প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

নরেন্দ্র মোদীর টুইট ও আমাদের মুক্তিযুদ্ধের চেতনা

মোহাম্মদ আলী বোখারী টরন্টো থেকে: এ বছর একাত্তরের ১৬ ডিসেম্বরের দিনটিকে স্বয়ং ভারতের প্রধানমন্ত্রী ও নেতৃস্থানীয়রা ‘দেশটির সেনাবাহিনীর অসাধারণ সাফল্য’ বলে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে জানিয়েছেন। তাদের বিবৃতিতে বিজয় দিবসের সঙ্গে যে বাংলাদেশের কোনও সম্পর্ক রয়েছে, সে কথা বোঝার উপায় নেই। লন্ডনের বিবিসি বাংলা বিভাগ তাদের ওয়েবসাইটে ‘ভারতের নেতা-মন্ত্রীদের বিজয় দিবসের টুইটে প্রায় উল্লেখই নেই বাংলাদেশ বা মুক্তিযুদ্ধের’, এই শিরোনামে একটি সচিত্র খবর ছেপেছে। সেটি বিবিসি বাংলার দিল্লি প্রতিনিধি শুভজ্যোতি ঘোষ প্রেরিত।

ওই খবরে বলা হয়েছে- ঠিক সাতচল্লিশ বছর আগে আজকের দিনে ঢাকায় ভারতীয় বাহিনীর কাছে পাকিস্তানি সেনার আত্মসমর্পণের মধ্যে দিয়ে যাত্রা শুরু হয়েছিল স্বাধীন, সার্বভৌম রাষ্ট্র বাংলাদেশের। ভারতের প্রধানমন্ত্রী থেকে শুরু করে সশস্ত্র বাহিনী, ক্যাবিনেট মন্ত্রী বা বিরোধী রাজনীতিকরা অনেকেই সেই ‘বিজয় দিবস’কে আজ টুইটারে স্মরণ করেছেন–বাদ যাননি বহু তারকাও। কিন্তু তাদের বেশির ভাগের টুইটে-ই ১৬ ডিসেম্বরের এই দিনটিকে ‘ভারতীয় সেনাবাহিনীর অসাধারণ সাফল্য’ বলে বর্ণনা করা হয়েছে–বিজয় দিবসের সঙ্গে যে বাংলাদেশের কোনও সম্পর্ক আছে–তা বোঝাই যাবে না সেগুলো পড়লে । কেউ কেউ অবশ্য আবার বাংলাদেশের এই প্রতিষ্ঠালগ্নটিকে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেছেন। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী সকালেই টুইট করেছেন, “১৯৭১-এ যে নির্ভীক সেনারা লড়াই করেছিলেন, আজ বিজয় দিবসে তাদের অদম্য সাহসকে স্মরণ করি। তাদের বীরত্ব আর দেশপ্রেমই আমাদের দেশকে সুরক্ষিত রাখতে পেরেছে। এই মহান অত্মত্যাগ প্রত্যেক ভারতীয়কে চিরকাল অনুপ্রাণিত করবে।” প্রধানমন্ত্রী মোদী সচরাচর তার টুইটে বাংলাদেশকে অভিনন্দন জানানোর কোনও সুযোগ হাতছাড়া করেন না – কিন্তু তার এই মন্তব্যে বাংলাদেশ শব্দটির উল্লেখ পর্যন্ত নেই। প্রধানমন্ত্রীর টুইটের জবাবেই মন্তব্য করেছেন উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী ও বিজেপির হিন্দুত্বের ‘পোস্টার বয়’ যোগী আদিত্যনাথ – এবং তিনিও বাংলাদেশের প্রসঙ্গ টানা থেকে বিরত থেকেছেন।

এভাবে অন্যদের কথাও সেখানে স্থান পেয়েছে। খবরটা আমাদের বাংলাদেশের স্বাধীনতা বা মুক্তিযুদ্ধের চেতনার ধ্বজাধারি কাউকে বিচলিত করেছে বলে মনে হয়নি। দেখলাম, খবরটি দৈনিক আমাদের নতুন সময় ও আমাদের সময় ডটকম পাঠকের নজরে এনেছে। সেজন্য বিবিসি বাংলার দিল্লি প্রতিনিধি শুভজ্যোতি ঘোষ সবিশেষ ধন্যবাদ পাবার যোগ্য। কারণ, তা আমাদের উদাসীনতাকে চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে।

ইতিহাস বলে- একাত্তরের ১৬ ডিসেম্বর তদানীন্তন ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে ভারতীয় সেনাবাহিনীর কাছে হানাদার পাকিস্তানি সেনাবাহিনী আত্মসমর্পণ করে। সেই সঙ্গে বিশ্ব মানচিত্রে স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশের অভ্যুদয়টি ঘটে। বাস্তবে সেটি ছিল ভারতের সার্বিক সহযোগিতায় বাংলাদেশের মাটিতে বাংলাদেশের জনগণের নয় মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের এক অবিস্মরণীয় সাফল্য। এতে ওই বছর ৩ ডিসেম্বর সন্ধ্যায় অতর্কিতে পাকিস্তান বিমান বাহিনী পরিচালিত ‘অপারেশন চেঙ্গিস খান’ ভারতের পশ্চিমাঞ্চলীয় তথা জম্মু-কাশ্মিরসহ আগ্রা ও পাঞ্জাবের কমপক্ষে সাতটি বিমান ঘাঁটির উপর বিপুল আক্রমণ হানে। পরদিন নিউইয়র্ক টাইমসে প্রকাশ পায় চার্লস মোহর রচিত ‘মিসেস গান্ধী ভওজ টু রিপেল দ্য ফো’, অর্থাৎ শ্রীমতি গান্ধী শত্রুর বদলা নিতে বদ্ধপরিকর। তাতে জানা যায়, পাকিস্তানি আক্রমণের মধ্যরাতে কলকাতার আকাশবাণীর ঘোষণায় প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী বলেন, ‘দ্য ওয়ানটন অ্যান্ড আনপ্রোভকড্ অ্যাগ্রেশন অব পাকিস্তান উড বি ডিসাইসিভলি অ্যান্ড ফাইনালি রিপেল্ড’। অর্থাৎ পাকিস্তানের কাঙ্খিত ও উস্কানিহীন আক্রমণ শক্তভাবে প্রতিহত করা হবে। সেই থেকে বাংলাদেশের জনগণের ওই নয় মাসের মুক্তিযুদ্ধটি ‘ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ’ হিসেবে পরিগণিত হয়, যার স্থায়ীত্ব ছিল মাত্র ১৩ দিন। তাই ৪ ডিসেম্বরের আগে ভারত আনুষ্ঠানিকভাবে দেখায় না যে, তারা বাংলাদেশ ভূখ-ে যুদ্ধ পরিচালনা করেছে। বরং ২৫ মার্চের পরবর্তী নয়মাস সর্বত্রই মুক্তিবাহিনী সর্বাগ্রে ছিল। এরপর ভারতীয় বিমান বাহিনী পরদিন ৪ ডিসেম্বর থেকে পূর্বাঞ্চলে আক্রমণ শুরু করলে ৭ ডিসেম্বর তেজগাঁও বিমানবন্দরটি অকেজো হয়। তাতে পাকিস্তান বিমান বাহিনীর সক্ষমতাও পূর্ব-পাকিস্তানে লোপ পায়। তার আগে ৬ ডিসেম্বর যশোর ক্যান্টনমেন্টের পতন ঘটলে পলায়নপর পাকিস্তানি বাহিনী ঢাকামুখী হয়। একই পরিস্থিতি তখন অপরাপর জেলায় দৃশ্যমান। তাতে পাকিস্তানিদের অত্যাসন্ন পরাজয়ের ঘনঘটায় এবং জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে উত্থাপিত ও প্রক্রিয়াধীন ‘যুদ্ধবিরতির’ প্রস্তাবে ৭ ডিসেম্বর এক সমঝোতাপত্রের ভিত্তিতে ভারত সরকার প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারের কাছ থেকে আমাদের মহান স্বাধীনতাযুদ্ধ তথা মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনার দায়িত্বভারটি গ্রহণ করে। যৌক্তিক কারণ, ভারতীয় সেনাবাহিনী ‘কনভেনশনাল ফোর্স’, মুক্তিযোদ্ধারা নয়। এভাবেই সে সময় মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক জেনারেল এমএজি ওসমানির কাছ থেকে যুদ্ধ পরিচালনার নেতৃত্বটি চলে যায় ভারতীয় সেনাবাহিনীর পূর্বাঞ্চলীয় কমান্ডার লেফটেন্যান্ট জেনারেল জগজিৎ সিং অরোরার কাছে; তিনি হন পূর্বাঞ্চলের রণাঙ্গণে ভারতীয় ও বাংলাদেশ যৌথবাহিনীর ‘জেনারেল অফিসার কমান্ডিং ইন চিফ’। সেভাবেই ১৬ ডিসেম্বর পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর পূর্বাঞ্চলীয় কমান্ডার লেফটেন্যান্ট জেনারেল আমির আবদুল্লাহ খান নিয়াজি তার কাছে আত্মসমর্পণ করেন, যা আত্মসমপর্ণের দলিলে বিমূর্ত। অথচ স্বয়ংক্রিয়ভাবেই পশ্চিমাঞ্চলের রণাঙ্গণে কোনপ্রকার আত্মসমর্পণ ব্যতিরেকে ওই যুদ্ধের পরিসমাপ্তি ঘটে, যদিও পাকিস্তান বিমান বাহিনী যুদ্ধের সূচনা সেখান থেকেই শুরু করেছিলো। এটা তারই সার-সংক্ষেপ।

ই-মেইল: [email protected]

সম্পাদনা : সালেহ্ বিপ্লব

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত