প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

বাংলাদেশে ভারতবিরোধিতার সূচনাপর্ব

অসীম সাহা : ১৯৪৭ সালে দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে ভারতবর্ষ বিভক্ত হবার পর থেকেই ভারত ও পাকিস্তান উভয়ে উভয়ের চিরশত্রুতে পরিণত হয়। পাকিস্তানের জন্মের ভিত্তিটা যেহেতু দ্বিজাতিতত্ত্ব, সেহেতু প্রথম থেকে পাকিস্তানের ভারতবিরোধিতা ছিলো স্বাভাবিক। কিন্তু ১৯৭১ সালে ভারতের সার্বিক সহযোগিতায় যে বাংলাদেশে ভারতবিরোধিতা এতোটা তীব্র হয়ে উঠবে, তা কেউ কল্পনাও করতে পারেনি। ১৬ই ডিসেম্বর মুক্তিবাহিনী ও মিত্রবাহিনী একসঙ্গে বাংলাদেশে প্রবেশ করলে এদেশের লক্ষ লক্ষ মানুষ হাতে ফুলের মালা, বঙ্গবন্ধু এবং ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর ছবি হাতে নিয়ে তাদেরকে বরণ করে নিয়েছিলো, সেই বাংলাদেশের মানুষ কেন ক্রমাগত ভারতবিরোধী হয়ে উঠলো, তাকে খুব গভীর থেকে না দেখলে তার তল কোনোদিন খুঁজে পাওয়া যাবে না।

প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিলো মুক্তিযুদ্ধের সময় থেকেই। ক্ষমতালিপ্সু খন্দকার মোশতাক আহমদ, তাহের ঠাকুরসহ আরও অনেকেই মুক্তিয্দ্ধুকে ব্যর্থ করে দিতে পাকিস্তানের সঙ্গে কনফেডারেশনের চক্রান্তে লিপ্ত হয়েছিলো। কারণ তারা চায়নি, ভারতের সহযোগিতায় পাকিস্তান ভেঙে যাক। আওয়ামী লীগ করলেও তারা পাকিস্তান গোয়েন্দা সংস্থা আইএস আই এবং মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএর ক্রীড়নক হিসেবে কাজ করছিলো। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব পাকিস্তানের কারাগারে বন্দি থাকার ফলে কুষ্টিয়ার মেহেরপুরের বৈদ্যনাথতলায় যে প্রবাসী সরকার গঠিত হয়, সেখানে তাজউদ্দীনের প্রধানমন্ত্রী হওয়াকে মোশতাক কিছুতেই মেনে নিতে পারেনি। বয়সে যেহেতু তিনি সিনিয়র ছিলেন, সেহেতু তিনি নিশ্চিত ছিলেন, প্রধানমন্ত্রীর পদ তাকেই দেয়া হবে। সেটা না হবার ফলে তার মধ্যে প্রতিহিংসার আগুন জ্বলতে থাকে। এই মন্ত্রিসভায় তাকে পররাষ্ট্রমন্ত্রী করা হয়। সেই সুযোগ নিয়ে ভারতের অভ্যন্তরে এবং বিদেশে মুক্তিযুদ্ধ এবং ভারতের বিরুদ্ধে চক্রান্ত করার পথ সুগম হয়ে যায়। মুক্তিযুদ্ধের নয় মাসই এই চক্রান্ত অব্যাহত থাকে। কিন্তু একটা বিষয় আমার কাছে প্রশ্ন হয়েই আছে, মোশতাক এবং তার সহযোগীদের ব্যাপারে তাজউদ্দীনের সরকার কিংবা ভারতের গোয়েন্দা সংস্থা ‘র‘ কেন কোনোকিছুই বুঝতে পারেনি? তাদের এই চক্রান্তের কূট ভূমিকা উদ্ঘাটন করতে পারলে সময়মতো তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া যেতো। তা হলে হয়তো দেশ স্বাধীন হবার পর ১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে অমন মর্মন্তিকভাবে জীবন দিতে হতো না।

বঙ্গবন্ধু পাকিস্তান থেকে ফিরে এসে যে সরকার গঠন করেন, তাতে মোশতাকের অবস্থান অনেক শক্ত ভিত্তি পেয়ে যায়। নানামুখী ভুল তথ্যের ভিত্তিতে তাজউদ্দীনকে ছোট করে মোশতাককেই গুরুত্বপূর্ণ করে তোলা হয়। আর সেটাকেই পুঁজি করে বঙ্গবন্ধুর বিরুদ্ধে চক্রান্ত চলতেই থাকে। বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশের সংবিধানে গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, জাতীয়তাবাদ ও ধর্মনিরপেক্ষতা সন্নিবেশিত করেন। এটা মোশতাকচক্র এবং মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতাকারী শক্তির কাছে ছিলো মারণাঘাতের সমান। তখনও জামাতে ইসলামীসহ অন্যান্য উগ্র মুসলিম দলগুলো প্রকাশ্যে আসার সুযোগ না পেলেও তারা গোপনে এর বিরুদ্ধে একজোট হতে থাকে।

কিন্তু আগুনে ঘৃতাহুতির কাজটা শুরু করে আ স ম আব্দুর রবের নেতৃত্বে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জাসদ)। ছাত্রলীগের একাংশ বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের ধুয়া তুলে আওয়ামী লীগের একটি বিকল্প শক্তি হিশেবে নিজেদের দাঁড় করাবার চেষ্টা করে। ছাত্রলীগের অনেক মেধাবী ছাত্রই এতে বিভ্রান্ত হয়ে জাসদের রাজনীতিতে নিজেদের সম্পৃক্ত করেন। একইসঙ্গে যে মৌলবাদী শক্তি প্রকাশ্য রাজনীতির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট হতে পারছিলো না, তারা দলে দলে জাসদে যোগ দিতে থাকে। এতে জাসদের জনশক্তি বাড়লেও তাদের বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের দাবি যে সম্পূর্ণ উদ্দেশ্যপ্রণোদিত, তা অনেকের কাছেই স্পষ্ট হয়ে ওঠে। সে-সময়ে অনেকেই এমনও বলতে শুরু করে যে, ভারত শেখ মুজিবকে ভয় পায় বলে তাঁকে চাপের মধ্যে রাখার জন্যে জাসদের জন্ম দেয়! এটা কতোটা তথ্যভিত্তিক আর কতোটা গুজব, জাতির কাছে তা আজও স্পষ্ট হয়নি। তবে এটা স্পষ্ট হয়েছে ১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্টের পটভূমি তৈরি করার ক্ষেত্রে জাসদের একটি বিশাল ভূমিকা রয়েছে। কারণ তারা বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের কথা বলে মূলত বঙ্গবন্ধুর সিংহাসন টলোমলো করে দেয়ার জন্যেই মাঠে নামে এবং বঙ্গবন্ধুর বিরুদ্ধে যেমন আন্দোলন করতে থাকে, একইসঙ্গে ভারত বিরোধিতায়ও লিপ্ত হয়। আর এ-ক্ষেত্রে তারা ষোলো কলা পূর্ণ করে মেজর জলিলকে জাসদের সভাপতির পদ অলংকৃত করতে দিয়ে। তারপরের ইতিহাস অনেক বিস্তৃত। অনেকেই নিজ চোখে তা দেখেছেন। পালাবদলে অনেককিছুৃই বদলে গেছে। সে-ইতিহাস বারান্তরে লেখা যাবে।

লেখক : কবি ও সংযুক্ত সম্পাদক, দৈনিক আমাদের সময়

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত