প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

মঞ্চের বাইরে
চক্ষু রগড়াইয়া জাগিয়া উঠুন

সমকাল :  পুঁথিগত বিদ্যা আর পরহস্তে ধন- এই ধারণায় বিশ্বাসী ছিলেন না বেগম রোকেয়া। তাই তিনি তার লেখনীর মাধমে তুলে ধরেছেন- ‘আমি চাই সেই শিক্ষা যাহা তাহাদিগকে (নারীদের) নাগরিক অধিকার লাভে সক্ষম করিবে।’ তাই শিক্ষা শুধু পাঠ্যপুস্তকের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকুক তা তিনি চাননি। শিক্ষার ব্যাখ্যা করেছেন তিনি এভাবেই। অন্ন-বস্ত্রের জন্য নারী যেন কারও গলগ্রহ না হন- এটাই প্রত্যাশা এবং সেই প্রত্যাশা করে বসে থাকাটা জরুরি নয়। পুঁথিগত বিদ্যা নারীকে যদি তার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিখতেই হয় তার মধ্য থেকেও নারী তার কাজে লাগে এমন শিক্ষায় শিক্ষিত হবেন। রাতারাতি কোনো আন্দোলনের মাধ্যমে নারী সমাজ মর্যাদার আসনে প্রতিষ্ঠিত হতে পারবে না। এ জন্য প্রয়োজন শিক্ষা। এ সত্যকে উপলব্ধি করে তিনি বলেছেন, ‘সম্প্রতি আমরা যে এমন নিস্তেজ, সংকীর্ণমনা ও ভীরু হইয়া পড়িয়াছি ইহা অবরোধ থাকার জন্য হই নাই, শিক্ষার অভাবে হইয়াছি।’ ধর্মের দোহাই দিয়ে, পর্দার অন্তরালে রেখে নারীকে শুধু এতদিন পেছনেই ফেলে রাখা হয়েছে। কিন্তু ধর্মে, প্রত্যেকটি ধর্মে নারীকে দেওয়া হয়েছে সম্মানজনক জায়গা।

পুঁথিগত বিদ্যার মধ্য দিয়ে নারী হয়তো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে সনদ অর্জন করতে পারবেন। কিন্তু তিনি কি তার কর্মক্ষেত্রে যথেষ্ট যোগ্যতা এবং দক্ষতার পরিচয় দিতে পারবেন? নারীকে তার সেই যোগ্যতা-দক্ষতা অর্জন করতে হলে নিজেকে শিক্ষিত করে নিতে হবে যথার্থভাবে। নারীরা নিজেকে এমন শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে উঠতে হবে, যাতে তারা ভবিষ্যৎ জীবনে আদর্শ মানুষ, আদর্শ জননী এবং আদর্শ ব্যক্তিত্বের হতে পারেন।

আজ যে আমাদের নারীরা এত অধিকার সচেতন, সেরা হয়ে উঠছেন যোগ্যতায়-দক্ষতায় তার স্বপ্নটা গেঁথে দিয়েছিলেন এই বেগম রোকেয়াই। নারীরা নিজের পরিচয়ে পরিচিত হবেন, অনুকরণীয় হয়ে উঠবেন- এই স্বপ্নই দেখতেন বেগম রোকেয়া। নারী জাগরণের পথিকৃৎ বেগম রোকেয়া শুধু একজন সমাজ সংস্কারকই ছিলেন না। তিনি ছিলেন একজন অসাধারণ সাহিত্যিক। নবনূর, সওগাত, মোহাম্মদী ইত্যাদি সাহিত্যপত্রে তার কবিতা, প্রবন্ধ ও রস রচনা প্রকাশিত হয়েছে। তার সব ধরনের লেখাতেই ফুটে উঠেছে নারীদের সমস্যার কথা।

সালটা ১৮৮০। যে সময়ে বেগম রোকেয়া জন্মগ্রহণ করেন, তখন মুসলমান সমাজ ছিল নানা কুসংস্কারে আবদ্ধ। ছিল পর্দা প্রথা। নারীরা ছিলেন ঘরের ভেতরের মানুষ। বেগম রোকেয়ার পরিবারে পর্দা প্রথার এতই কড়াকড়ি ছিল যে, আত্মীয় পুরুষ তো দূরের কথা, বহিরাগত মহিলাদের সামনেও তাদের পরিবারের মেয়েদের পর্দা করতে হতো। তখন মেয়েদের পড়াশোনা মানেই ছিল ঘরে বসে কোরআন তেলাওয়াত আর উর্দু শিক্ষা। বাংলা বর্ণ পরিচয়ই ছিল তাদের জন্য নিষিদ্ধ। তাই যে মহীয়সী নারীর জন্য আজ আমরা নাসায় পর্যন্ত যাওয়ার স্বপ্ন দেখি তার কিন্তু পড়াশোনা হয়নি তেমন। স্কুল-কলেজে পড়ার সৌভাগ্য তার হয়নি। কিন্তু বেগম রোকেয়ার বড় ভাই ইব্রাহীম সাবের আধুনিক মনস্ক ছিলেন। তাই বেগম রোকেয়া এবং করিমুননেছাকে বাংলা ও ইংরেজি শেখাতেন তিনি। তা বাড়ির ভেতর বসেই।

সমাজে নারীর উন্নয়নের জন্য প্রথমে দরকার কন্যাশিশুদের উন্নয়ন। বেগম রোকেয়ার প্রতিটি লেখাতে নারীমুক্তির প্রতিফলন দেখা যায়। বাংলার মুসলিম নারী জাগরণ, নারী উন্নয়ন ও নারী মুক্তির অগ্রদূত বেগম রোকেয়া পুরুষশাসিত সমাজের নির্মম নিষ্ঠুরতা, অবিচার ও কুসংস্কারে জর্জরিত অশিক্ষা ও পর্দার নামে অবরুদ্ধ জীবনযাপনে বাধ্য নারী সমাজকে অন্ধকার থেকে আলোর পথে নিয়ে আসার জন্য সংগ্রাম করেছিলেন। মুক্তির পথ দেখিয়েছেন উপমহাদেশের রক্ষণশীল মুসলিম সমাজের নারীদের। তিনি বিশ্বাস করতেন, একমাত্র শিক্ষার মাধ্যমেই নারী সমাজ নীরব সামাজিক বিপ্লব ঘটাতে পারবে। নিজেদের মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করতে পারবে।

কবি নজরুলের বিখ্যাত বাণী- ‘বিশ্বে যা-কিছু মহান্‌ সৃষ্টি চির-কল্যাণকর, অর্ধেক তার করিয়াছে নারী, অর্ধেক তার নর।’ নারী নিজেকে তার যোগ্যতার শিখরে নিয়ে যাবেন। তাই বলে পুরুষকে ছোট করে নয়। পুরুষের সমকক্ষতা অর্জনের ক্ষেত্রে বেগম রোকেয়াও কখনও পুরুষকে ছোট করে দেখেননি। ‘আমরা সমাজের অর্ধাঙ্গ, আমরা পড়িয়া থাকিলে সমাজ উঠিবে কীরূপে? কোনো ব্যক্তি এক পা বাঁধিয়া রাখিলে সে খোঁড়াইয়া খোঁড়াইয়া কতদূর চলিবে? পুরুষের স্বার্থ এবং আমাদের স্বার্থ ভিন্ন নহে। তাহাদের জীবনের উদ্দেশ্য বা লক্ষ্য যাহা আমাদের লক্ষ্য তাহাই।’ একটি সুন্দর শৃঙ্খল সমাজ গঠনে নারী এবং পুরুষের সমতা অনস্বীকার্য।

‘ভগিনীরা! চক্ষু রগড়াইয়া জাগিয়া উঠুন, অগ্রসর হউন! মাথা ঠুকিয়া বল মা! আমরা পশু নই; বল ভগিনী! আমরা আসবাব নই; বল কন্যে আমরা জড়োয়া অলঙ্কাররূপে লোহার সিন্ধুকে আবদ্ধ থাকিবার বস্তু নই; সকলে সমস্বরে বলো আমরা মানুষ।’ প্রতিটি লেখায়, ধারণায় তিনি নারী জাগরণের কথাই বলেছেন। নিজেদের সচেতন হতেই বলেছেন। বস্তিবাসী নারীদের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় তিনি প্রতিষ্ঠা করেন ‘আন্‌জুমানে খাওয়াতীনে ইসলাম’ নামক প্রথম মুসলিম মহিলা সমিতি। এ ছাড়া বিধবাদের কর্মসংস্থান, দরিদ্র-অসহায় বালিকাদের শিক্ষার ব্যবস্থা করেন। কন্যাদের বিয়ের তদারকি করেন। দুস্থ মহিলাদের কুটির শিল্পের প্রশিক্ষণ দেন। নিরক্ষরদের অক্ষরজ্ঞান দান করেন। এভাবে নানা সামাজিক কাজ তিনি এগিয়ে নিয়ে যান।

আজ বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বাংলাদেশের নারীরা স্বপ্ন দেখেন নাসায় যাওয়ার। বিজ্ঞানী হয়ে বাবা-মা এবং দেশের স্বপ্নকে ছাড়িয়ে যাওয়ার আকাঙ্ক্ষা তাদের। নিজ গণ্ডি থেকে বের হয়ে পুরুষের কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে নারী স্বপ্ন দেখেছেন তার এগিয়ে যাওয়া। এবং সেই স্বপ্নকে সফল করার জন্য কাজ করে যাচ্ছেন দিনমান। বেগম রোকেয়ার স্বপ্ন শুধু স্বপ্ন হয়ে রইল না। আমাদের নারীরা পদে পদে তা সফল করে যাচ্ছেন।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বাধিক পঠিত