প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

জ্যোতিষী ড. রেজা কিবরিয়া এবং তার দুঃখ ও অভিমান!

অসীম সাহা : ড. রেজা কিবরিয়া। ১৯৯৬ থেকে ২০০৫-এ মুত্যুর পূর্ব-পর্যন্ত আওয়ামী লীগ সরকারের সাবেক অর্থমন্ত্রী শাহ এ এম এস কিবরিয়ার ছেলে। তিনি এবার আওয়ামী লীগ ছেড়ে জাতীয় ঐক্যফ্রণ্টের পক্ষে ধানের শীষের প্রার্থী হয়ে হবিগঞ্জ-১ আসনে নির্বাচনে লড়ছেন। হতেই পারে। রাগ, ক্ষোভ, অভিমান, সুবিধা, প্রলোভন ও ধান্ধার কারণে আওয়ামী লীগ থেকে অনেকেই চলে গেছেন। এটা যার যার অভিরুচি। কিন্তু যাওয়ার পরের কথাগুলো খুব প্রণিধানযোগ্য। আওয়ামী লীগে থাকাকালীন মুক্তিযুদ্ধ, বঙ্গবন্ধু এবং প্রতিপক্ষ সম্পর্কে উচ্চকণ্ঠে তারা যেসব কথা বলতেন, দল বা মত বদলানোর সঙ্গে সঙ্গে তারা যখন সম্পূর্ণ ইউ টার্ন নিয়ে নিজেদের পুরনো দলকে তুলোধুনো করে অনেক আজব আজব কথা বলেন, তখন বিস্ময়ে হতবাক হয়ে যেতে হয়। একজন সন্তানের পিতা দুজন হতে পারে না; আবার একজন সন্তানের দুজন মাতাও হতে পারে না। পালিত বাবা কিংবা প্রতীকী বাবা হতে পারেন। কিন্তু প্রকৃত পিতা একজনই হয়। তবে আমাদের দেশে অদ্ভুত সব কা- ঘটে। বিশেষত রাজনীতিতে বাবার সংখ্যা অনেকেরই বাড়তে থাকে। এদিক থেকে সবচেয়ে বেশি এগিয়ে আছেন, মাহমুদুর রহমান মান্না। ছাত্রাবস্থায় ছট্টগ্রাম ছাত্র সংসদে যখন তিনি সাধারণ সম্পাদক ছিলেন, তখন তার বাবা কে ছিলেন, তা আমার জানা নেই। কিন্তু ডাকসু নির্বাচনের সময় তার বাবা ছিলেন জাসদের নেতারা। এরপর জাসদ ভেঙে যখন বাসদ হয়, তখন তিনি বাসদের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন বলে শুনেছি। তারপর যখন বাবা বদলের দরকার হয়, তখন তিনি আওয়ামী লীগে এসে ঘাঁটি গাড়েন। কী ভেবে আওয়ামী লীগও তাকে এমনকি সাংগঠনিক সম্পাদকের দায়িত্বও দিয়ে দেয়, আওয়ামী লীগই জানে! আওয়ামী লীগের অনেক হালুয়া-রুটি খাওয়ার পর সেখানে আর ঠিকমতো খেতে পারছেন না ভেবে ফের ডিগবাজি দিয়ে নিজেই নিজের বাবা হয়ে যান। গঠন করেন জাতীয় ঐক্যফোরাম। নিজে হন তার নিধিরাম সর্দার। কিন্তু ঢাল-তলোয়ার ছাড়া নিধিরাম সর্দার হলে কেউ মানে? হালে পানি না পাওয়াতে এবার জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের উদ্যোক্তা হিসেবে সামনের সারিতে জায়গা করে নিয়ে আওয়ামী লীগ এবং শেখ হাসিনা সম্পর্কে বিস্ফোরক মন্তব্য করতে শুরু করেন এবং তা এখনো অব্যাহত আছে। শাহ এ এম এস কিবরিয়া আওয়ামী লীগের অর্থমন্ত্রী থাকাকালীন ২০০৫ সালের ২৭ জানুয়ারি বিকেলে হবিগঞ্জের বৈদ্যের বাজার প্রাথমিক বিদ্যালয়ে এক রাজনৈতিক জনসভায় বক্তৃতাশেষে স্কুলের গেট দিয়ে বের হয়ে আসার সময় তাঁকে লক্ষ্য করে দুটি আর্জেস গ্রেনেড নিক্ষেপ করা হয়। তাতে তাঁর মৃত্যু ঘটে। এ-নিয়ে আওয়ামী লীগ ও তার অঙ্গসংগঠনসমূহ ব্যাপক আন্দোলন গড়ে তোলে।

২১ মার্চ ২০০৫ তারিখ বাংলাদেশ পুলিশ বোমা-হামলার অভিযোগে ১০ব্যক্তিকে অভিযুক্ত করে চার্জশীট দাখিল করে। এছাড়াও সিআইডি কিবরিয়া হত্যাকাণ্ডে বিএনপির সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর ও মুফতি হান্নানসহ ১৪জনকে দায়ী করে সম্পূরক অভিযোগপত্র দাখিল করে। পরিবারের তরফ থেকেও বারবার এই হত্যাকাণ্ডের দ্রুত বিচারের দাবি করা হয়। দীর্ঘদিনেও এই হত্যাকাণ্ডের বিচার না হওয়া এবং অপরাধীদের শাস্তির ব্যবস্থা নিতে না পারায় পরিবারের মধ্যে আওয়ামী সরকারের প্রতি অভিমান, হতাশা ও ক্ষোভ তৈরি হয়। ড. রেজা কিবরিয়া শাহ এ এম এস কিবরিয়ার সন্তান। স্বাভাবিকভাবেই এই বিচারহীনতা তাকে আহত ও ক্ষতবিক্ষত করবেই।

কিন্তু সেই অভিমান বা ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ কি ‘শত্রুর সাথে গলাগলি, ধরি মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা’র মতো হতে পারে? মান্নার পথ ধরে এগিয়ে যাওয়া হতে পারে? ড. রেজার যে পিতা আওয়ামী লীগের একজন নেতা ছিলেন, মন্ত্রী ছিলেন এবং যাদের ষড়যন্ত্রে নিহত হয়েছিলেন, তাদের সঙ্গে গলাগলি করে কি পিতাহত্যার সমাধান করতে পারবেন তিনি? অভিমান ও ক্ষোভ থেকে তিনি বলেছেন, তার পিতা জীবিত থাকলে এখনকার আওয়ামী লীগ করতেন না! এটা তো জ্যোতিষীর মতো কথা হয়ে গেলো! তিনি বেঁচে থাকলে তাঁর হত্যাকারীই তো থাকতো না! তখন এসব বিচারের কথাও উঠতো না! তা হলে তিনি কেন আওয়ামী লীগ করতেন না, তা কি নির্দিষ্ট করে বলা যায়? ড. রেজা কিবরিয়া পিতাহত্যার বিচার পাননি বলে এমন কথা বলেছেন। কিন্তু প্রশ্ন উঠতে পারে, ১৯৯৬ থেকে ২০০৫-এর আওয়ামী লীগের সঙ্গে এখনকার আওয়ামী লীগের কী এমন মৌলিক পার্থক্য আছে, যাতে তিনি এমন কথা বলতে পারেন?

আসলে অভিমান, হতাশা ও ক্ষোভ থেকে মানুষ যেমন আত্মহত্যা করতে বাধ্য হয়, ড. রেজা কিবরিয়াও সেই পথ বেছে নিয়েছেন। কিন্তু এই আত্মহননের পথ যে যৌক্তিক এবং গ্রহণযোগ্য নয়, যারা আওয়ামী লীগ থেকে বেরিয়ে অন্য পথের ভিখিরি হয়ে চলে গেছেন, তাদের কারো পরিণাম যে শুভ হয়নি, ড. রেজার মতো লোকের তো তা না জানার কথা নয়! তিনি যদি দলবদল করতে করবেনই, তা হলে মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষের কোনো শক্তির সঙ্গে যুক্ত হতে পারতেন। কিন্তু তা না করে তিনি যে তার পিতার হত্যাকারীদের সঙ্গে বুক মেলালেন, তা কি তার পিতার বিচারের পথটিকে মসৃণ করলো, না রুদ্ধ করলো, সেটা বোঝার শক্তি কি তিনি হারিয়ে ফেলেছেন? তা ছাড়া সকল রাজনীতিকের এটা জানা দরকার, অভিমান, হতাশা কিংবা ক্ষোভ থেকে দলবদলের মাধ্যমে আদর্শের বদল ঘটলে মানুষ সেটাকে ভালোভাবে গ্রহণ করে না। বরং তারা চরিত্রহীন সুবিধাবাদী চতুর রাজনীতিক হিসেবে মানুষের ঘৃণার পাত্র হন। ইতিহাস তার সাক্ষী। ড. রেজা কিবরিয়ার মতো একজন মানুষও সেই ঘৃণার গহ্বরে পতিত হওয়ার জন্য অনিশ্চিত অন্ধকারে ঝাঁপ দিয়ে এক অজানা পথে যাত্রা শুরু করলেন? তার কাছ থেকে জনগণ অন্তত এটা প্রত্যাশা করেনি!

লেখক : কবি ও সংযুক্ত সম্পাদক, দৈনিক আমাদের নতুন সময়

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বাধিক পঠিত