামায়াতে ইসলামী সিলেটের ১৯টি আসনে একটিতেও প্রার্থীতা পায়নি। শেষ পর্যন্ত ১৯টির মধ্যে দুটি আসন (সিলেট-৬ ও সিলেট-৫) চেয়েও পায়নি জামায়াত। তাই তাদেরকেও এবারে নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থীর প্রচারে দেখা যাচ্ছে না। এছাড়া প্রার্থীতা চেয়ে না পেয়ে দলের বঞ্চিত নেতাদেরও বিএনপির প্রার্থীর প্রচারনায় যোগ দিতে দেখা যাচ্ছে না।

আর সিলেট-১ আসনে দলীয় প্রার্থীতা না পেয়ে ক্ষোভে দল ত্যাগ করে আওয়ামী লীগে যোগ দিলেন বিএনপির শীর্ষ স্থানীয় নেতা ইনাম আহমদ চৌধুরী। সিলেটে বিএনপির ভরসা জনপ্রিয় নেতা সিলেট সিটি করপোরেশনের মেয়র আরিফুল হক চৌধুরীকেও ধানের শীষের সরব প্রচারনায় মাঠে নামতে দেখা যায়নি।

আওয়ামী লীগের শাসনামলে বিপরীত ঘরানার বিএনপি নেতা আরিফুল হক চৌধুরী সিলেট সিটি করপোরেশনের মেয়র নির্বাচিত হন। এমন অবস্থায় আওয়ামী লীগ সরকারের অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আব্দুল মুহিতের হাত ধরে সিলেট সিটির ব্যাপক উন্নয় ঘটিয়ে জনপ্রিয় হয়ে উঠেন। সিলেটের কর্মট নেতা হিসেবে পুক্ত করে নেন নিজের অবস্থান। আর তার সকল কাজে মুক্তহস্তে সরকারি কাড়িকাড়ি অর্থ যোগান দেন অর্থমন্ত্রী মুহিত। যে কারণে দ্বিতীয়দফায় সিলেট সিটি করপোরেশন নির্বাচনে

আওয়ামী লীগ প্রার্থী বদর উদ্দিন আহমদ কামরানকে হারিয়ে মেয়র নির্বাচিত হন সিলেট সিটিবান্ধব নেতা আরিফুল হক। এবার সিলেট-১ আসনের প্রার্থী নিয়ে শুরুতে ক্ষুব্দ ছিলেন আরিফ। মর্যাদাপূর্ণ এই আসনে দলেল ভাইস চেয়ারম্যান ইনাম আহমদ
চৌধুরীকে বিএনপির প্রার্থী করার দাবি জানিয়েছিলেন সিটি মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী। তবে তাঁর দাবি উপেক্ষা করে দলীয় চেয়ারপার্সনের উপদেষ্ঠা খন্দকার আব্দুল মুক্তাদিরকে প্রার্থী করে বিএনপি। এতে ক্ষুব্দ আরিফুল হক প্রথমে প্রচার প্রচারণা থেকে নিজেকে গুটিয়ে রাখেন। অবশ্য দলীয় মনোনয়ন পেয়েই নগর ভবনে গিয়ে আরিফের সাথে দেখা করেন মুক্তাদির।

এরপর গত ১৫ ডিসেম্বর মেয়রের বাসায় গিয়েও দেখা করেন বিএনপির এই প্রার্থী। এতে অনিচ্ছা সত্বেও ১৬ ডিসেম্বর মুক্তাদিরের পক্ষে মাঠে নামেন তিনি। অবশ্য এরআগে ১৩ ডিসেম্বর জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের কেন্দ্রীয় নেতারা সিলেটে মুক্তাদিরের পক্ষে গণসংযোগ চালালে তাতে অংশ নিয়েছিলেন আরিফুল হক। একাধিক নেতাকর্মী মনে করেন অর্থমন্ত্রীর ঋণ আর নিজের মনের ক্ষোভ ঝেড়ে ফেলে মুক্তাদিরের প্রতি কতটুকু আন্তরিক হতে পারবেন বিএনপির এই জনপ্রিয় নেতা।

গত জুলাইয়ে অনুষ্ঠিত সিলেট সিটি করপোরেশন নির্বাচনে মূলত আওয়ামী লীগে আস্থার সঙ্কট দেখা দেয়। সে নির্বাচনে বিএনপি প্রার্থী আরিফুল হকের কাছে হেরেছিলেন আওয়ামী লীগের মেয়র প্রার্থী বদরউদ্দিন আহমদ কামরান। পরাজয়ের পরই তিনি কেন্দ্রের কাছে সিলেটের দলীয় শীর্ষ নেতাদের বিরুদ্ধে তাঁর বিপক্ষে অবস্থান নেওয়ার অভিযোগ করেন।

কামরানের অভিযোগে তদন্তে নামে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটি। এ ঘটনায় তিন নেতাকে শোকজও করা হয়। তবে তাতেও কাটেনি আওয়ামী লীগের আস্থার সঙ্কট। বরং জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রাক্কালে তা আরও বেড়েছে। এই নির্বাচনে প্রতিপক্ষকে ঠেকানোর চাইতে আওয়ামী লীগের ঘরের বিভেদ দূর আর নেতাদের মধ্য আস্থা ফিরিয়ে আনাই বড় চ্যালেঞ্জ বলে মনে করেন নেতাকর্মীরা। এমনিতে সিলেট-১ আসনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী ড. একে আব্দুল মোমেনের পক্ষেই

মাঠে নেমেছে আওয়ামী লীগ। সব শীর্ষ নেতারাই প্রতিদিন প্রচারণা চালাচ্ছেন। গত সিটি নির্বাচনেও এমনটি দেখা গিয়েছিলো। অথচ বিএনপির প্রার্থী আরিফুল হক চৌধুরীর কাছে হেরে যান কামরান। নির্বাচনের ফলাফলে দেখা যায়, যেসব কেন্দ্রে আওয়ামী লীগ দলীয় কাউন্সিলররা বিপুল ভোটে জিতেছেন সেসব কেন্দ্রেও হারতে হয়েছে কামরানকে। আর তাই নির্বাচনের পরই অভিযোগ ওঠে দলের শীর্ষ নেতাদের বিরুদ্ধে। প্রকাশ্যে তারা কামরানের পক্ষে কাজ করলেও ভোটের দিন অনুসারীদের নিয়ে নৌকার প্রার্থীর বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ার অভিযোগ ওঠে।

হারের পর দলীয় প্রধান ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাথে দেখা করেও এমন অভিযোগ তুলেন কামরান। অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতের পরিবারও তাঁর বিরুদ্ধে ছিলো না বলে অভিযোগ করেছিলেন কামরান। এ অভিযোগ তদন্তে সিলেট আসেন দলের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরসহ আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতারা।

এঘটনায় আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক মিসবাহ উদ্দিন সিরাজ, সিলেট মহানগর সাধারণ সম্পাদক আসাদ উদ্দিন আহমদ ও সাংগঠনিক সম্পাদক শফিউল আলম নাদেলকে শোকজ করে কেন্দ্রীয় কমিটি। সেই আস্থাহীনতা আর বিভক্তি থেকে এখনো বেরুতে পারেনি সিলেট আওয়ামী লীগ।

এবার মনোনয়ন পাওয়ার আগ থেকেই মোমেনের বিরুদ্ধে ছিলেন মিসবাহ উদ্দিন সিরাজ ও বদরউদ্দিন আহমদ কামরান। দুজনেই সিলেট-১ আসন থেকে মনোনয়ন চেয়েছিলেন। শেষ পর্যন্ত মোমেনকে বেছে নেয় দল। দলীয় মনোনয়ন চূড়ান্ত হওয়ার পর প্রকাশ্যে মিসবাহ-কামরানসহ সব নেতাই মোমেনের পক্ষে মাঠে নেমেছেন। তবে কর্মীদের মধ্যে এখনও রয়ে গেছে আস্থাহীনতা।

সিলেট জেলা ও মহানগর আওয়ামী লীগের একাধিক নেতা জানিয়েছেন, দলের শীর্ষ নেতারা সকলে প্রকাশ্যে আওয়ামী লীগের প্রার্থীর পক্ষে কাজ করলেও তারা কতোটা আন্তরিক হয়ে কাজ করছেন এ নিয়ে প্রশ্ন আছে নেতাকর্মীদের মধ্যে। গত সিটি নির্বাচনের অভিজ্ঞতায় নেতাদের প্রতি কর্মীদের এই অবিশ্বাস তৈরি হয়েছে বলে মন্তব্য তাদের। এই নেতারা বলেন, আগামীতে নিজেদের পথ পরিষ্কার করতেও ‘বহিরাগত’ মোমেনকে ঠেকাতে পারেন শীর্ষ নেতারা।

তবে এমন শঙ্কা ও অভিযোগ উড়িয়ে দিয়েছেন ড. একে আব্দুল মোমেন। তিনি বলেন, আওয়ামী লীগে বিরোধ ও আস্থাহীনতা কথাগুলো মিডিয়ার সৃষ্টি। বাস্তবে এসবের কোনো অস্থিত্ব নেই। আওয়ামী লীগ ঐক্যবদ্ধ আছে। দলের সব নেতা আমার সাথে আছেন। তিনি বলেন, নির্বাচনে জয় পরাজয় থাকতেই পারে। গত সিটি নির্বাচনে দূভাগ্যবশত আমরা জিততে পারিনি। জাতীয় নির্বাচনে এর কোনো প্রভাব পড়বে না।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বাধিক পঠিত