প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

প্রধানমন্ত্রীর অভিযোগ এবং ইসির বিরোধ

বিভুরঞ্জন সরকার: নির্বাচনের মাত্র নয় দিন আগে নতুন করে শঙ্কা তৈরি হচ্ছে মানুষের মধ্যে। কিছু জায়গায় কিছু হিংসাত্মক ঘটনা ঘটলেও সারা দেশের পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে নয়। বরং দিন দিন নির্বাচনী প্রচারণা জমে উঠছে। বিএনপি প্রার্থীরাও মাঠে নেমেছেন। কোথাও উৎসাহ-উদ্দীপনার সঙ্গে, কোথাও একটু পিছু টান নিয়ে, ভয়-ভীতির মধ্যে। সামগ্রিক পরিবেশ যে বিএনপির অনুকূলে নয়, এটা নিয়ে বিতর্কের কিছু নেই। নির্বাচনে অংশ নিতে বিএনপির অনীহা ছিলো। কিন্তু দলের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখা এবং দেশের বাইরের বিভিন্ন মহলের মনোভাবের কারণেই অনিচ্ছুক বিএনপি নির্বাচনে এসেছে। নির্বাচন বর্জনের নীতি কেউ সমর্থন করে না।

ধারণা করা হয়, বিএনপিকে নির্বাচনে আনার ব্যাপারে ড. কামাল হোসেনের একটি বড় ভূমিকা আছে। ড. কামাল হোসেনের ভূমিকায় শুধু বিএনপি লাভবান হলো, নাকি সরকারও কিছু মুনাফা পেলো, সেটা বিচারের সময় এখনও আসেনি। এজন্য আমাদের নির্বাচনের শেষ পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। তবে এটা স্বীকার করতেই হবে যে আগামী নির্বাচনটা অংশগ্রহণমূলক হওয়ার ক্ষেত্রে কামাল হোসেন যথেষ্ট ইতিবাচক অবদান রেখেছেন। কামাল হোসেনের উদ্যোগ-প্রচেষ্টা বিএনপির নির্বাচনে আসার ক্ষেত্র প্রস্তুত করেছে। বিএনপি নির্বাচনে না এলে রাজনৈতিক সংকট ঘনীভূত হতো।

কেউ অবশ্য প্রশ্ন করতে পারেন যে, বিএনপি নির্বাচনে আসায় কি রাজনৈতিক সংকট দূর হয়েছে? না, অবশ্যই সব সংকট দূর হয়নি। সংকট যেমন একদিনে তৈরি হয় না, তেমনি একরাতে সংকটের সমাধানও হয় না । নির্বাচনে বিএনপির অংশগ্রহণ থেকে এটা অন্তত বোঝা গেছে যে, কোনো সমস্যাই সমাধানঅযোগ্য নয়। দরকার সদিচ্ছা ও আন্তরিকতা।
নির্বাচন নিয়ে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা শুরু থেকেই আছে। নির্বাচন হওয়া, না-হওয়া নিয়ে তর্ক-বিতর্ক অব্যাহত থাকার মুখেই গত বুধবার, ১৯ ডিসেম্বর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিজেই অভিযোগ করেছেন, ‘নির্বাচনে বিজয়ী হতে বিএনপি ভুয়া ব্যালট পেপার ছাপাচ্ছে এবং টাকা ছড়াচ্ছে’। প্রধানমন্ত্রী যেহেতু সরকার প্রধান, শীর্ষে অবস্থানের কারণে তার কাছে সব রকম তথ্য আছে, আছে সব গোয়েন্দা প্রতিবেদন। তাই আমাদের ধরে নিতে হবে যে, প্রধানমন্ত্রী যে অভিযোগ করেছেন তা ভিত্তিহীন নয়। আমরা এটাও আশা করবো যে, প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে যথাযথ তদন্ত করে অপরাধীদের শনাক্ত ও শান্তি দেয়ার ব্যবস্থা করা হবে।

প্রধানমন্ত্রী দলীয় কর্মীদের বলেছেন, ‘আমি আপনাদের বলতে চাই, কোথায় এবং কোন কোন ছাপাখানায় এ ধরনের ভুয়া ব্যালট পেপার ছাপাচ্ছে, তা খুঁজে বের করুন’। প্রধানমন্ত্রীর এই আহ্বান, আমাদের কিছুটা শঙ্কায় ফেলেছে। দলীয় কর্মীদের এমন নির্দেশ দেয়ার ফলাফল সম্পর্কে ভাবতে হবে। গোপন তথ্য সংগ্রহ রাজনৈতিক কর্মীদের কাজ নয়, গোয়েন্দাদের কাজ। রাজনৈতিক কর্মীরা গোয়েন্দাগিরি করতে গেলে ‘উইচ হান্টিং’-এর আশঙ্কা থাকে। তাই আমরা আশা করবো, বিএনপি যদি কোনো বদ মতলবে নির্বাচনে গিয়ে থাকে এবং এ ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রীর কাছে বিশ্বাসযোগ্য তথ্য-উপাত্ত থাকে তাহলে সে অনুযায়ী প্রশাসনিক ব্যবস্থা নিতে হবে।

প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, ‘লন্ডন থেকে বিএনপি নেতা পরিকল্পনা করছেন। অন্যদিকে তার সহযোগীরা নির্বাচনে বিজয়ী হতে এখানে ষড়যন্ত্র করছেন। কোনো সন্দেহ নেই তাদের একটি খারাপ পরিকল্পনা আছে’। তিনি আরও বলেছেন, ‘বিএনপি এখন নিজেদের কার্যালয় ও যানবাহনে অগ্নিসংযোগের মাধ্যমে আওয়ামী লীগকে দোষারোপ করার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত’। সবগুলো অভিযোগই মারাত্মক। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, ‘জনগণকে সতর্ক থাকতে হব’। আমরা সেই সঙ্গে এটাও বলবো যে, সরকার এবং প্রশাসনকেও সতর্ক থেকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে। সেই সঙ্গে এই প্রশ্নটাও মনে আসছে, প্রধানমন্ত্রীর অভিযোগ কি সাধারণ মানুষের উদ্বেগ কমাতে সাহায্য করবে?

ওদিকে নির্বাচন কমিশন নিয়েও মানুষের মনে তৈরি হচ্ছে এক ধরনের অনিশ্চয়তা ও উদ্বেগ। প্রধান নির্বাচন কমিশনার কে এম নুরুল হুদা এবং নির্বাচন কমিশনার মাহবুব তালুকদার প্রকাশ্যে একে অপরের বিরুদ্ধে কথা বলছেন। নির্বাচনের আগ মুহূর্তে নির্বাচন কমিশনের এই বিরোধের খবর মানুষকে ভাবিয়ে তুলছে। প্রধান নির্বাচন কমিশনারের বক্তব্য চ্যালেঞ্জ করে কমিশনার মাহবুব তালুকদার যেভাবে প্রকাশ্যে বক্তব্য দিচ্ছেন তা নজিরবিহীন। প্রধান নির্বাচন কমিশনার বলেছিলেন, নির্বাচনের জন্য লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড আছে। মাহবুব তালুকদার সেটা অস্বীকার করেছেন। তারপর প্রধান নির্বাচন কমিশনার আবারও মাহবুব তালুকদারের বক্তব্য অসত্য বলায় মাহবুব তালুকদার আবার তার বিরুদ্ধে বলেছেন। সিইসির সঙ্গে মাহবুব তালুকদারের এই মুখোমুখি অবস্থান সাধারণ মানুষের কাছে ভালো বার্তা দিচ্ছে না। একটি সাংবিধানিক পদে থেকে মাহবুব তালুকদার যে ভূমিকা নিয়েছেন তা সমর্থন করলে একটি ভয়াবহ সংকটকেই স্বাগত জানানো হবে। কমিশনের ভেতরে তিনি তার মতামত অবশ্যই দিতে পারেন। কিন্তু সিদ্ধান্ত তো হবে সংখ্যাগরিষ্ঠের মতের ভিত্তিতেই। তিনি একমত না হলে, তার ‘বিবেক’ তাকে পীড়িত করলে তিনি পদত্যাগ করবেন এবং জনতার দরবারে এসে নালিশ জানাবেন। এখন মাহবুব তালুকদার যেটা করছেন সেটা সস্তা রাজনীতি। একটি সাংবিধানিক পদে বসে এই ধরনের ‘রাজনীতি’ করে তিনি কারো কারো কাছে বাহবা পাবেন, কেউ কেউ তার তারিফও হয়তো করবেন কিন্তু আখেরে ক্ষতিগ্রস্ত হবে প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো। রাজনৈতিক ভিন্নমতের প্রতিফলন যদি সব প্রতিষ্ঠানেই চলতে থাকে, চলতে দেয়া হয়, তাহলে পরিণতি কী দাঁড়াবে?

মাহবুব তালুকদারকে নির্বাচন কমিশনে সক্রিয় রেখে নির্বাচন কমিশনের পক্ষে ‘সুষ্ঠু’ নির্বাচন সম্ভব হবে কিনা ভাবতে হবে। মাহবুব তালুকদার যদি তার বিবেকের কাছে এতোটাই সৎ হয়ে থাকেন তাহলে তাকে অব্যাহতি নিয়ে মাঠে নামা উচিত ছিলো।

সাবেক দুই রাষ্ট্রপতি – বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমেদ এবং অধ্যাপক ইয়াজউদ্দিন আহমেদর কথা প্রসঙ্গত খুব মনে পড়ছে। তাদের দ্বারা বিএনপি উপকৃত হয়েছিলো কিন্তু দায়িত্ব হারানোর পর বিএনপিও তাদের পরিত্যক্ত ঘোষণা করেছিলো।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বাধিক পঠিত