প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

যদি সম্ভব হয় আমি আমার শৈশবে ফিরে যেতে চাইবো: জামিলুর রেজা চৌধুরী

প্রিয়.কম: নয় না ছয়, ছয় না নয় এ হিসাব মিলাতেই অনেকটা সময় চলে গেল। ছয় নম্বর রোড নয় নম্বর বাসা নাকি নয় নম্বর রোড ছয় নম্বর বাসা? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে জট পাকিয়ে গেল সব কিছুর। বলা যায় সিক্সটিনাইন ক্রাইসিস। যাক, শেষ পর্যন্ত বিষয়টার একটা রফা করে পৌঁছানো গেল ড.জামিলুর রেজা চৌধুরীর নতুন বাসায়।

ততক্ষণে ঘড়ির কাঁটা দুপুর ১২টায়। এক ঘণ্টা লেট! ভেবেছিলাম বকা দেবেন। কিন্তু তেমন কিছুই হলো না। হাসিমুখে মানুষটি দাঁড়ালেন সামনে। আর বললেন, ‘রাব্বানী কে?’ আমি হাতটা বাড়িয়ে দিয়ে বলি, ‘জ্বি আমি’। আমাদের বসতে বলে তিনি চলে গেলেন ভেতরের রুমে। ঘরটায় চোখ বুলাতেই স্নিগ্ধতার আলো খেলা করতে দেখলাম চারদিকে। কাঁচা ফুলের দুটি তোড়া সাজানো। বইপত্র আর কিছু শো-পিস দিয়ে সাজানো রুম। খুব চট জলদিই জেআরসি ফিরে আসলেন। বসতে বসতে বললেন, হ্যাঁ বল কি জানতে চাও।

আপনার কাছ থেকে তো জানার শেষ নেই। তবে আমরা এসেছি আপনার সঙ্গে গল্প করতে…

জামিলুর রেজা চৌধুরী: খুব ভালো। চা তো খাবে?

সে তো খাব। তার আগে আপনাকে অভিনন্দন জানাতে চাই একুশে পদক প্রাপ্তিতে।

জামিলুর রেজা চৌধুরী: ধন্যবাদ তোমাদের।

বছরের শুরুতে নিশ্চয়ই এ খবরটা আপনার জন্য আনন্দের…

জামিলুর রেজা চৌধুরী: পদক প্রাপ্তিতে আমি আনন্দিত। রাষ্ট্রীয় পর্যায়ের একটা স্বীকৃতি। আমার অনুপ্রেরণা। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে সাধারণত একুশে পদক দেওয়া হয় না। সরকার যে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে একুশে পদক দিচ্ছে, এটা ভালো দিক।

আপনি তো দীর্ঘদিন ধরেই প্রযুক্তির নানান মাধ্যম নিয়ে কাজ করছেন। তো প্রযুক্তির সঙ্গে প্রাণের ছোঁয়া দেওয়া যায় কিভাবে?

[এর মধ্যে সেল ফোন বেজে ওঠে জনাব চৌধুরীর। অনেক্ষণ ধরে রিং বাজতে থাকে। বেশ কিছুক্ষণ রিং হবার পর তিনি বলেন…আমার এই হ্যান্ডসেটটা নতুন। নতুন ফিচার আছে। আমি এখনো অভ্যস্থ হতে পারিনি।’ তারপর ফোনটা রিসিভ করলেন। ফোনের কথা শেষে প্রসঙ্গে ফিরে আসেন আবার।]

জামিলুর রেজা চৌধুরী: বলছিলে প্রাণের ছোঁয়া…

জ্বি…

জামিলুর রেজা চৌধুরী: প্রযুক্তিতে প্রাণের ছোঁয়া দেওয়ার তো চেষ্টা করা হচ্ছে। কিন্তু মানুষের প্রাণের কাছাকাছি যাওয়াটা কোনোদিন সম্ভব না। হয়তো কিছুটা কাছাকাছি যেতে পারবো আমরা। একটা কথা বলি আমি তো শিক্ষক হিসেবে গত পঞ্চাশ বছর ধরে পড়াচ্ছি। আমি একটা কথা সব সময় বলি যে, প্রযুক্তি নিয়ে পড়া মানে এই নয় যে সব সময় প্রযুক্তি নিয়ে থাকবে হবে। এটা আমার কথা না, ফজলুর রহমান খানের কথা। শুধু প্রযুক্তিতে থাকলে হবে না। মানুষকে জানতে হবে। ফাইন আর্টসের অন্যান্য বিষয়গুলো জানতে হবে। যেমন আমার ছাত্র আনিসুল হক আছে। তাকে আমি ছাত্রজীবনে বেশ কিছু সিনেমা দেখার পরামর্শ দিয়েছিলাম। কারণ সিনেমায় জীবনের বিভিন্ন সমস্যার সমাধান পাওয়া যায়।

মননের চোখ খুলে দেয়…

জামিলুর রেজা চৌধুরী: হ্যাঁ, প্রযুুক্তি নিয়ে সব সময় থাকলে তো আর হবে না।

[কথা থামিয়ে এর মধ্যে নূরু নামে একজনকে ডেকে চা দিতে বললেন। সঙ্গে আস্তে কথা বলার নির্দেশনাও দিয়ে দিলেন।]

প্রকৌশলী বাড়ি হিসেবে আপনাদের সিলেটের বাড়িটি পরিচিতি ছিল…

জামিলুর রেজা চৌধুরী: আমার বাবা ও তার ভাইসহ পরিবারের প্রায় ১২-১৩ জন সদস্য প্রকৌশলী ছিলেন। বাবা ১৯২৯ সালে শিবপুর ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ থেকে পুরকৌশলে স্নাতক ডিগ্রী লাভ করেন। সিলেটের জাফলং সীমান্ত এলাকায় ভারতীয় অংশে তিন পাহাড়ের মধ্যবর্তী স্থানে যে ঝুলন্ত সেতুটি আছে সেটি আমার বাবার করা। এটি সিলেট অঞ্চলের অন্যতম প্রধান ও প্রথম ঝুলন্ত সেতু।

তো শৈশবেই আপনি জেনে যান যে আপনি প্রকৌশলী হবেন…

জামিলুর রেজা চৌধুরী: তা শৈশব থেকেই মোটামুটি ঠিক হয়েছিল যে আমি বড় হয়ে প্রকৌশলী হব।

আপনি কি শৈশবে খুব দুষ্টু ছিলেন…

জামিলুর রেজা চৌধুরী: দুষ্টু বলতে যা বোঝায় তা ছিলাম না। তবে শৈশবের দূরন্তপনা তো ছিল। যেমন একটা উদাহারণ দেই। আমাদের সিলেটের বাড়িটা ছিল একটা টিলার উপর। সরকারি চাকরি সূত্রে বাবার একটা গাড়ি ছিল। ঐ গাড়ির ড্রাইভারের সঙ্গে আমার খুব সখ্যতা ছিল। সে ড্রাইভিং সিটে বসে আমাকে তার কোলে বসিয়ে রাখতো আর আমি স্ট্রেয়ারিং ধরে থাকতাম। এটা ছিল রোজকার বায়না আমার। একবার আমি গাড়ি খালি পেয়ে একাই উঠে বসি ড্রাইভিং সিটে। এবং কিভাবে যেন গাড়িটা চলতে শুরু করলো। আমি দেখলাম গাড়িটা টিলা থেকে নিচ দিকে নেমে যাচ্ছে। এমন সময় দৌড়ে এসে আমাদের ড্রাইভার আমাকে রক্ষা করেন।

বাবার হাতে মার খাওয়ার স্মৃতি মনে আছে কী?

জামিলুর রেজা চৌধুরী: বাবা আমাকে খুব একটা মারধর করেন নি। তবে মনে আছে একবার মেরেছিলেন। আমরা তখন ময়মনসিংহ থাকি। আমার বয়স তখন সাড়ে তিন বছর। আমাদের বাড়ির ওখানে একটা কাঠের মাচা বানানো হয়েছে। সাড়ে সাত ফিটের কাঠের মাচা। তো আমি এবং আরো কয়েকজন বন্ধু মিলে আমরা এটাকে লাফা-লাফি খেলার জায়গা বানিয়ে ফেললাম। আমরা মাচার উপর উঠে নিচে লাফ দিয়ে পড়ি। বাবা দেখে বারণ করলেন কিন্তু শুনলাম না। একদিন বাবা অফিস থেকে ফিরে দেখলেন আমি লাফ দিচ্ছি ঐ মাচার উপর থেকে। তখন তিনি আমাকে ধরে নিয়ে মারধর করলেন। সেই শেষ। আর কোনোদিন এমন হয়নি।

প্রকৌশল বাড়ির ছেলে হলেও আপনি তো বড় হয়েছেন একটা সাংস্কৃতিক পরিবেশের মধ্যেই…

জামিলুর রেজা চৌধুরী: সেই পরিবেশটা আমরা ছোটবেলা থেকেই পেয়েছি। ইঞ্জিনিয়ার মানেই রসকষহীন হতে হবে বিষয়টা এমন না। বাবা বাসায় নিয়মিত দেশ বিদেশের ম্যাগাজিন বই আনতেন। আমি সেগুলো উল্টেপাল্টে দেখতাম। বাড়ির নকশা, ব্রিজের ছবি। আউট বই বেশি পড়তাম। বাবা নিজে বই পড়তেন, আমাদের বই পড়তে দিতেন।

ময়মনসিংহে তো আপনার শৈশবের বেশ কিছু সময় কেটেছে…

জামিলুর রেজা চৌধুরী: জীবনের প্রথম স্কুল তো ছিল ময়মনসিংহেই। যদিও আমি ঐ স্কুলে একদিন ক্লাস করেছিলাম। আনন্দমোহন কলেজের পাশেই আমাদের বাড়ি ছিল। বাড়ির সামনে এক বিশাল খেলার মাঠ। শীতকাল আসলেই আমি ব্রহ্মপুত্র নদের ‍বিশাল চরে চলে যেতাম। ঘুরতাম বেড়াতাম। সেই সব স্মৃতি খুব মিস করি। ময়মনসিংহ থেকে ঢাকায় চলে আসি আমরা। সেই যে ঢাকায় আসলাম আর ফিরে গেলাম না।

ঢাকায় আসার গল্পটা যদি বলতেন…

জামিলুর রেজা চৌধুরী: ট্রেনে করে ময়মনসিংহ থেকে আমরা ঢাকার ফুলবাড়িয়া রেল স্টেশনে এসে নামলাম। আমাদের জন্য একটা গাড়ি ঠিক ছিল। গাড়িতে করে যেতে যেতে সেদিন দেখছিলাম পল্টন ময়দানে মানুষের ভিড়। ঐ দিন বা পরের দিন খাজা নাজিমুদ্দিন ঘোষণা দিয়েছেন যে, উর্দু ভাষা হবে রাষ্ট্রীয় ভাষা। এ নিয়ে আন্দোলন শুরু হয়েছে। আমরা গোপিবাগের যে বাসাটায় ছিলাম তার পাশেই একটা মাঠ ছিল। ঐ মাঠে নিয়মিত রাজনৈতিক সমাবেশ হত। মিছিল দেখলে পেছন পেছন চলে যেতাম।

আপনি তো আন্দোলন সংগ্রামের মধ্যেই বড় হয়েছেন…

জামিলুর রেজা চৌধুরী: তা বলতে পারো। বাঙালি জীবনের সকল বড় বড় আন্দোলন সংগ্রামের সাক্ষী আমি।

আপনার বাসায় প্রচুর বই দেখতে পাচ্ছি। কার কার লেখা পড়তে ভালো লাগে…

জামিলুর রেজা চৌধুরী: ঢাকায় যখন আমরা এলিফেন্ট রোডের বাসায় উঠি, তখন আমি দিনের অধিকাংশ সময় কাটাতাম পাবলিক লাইব্রেরিতে। এখন যেটা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইব্রেরি তখন এটা ছিল পাবলিক লাইব্রেরি। আমি সকালে নাস্তা করে চলে যেতাম দুপুরে এসে ভাত খেয়ে আবার বিকাল পর্যন্ত লাইব্রেরিতেই থাকতাম। আমার এক বন্ধু ছিল আজিমপুরে থাকতো। আমি বই আনতে ওদের বাসায় চলে যেতাম। বইয়ের পোকা আছে মাথায়। শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের লেখা আমার পছন্দ। বলতে পারো উনি আমার প্রিয় লেখক। তখন গোয়েন্দা সিরিজ পড়তাম খুব। সুবোধ ঘোষের লেখা পছন্দ আমার।

একটু অন্য প্রসঙ্গে আসি। আপনি তো দেখতে খুব সুদর্শন। যৌবনে নিশ্চয়ই প্রচুর প্রেমের প্রস্তাব পেতেন…

[প্রশ্নটা শুনে একটু লাজুক হাসলেন। কিছুটা সময় নিয়ে বললেন]

জামিলুর রেজা চৌধুরী: না তেমন ঘটনা নেই আমার জীবনে।

আপনার কাউকে ভালো লাগেনি…

জামিলুর রেজা চৌধুরী: প্রেম আমার ছিল, তবে সেটা স্পোর্টসে। আমি যতটা সময় ক্লাসে ছিলাম তারচেয়ে বেশি সময় থাকতাম খেলার মাঠে। সব ধরনের খেলাই খেলতে জানি। ফুটবল, টেবিল টেনিস, ক্রিকেট, হকি। আমি ১৯৭২ সালে ঢাকায় বিলিয়ার্ড চ্যাম্পিয়ন হয়েছিলাম। ঘোড়া দৌড়াতে জানতাম আমি। খেলাতে বেশি সময় দিয়েছি। আর তখন তো মেয়েদের সঙ্গে দেখাই হত না। আমাদের ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে কোন মেয়ে ছিল না।

পদ্মা সেতুর কাজ নিয়েই তো আপনার এখন ব্যস্ততা।

জামিলুর রেজা চৌধুরী: হ্যাঁ। প্রতিদিনই এখন সেতুর কাজ নিয়ে ব্যস্ত থাকতে হচ্ছে। এর মাঝে দেশের বাইরে যেতে হবে।

২০১৮ সালের মধ্যে কি কাজ শেষ হবে?

জামিলুর রেজা চৌধুরী: এখনো বলা যাচ্ছে না। হয়তো ২০১৯ সাল পর্যন্ত সময় লাগবে।

সেতু হলে নদীটা কি মারা যাবে না?

জামিলুর রেজা চৌধুরী: নদী মরবে কেনো! যমুনা নদী তো মরেনি। পদ্মাও মরবে না।

শেষ প্রশ্ন। যদি এই মূহুর্তে আপনাকে আলাদিনের চেরাগ দেওয়া হয় তার কাছে কি চাইবেন?

[একটু হাসলেন।

জামিলুর রেজা চৌধুরী: একটা জিনিসই চাইবো, যদি সম্ভব হয় আমি আমার শৈশবে ফিরে যেতে চাইবো।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত