প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

প্রতিমাসে বিপিডিবি’র লোকসান ১ হাজার কোটি টাকা

শাহীন চৌধুরী: বর্তমানে দেশে উৎপাদনে রয়েছে মোট ১২৫টি বিদ্যুৎকেন্দ্র। এর মধ্যে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি’র) নিজস্ব বিদ্যুৎকেন্দ্রের সংখ্যা ৪১। বাকি ৮৪ টিই ব্যক্তিমালিকানাধীন অথবা পাবলিক কোম্পানির মালিকানাভুক্ত, যেগুলো থেকে বিদ্যুৎ কিনছে বিপিডিবি। এগুলোর মধ্যে আবার রেন্টাল ও কুইক রেন্টাল ২৮টি এবং আইপিপি ও এসআইপিপি ৪৭টি। এই বিদ্যুৎকেন্দ্রের ৫৪টিই জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করে ফার্নেস ও ডিজেল, যা সবচেয়ে ব্যয়বহুল।

সংশ্লিষ্ট সূত্রমতে, এসব বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে বিদ্যুৎ কিনতে বিপিডিবির ইউনিট প্রতি ব্যয় হয় গড়ে ৬ টাকা ২৫ পয়সা। যদিও ফার্নেস অয়েল ও ডিজেল চালিত কিছু বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রতি ইউনিটের দাম ২৭ টাকা পর্যন্ত রয়েছে। এ দামে বিদ্যুৎ কিনে বিতরণ কোম্পানিগুলোর কাছে বিপিডিবিকে বিক্রি করতে হচ্ছে ৪ টাকা ৮৪ পয়সায়। ফলে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতে বিপিডিবির ঘাটতি থাকছে ১ টাকা ৪১ পয়সা। বিভিন্ন কোম্পানির কাছ থেকে কেনা বিদ্যুতের বিপরীতে প্রতি মাসে এ ঘাটতি দাঁড়ায় ৮০০ থেকে ১ হাজার কোটি টাকা, যা অর্থ মন্ত্রণালয়ের অনুদান পাওয়া ভর্তুকি থেকে পরিশোধ করে বিপিডিবি।

বিদ্যুৎকেন্দ্রের যন্ত্রাংশ আমদানিতে রয়েছে শতভাগ শুল্ক ও ভ্যাট অব্যাহতি সুবিধা। শতভাগ কর অবকাশ সুবিধাও রয়েছে ১৫ বছরের জন্য। এ নীতি সহায়তার সবটাই ভোগ করছে বেসরকারি বিদ্যুৎ কোম্পানিগুলো। এতে এ খাতের বেসরকারি উদ্যোক্তারা লাভবান হলেও এসব কেন্দ্র থেকে বেশি দামে বিদ্যুৎ কিনে লোকসানের অংক বড় করছে রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান বিপিডিবি। এরই মধ্যে প্রতিষ্ঠানটির পুঞ্জীভূত লোকসান ৪২ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে।

নীতি সহায়তা নিয়ে বিদ্যুৎ খাতের বেসরকারি উদ্যোক্তারা বড় অংকের মুনাফায় থাকলেও লোকসানের অংক বড় হচ্ছে বিপিডিবির। বাংলাদেশ অর্থনৈতিক সমীক্ষা ২০১৮ অনুযায়ী, গত ১১ বছরে রেন্টাল ও কুইক রেন্টাল কেন্দ্র থেকে বিদ্যুৎ কিনে বিপিডিবি লোকসান দিয়েছে ৪২ হাজার ৬১ কোটি টাকা। কুইক রেন্টাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের সংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে লোকসানের পরিমাণও বেড়েছে। প্রতি বছর এ খাতে বড় অংকের ভর্তুকিও দিতে হচ্ছে সরকারকে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বেসরকারি উদ্যোক্তাদের নানা সুবিধা দেয়া হলেও তাদের কাছ থেকে বেশি দামেই বিদ্যুৎ কিনছে বিপিডিবি। এমনকি প্রতি বছর যে হারে বাজেটারি সাপোর্ট বা ভর্তুকি দেয়া হয়, তাতেও বাড়তি সুবিধা নেই বিপিডিবির। তবে নীতি সহায়তা কাজে লাগিয়ে ব্যবসা বড় করছে বেসরকারি কোম্পানিগুলো। আগে যে কোম্পানির একটি বিদ্যুৎকেন্দ্র ছিল, ১০ বছরের ব্যবধানে একই কোম্পানি এখন একাধিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের মালিক।

বেসরকারি উদ্যোগে বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনে প্ল্যান্ট ও ইকুইপমেন্ট আমদানিতে ১৯৯৭ সালে প্রথম শুল্কমুক্ত সুবিধা দেয় জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। একই সময়ে ছাড় দেয়া হয় মূল্য সংযোজন কর (মূসক) ও সম্পূরক শুল্কেও। পরবর্তী সময়ে ২০০০ সালে ছাড়ের তালিকায় যন্ত্রাংশকেও যোগ করা হয়। ২০০৫ সালে আরেক আদেশে বিদ্যুৎকেন্দ্রে ব্যবহৃত যন্ত্রাংশের পাশাপাশি অন্যান্য পণ্যকেও ১৫ শতাংশের অতিরিক্ত শুল্ক থেকে অব্যাহতি দেয় এনবিআর। ২০১৫ সালে এটি আরো কমিয়ে ৫ শতাংশের অতিরিক্ত শুল্ক ও মূসক থেকে অব্যাহতি দেয়া হয়। আয়করের ক্ষেত্রেও বেসরকারি খাতের বিদ্যুৎ কোম্পানিগুলোকে ১০ বছরের কর অবকাশ সুবিধা দেয় এনবিআর। ২০১৩ সালে দেয়া এ সুবিধার আওতায় বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরুর পর প্রথম পাঁচ বছর শতভাগ, পরবর্তী তিন বছর ৫০ শতাংশ ও শেষ দুই বছর ২৫ শতাংশ হারে এ সুবিধা দেয়া হয়। এতে কোম্পানিগুলোকে বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু করার জন্য ২০১৫ সালের ১ জানুয়ারি পর্যন্ত সময়সীমা বেঁধে দেয়া হলেও পরবর্তী সময়ে তা বাড়িয়ে করা হয় ২০১৮ সালের জুন পর্যন্ত। সর্বশেষ জারি করা এসআরও’র মাধ্যমে এটি বাড়িয়ে ২০১৯ সালের জুন পর্যন্ত করা হয়েছে। পাশাপাশি ১৫ বছরের জন্য শতভাগ কর অবকাশ সুবিধাও দেয়া হয়েছে। ফলে ২০৩৪ সাল পর্যন্ত কর অবকাশ সুবিধা পাচ্ছে বিদ্যুৎ কোম্পানিগুলো। তবে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কোম্পানির জন্য ১৫ বছরের শতভাগ কর অবকাশ সুবিধার পাশাপাশি বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরুর জন্য ২০২৩ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত সময় দেয়া হয়েছে।

এদিকে বিদ্যুৎ খাতে এ সুবিধা কাজে লাগিয়ে ব্যবসা বড় করছে বেসরকারি বিদ্যুৎ কোম্পানিগুলো। দেশে পুঁজিলগ্নির বিপরীতে মুনাফায় এখন শীর্ষে রয়েছে বিদ্যুৎ খাত। উৎপাদন খাতের অন্য সব ব্যবসায় বিনিয়োগের বিপরীতে মুনাফা গড়ে ১৫ শতাংশের নিচে থাকলেও বিদ্যুতে তা ৩৫ শতাংশের বেশি। তালিকাভুক্ত বিদ্যুৎ কোম্পানিগুলোর আর্থিক প্রতিবেদনের তথ্যানুযায়ী, ২০১৭ সালে এ খাতে পুঁজিলগ্নির বিপরীতে গড়ে মুনাফার মার্জিন ছিল ৩৭ দশমিক ৬০ শতাংশ।

এ বিষয়ে বিপিডিবির চেয়ারম্যান প্রকৌশলী খালেদ মাহমুদ বলেন, অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে যে ভর্তুকি দেয়া হয়, সেটা দিয়ে আমরা বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রের বকেয়া পরিশোধ করি। এখানে আমাদের অন্য কোনো সুবিধা নেই। তবে বর্তমানে যে মার্জিন আমাদের দেয়া হচ্ছে, সেটা বাড়ালে হয়তো বিপিডিবির আয় কিছুটা বৃদ্ধি পাবে।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বাধিক পঠিত