প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

রাজনীতিতে বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থার তৎপরতা-৩
আইএসআইয়ের সঙ্গে তারেক রহমানের যোগাযোগ

বাংলা ট্রিবিউন :  বড় রাজনৈতিক দলগুলোর নেতাদের সঙ্গে যোগসাজশের মাধ্যমে পাকিস্তানি গোয়েন্দা সংস্থা ইন্টার সার্ভিসেস ইন্টেলিজেন্স (আইএসআই) দেশের রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করছে। এ যোগসাজশ এমনকি কোনও কোনও দলের শীর্ষ নেতা পর্যন্ত বিস্তৃত। অনুসন্ধানে জানা গেছে, লন্ডনে অবস্থানরত বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সঙ্গেও আইএসআইয়ের রয়েছে নিবিড় যোগাযোগ। সৌদি আরবের জেদ্দায় গত ৪ জুলাই তারেক রহমানের সঙ্গে আইএসআইয়ের শীষর্স্থানীয় দুই কর্মকর্তার একটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে বলে জানা গেছে। দুবাই বিএনপির এক নেতার মাধ্যমে তারেক রহমান আইএসআইয়ের সঙ্গে পরোক্ষ যোগাযোগ রক্ষা করে চলেন। যোগাযোগের এরকম আরও একাধিক মাধ্যম আছে বলে জানা গেছে। আসন্ন নির্বাচনে ৩০০ আসনে আইএসআইয়ের পছন্দের প্রার্থীদের একটি তালিকা তারেক রহমানের কাছে পৌঁছেছে দুবাইয়ের ওই বিএনপি নেতার মাধ্যমে। গোয়েন্দা সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।
দীর্ঘদিন ধরে লন্ডনে অবস্থান করার কারণে এ বিষয়ে তারেক রহমানের কোনও বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।

তবে যোগাযোগ করা হলে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান দুদু  বলেন, ‘নির্বাচনকালীন সময়ে সরকার দ্বিধাহীনভাবে শত শত পুলিশকে পুরষ্কৃত করছে প্রমোশন দিয়ে। পুলিশ বেধড়ক পেটাচ্ছে, তছনছ করছে বিরোধীদলের নেতাকর্মীদের। নির্বাচনে সামান্যতম সুযোগ বা স্পেস দিচ্ছে না বিরোধীদলকে। এই বিষয়গুলো যদি সরকারকে রিপোর্ট করতে হতো এজেন্সিগুলোর, যে বিরোধীদলকে না দাঁড়াতে দেওয়াটা অগণতান্ত্রিক, তাহলে বুঝতাম আমাদের দেশের এজেন্সিগুলো গণতন্ত্রের জন্য কাজ করছে। কিন্তু, তারা যে বিষয়টি জাতির সামনে উপস্থাপন করছে তা নেহাতই বিভ্রান্তিকর। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বাদ দিয়ে অপ্রাসঙ্গিক একটা বিষয় সামনে এনে বিরোধীদলকে হেনস্তা করার একটা চেষ্টা করা হচ্ছে। ’

গোয়েন্দা সূত্র জানায়, তারেক রহমানের বিরুদ্ধে আইএসআই কানেকশনের অভিযোগ অনেক পুরনো। ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত বিএনপি সরকারের মেয়াদকালে তার বিরুদ্ধে এই অভিযোগ উঠেছিল। এমনকি মুম্বাই আন্ডারওয়ার্ল্ডের ডন দাউদ ইব্রাহীমের সঙ্গে তার বৈঠকেরও অভিযোগ আছে। সাম্প্রতিক আইএসআই যোগাযোগ প্রমাণ করে, বিএনপির এই শীর্ষ নেতা তার পুরনো যোগাযোগগুলো থেকে মোটেও সরে আসেননি। দুবাইতে বিএনপির যে নেতা আইএসআইয়ের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করছেন, তিনি বিএনপির সংযুক্ত আরব আমিরাত শাখার সভাপতি জাকির হোসেন। আইএসআইয়ের যে এজেন্টের সঙ্গে তার নিয়মিত বৈঠক অনুষ্ঠিত হচ্ছে তার নাম শহীদ মেহমুদ। গত ৬ মাসে দুবাইতে এ দুজন বিভিন্ন হোটেলকক্ষে অন্তত ১১ বার দেখা করেছেন বলে নথিপত্রে পাওয়া তথ্যে জানা গেছে। সর্বশেষ গত ৭ ডিসেম্বর এই দুজন দেখা করেন।
গোয়েন্দা সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র বলছে, জাকির হোসেন লন্ডনে তারেক রহমানের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করে চলেছেন। পাকিস্তানি এজেন্টের সঙ্গে বৈঠকে তিনি তারেক রহমানকে ‘বস’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন এবং আইএসআইয়ের বার্তা তারেক রহমানকে পৌঁছে দেওয়া হয়েছে বলে নিশ্চিত করেছেন। জাকির হোসেনই মূলত দুই পক্ষের মধ্যে একটি যোগসূত্রের ভূমিকা পালন করছেন।
দুবাইতে অবস্থানরত আইএসআই এজেন্ট শহীদ মেহমুদের সম্পর্কে খোঁজখবর করে দেখা গেছে, তিনি পাকিস্তান সেনাবাহিনীর একজন অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট কর্নেল। ২০০৪ সালে অবসরে যাওয়ার আগ পর্যন্ত তিনি আইএসআইতেই নিয়োজিত ছিলেন। অবসর যাওয়ার পরও আইএসআইয়ের এজেন্ট হিসেবে তিনি কাজ করে যাচ্ছেন। সম্প্রতি বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেনের সঙ্গে আইএসআইয়ের মেহমুদ নামে এক ব্যক্তির যে ফোনালাপ ফাঁস হয়েছে, সেই ব্যক্তিই হলেন আইএসআইয়ের এজেন্ট শহীদ মেহমুদ। তিনি আইএসআইয়ের নীতিনির্ধারণী কর্মকর্তা জাভেদ মেহদীর সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখেন এবং মূলত: জাভেদ মেহদির সঙ্গে বিএনপি ও জামায়াত নেতাদের যোগসূত্র হিসেবে কাজ করেন।
যদিও ড. খন্দকার মোশারফ হোসন বলেছেন, ‘আমি এ বিষয়ে একটি বিবৃতি দিয়েছি। বিষয়টি মিথ্যা, বানোয়াট ও ভুয়া। ওই (শহীদ মেহমুদ) নামে আমি কাউকে চিনিও না। আমি কারও সঙ্গে কথাও বলিনি।’ বিএনপির শীর্ষ নেতাদের মাধ্যমে বাংলাদেশের রাজনীতিতে আইএসআই প্রভাব বিস্তারের প্রসঙ্গে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমার সঙ্গে কারও কথা হয়নি। আমার এ বিষয়টি জানা নেই।’
জাকির হোসেন ও শহীদ মেহমুদের একাধিক কথোপকথন থেকে জানা যায়, এ বছরের ৪ জুলাই সৌদি আরবের জেদ্দায় তারেক রহমানের সঙ্গে আইএসআইয়ের শীর্ষ কর্মকর্তা ও এক নীতি নির্ধারণী কর্মকর্তা জাভেদ মেহেদীর একটি বৈঠক হয়েছে। এ বছরের জুন মাসে আইএসআই এজেন্ট শহীদ মেহমুদ ও বিএনপি নেতা জাকির হোসেনের একটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এতে শহীদ মেহমুদ জেদ্দায় আইএসআইয়ের ‘নাম্বার ওয়ান নীতিনির্ধারক’ ও জাভেদ মেহেদীর সঙ্গে জাকির হোসেনের ‘বস’-এর আসন্ন বৈঠক নিয়ে ব্রিফ করেছেন। শহীদ মেহমুদ জাকির হোসেনকে বলেন, তিনি যেন তার ‘বস’কে বলেন, এ বৈঠক জুলাই মাসের প্রথম সপ্তাহে নির্ধারণ করা হয়েছে।
সূত্র জানায়, জুন মাসেই আরেক বৈঠকে শহীদ মেহমুদ জাকির হোসেনকে জানান, জেদ্দায় নির্ধারিত ওই বৈঠকটি ৪ জুলাই বিকেল ৪টায় অনুষ্ঠিত হবে বলে ঠিক করা হয়েছে। তারেক রহমানের তরফ থেকেও যাতে বৈঠকে উপস্থিতির বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়। শহীদ মেহমুদ জাকির হোসেনকে আরও বলেন, পাকিস্তানের ওই কর্মকর্তার সঙ্গে যাতে তার ‘বস’ সবকিছু আলোচনা করেন, কেননা তিনি আইএসআইয়ের সর্বময়কর্তা। সেখানেই সব সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
গোয়েন্দা সূত্র জানায়, চলতি বছরের ৪ জুলাই থেকে ৬ জুলাইয়ের মধ্যে জাকির হোসেন ও শহীদ মেহমুদের মধ্যে পরবর্তী আরও কয়েকটি ফোনালাপে এটা স্পষ্ট যে, ৪ জুলাই জেদ্দায় নির্ধারিত ওই বৈঠকটি হয়েছিল। জাকির হোসেন এ বৈঠককে ‘সফল’ বলে উল্লেখ করেন। ওই বৈঠকের বিবরণ থেকে জানা যায়, আইএসআই তাদের পছন্দের প্রার্থীদের একটি তালিকা জাকির হোসেনকে দিয়েছে। জাকির হোসেন তারেক রহমানের কাছে তা পৌঁছানোর বিষয়টি নিশ্চিত করেন। সূত্র বলছে, নথিপত্র ও বৈঠকের আলোচনা থেকে তারা স্পষ্ট হয়েছেন যে, লন্ডনে অবস্থানরত তারেক রহমান পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআইয়ের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রাখছেন। যোগাযোগের ক্ষেত্রে দুবাইতে আইএসআইয়ের এজেন্ট একটি বড় মাধ্যম হিসেবে কাজ করছে।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত