প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

ইশতেহার ও হামলা

বিভুরঞ্জন সরকার : নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারী প্রধান দল বা জোটগুলো নির্বাচনী ইশতেহার প্রকাশ করেছে। নির্বাচনী ইশতেহারগুলো মূলত সুবচনের সমাহার। ক্ষমতায় যাওয়ার আগে জনগণের সামনে যেসব প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়, অঙ্গীকার করা হয়, ক্ষমতায় গিয়ে তা বেমালুম ভুলে যাওয়া হয়। ব্যতিক্রম যে একেবারে নেই, তা নয়। আওয়ামী লীগ নির্বাচনী ইশতেহার বাস্তবায়নে সচেষ্ট থাকে। তবে তারাও শতভাগ অঙ্গীকার বাস্তবায়ন করতে পারে না। কোনো দেশে কোনো দলই সেটা পারে না। সব অঙ্গীকার যেমন পূরণ করা হয় না, তেমনি আবার অঙ্গীকারের বাইরেও করা হয় অনেক কিছু। নির্বাচনে জেতার জন্য, ভোটারদের মন জয় করার জন্য সম্ভব-অসম্ভব অনেক প্রতিশ্রুতিই প্রার্থীরা দিয়ে থাকেন। জনৈক ভোটপ্রার্থীর সেই নদী খনন করার গল্প অনেকেরই জানা, তবু আবার মনে করতে দোষ নেই। একজন প্রার্থী নির্বাচনী প্রচার সভায় দাঁড়িয়ে তিনি নির্বাচিত হলে কী কী করবেন তার বয়ান দিচ্ছিলেন। এক পর্যায়ে তিনি বলেন, ‘আপনারা আমাকে ভোট দিলে এই এলাকায় আমি একটি ব্রিজ তৈরি করে দেবো’।

শ্রোতাদের মধ্য থেকে একজন বললেন, ‘আমাদের এখানে তো কোনে নদী নেই’। ভোটপ্রার্থী দমবার পাত্র নন। তাকে তো অঙ্গীকার করতেই হবে। তিনি তৎক্ষণাৎ জবাব দিলেন, ‘কোনো সমস্যা নেই, আপনাদের এখানে আমি একটি নদীও বানিয়ে দেবো’।

আবার দলের নির্বাচনী ইশতেহারে থাকে না, এমন প্রতিশ্রুতিও নির্বাচনী জনসভায় দেয়া হয়ে থাকে। যেমন আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় গেলে ১০ টাকা কেজি চাল খাওয়ানোর গল্প। আওয়ামী লীগের কোনো নির্বাচনী ইশতেহারে লেখা নেই ১০ টাকা কেজি চালের কথা। কোত্থেকে এলো তাহলে ১০ টাকা কেজি চালের গল্প? ২০০৮ সালের নির্বাচনের আগে শেখ হাসিনা গোপালগঞ্জে নির্বাচনী জনসভায় একদিন ১০ টাকা কেজি চালের কথা বলছিলেন। সেই থেকে চালের দামকে বিএনপি আওয়ামী লীগ বিরোধী প্রচারণার অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে আসছে। তবে অতি ব্যবহারে বা অপব্যবহারে অস্ত্রটি তার কার্যকারিতা হারিয়েছে। ১০ টাকা দরে চাল খাওয়া বা পাওয়ার আশা এখন কেউ করে না ।

নির্বাচনী ইশতেহারকে অনেকে একটি গুরুত্বপূর্ণ দলিল মনে করেন। তবে প্রার্থী কিংবা সাধারণ ভোটাররা ইশতেহার নিয়ে খুব বেশি মাথা ঘামায় বলে মনে হয় না। কয়জন ভোটার ইশতেহার পড়ে ভোট দেন অথবা কয়জন প্রার্থীর কাছে ইশতেহার থাকে তা রীতিমতো গবেষণার বিষয়।

আগামী নির্বাচনকে সামনে রেখে বেশ কয়েকটি ইশতেহার এর মধ্যই ঘোষণা করা হয়েছে। আওয়ামী লীগ এবং বিএনপি ছাড়া এইবার আরো যে ইশতেহার নিয়ে আলোচনা হচ্ছে সেটা জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের। কোনো ইশতেহার নিয়ে আলোচনা আমার উদ্দেশ্য নয়। আমি অন্য একটি প্রসঙ্গে সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাই। কোনো রাজনৈতিক দল বা জোটই কিন্তু প্রতিপক্ষের ওপর হামলা করা, আক্রমণ করার কথা বলেনি নির্বাচনী ইশতেহারে। গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার করা কিংবা সংহত বা দৃঢ় করার কথাই আছে প্রত্যেক ইশতেহারে। কিন্তু আমরা দেখতে পাচ্ছি, আনুষ্ঠানিকভাবে নির্বাচনী প্রচারণা শুরুর দিন থেকেই হামলা, আক্রমণ, ভাঙচুরের ঘটনা ঘটছে। হামলার ঘটনাগুলো একতরফা হচ্ছে না। বিএনপিসহ অন্য বিরোধীদের ওপর যেমন হামলা হচ্ছে, প্রচারণায় বাধা দেয়া হচ্ছে, তেমনি আওয়ামী লীগও আক্রান্ত হচ্ছে। দুই জন আওয়ামী লীগ কর্মীকে হত্যাও করা হয়েছে। আওয়ামী লীগ মারমুখী কিন্তু বিএনপিও হাত গুটিয়ে বসে নেই। আত্মরক্ষার নামে তারাও হত্যাক-ে সামিল হচ্ছে। কার অপরাধ বেশি, কার কম সে বিতর্কে না গিয়েও বলা যায়, ‘কার নিন্দা করো তুমি ভাই, এ আমার, এ তোমার পাপ’।

হ্যাঁ, এক হাতে তালি বাজে না। যারাই হামলা-আক্রমণের ঘটনা ঘটাচ্ছেন, তাদের প্রতি আহ্বান : এসব বন্ধ করুন। আগুন নিয়ে খেলার পরিণতি ভালো হয় না। অন্যের ঘর পোড়াতে গেলে নিজের ঘরও নিরাপদ না থাকতে পারে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে চোখবন্ধ করা নীতি থেকে সরে আসতে হবে। পক্ষপাত খারাপ ব্যাধি।

একটি পুরনো ঘটনা মনে পড়ছে। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে ঢাকার একটি আসন থেকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন। তার বিরুদ্ধে মুসলিম লীগের প্রার্থী ছিলেন খাজা খয়েরউদ্দিন। একদিন সন্ধ্যায় নবাবপুর এলাকায় খাজা খয়েরের সমর্থকরা রাস্তায় ঝুলিয়ে রাখা আওয়ামী লীগের প্রতীক নৌকা পুড়িয়ে দেয়। আওয়ামী লীগ সমর্থকরা বিক্ষুব্ধ, উত্তেজিত হয়ে ওঠেন। খবর শুনে বঙ্গবন্ধু দ্রুত ঘটনাস্থলে ছুটে যান এবং ক্ষুব্ধ সমর্থকদের শান্ত থাকার পরামর্শ দিয়ে বলেন, এই ন্যক্কারজনক ঘটনার জবাব দিতে হবে ভোটের বাক্সে। বঙ্গবন্ধু সেদিন হুকুম দিলে খাজা খয়ের এবং তার সাঙ্গপাঙ্গদের অবস্থা কি হতো তা সহজেই অনুমেয়।

বঙ্গবন্ধু ভোটের বাক্সে বদলা নিতে বলেছিলেন। মানুষ তাই নিয়েছিলো। আমরা এখনও আশা করবো, ভোটকে কেন্দ্রে করে কেউ সহিংসতার পথে যাবেন না। ভোট আর মারামারি একসাথে যায় না। বল প্রয়োগের পথে হাঁটলে আর ভোট কেন? সবাই শুভবুদ্ধির পরিচয় দিন । অযথা শক্তিক্ষয় না করে শক্তি দেখান ভোটের বাক্সে। ষড়যন্ত্রকারীদের হাতের পুতুল হবেন না কেউ।

লেখক : গ্রুপ যুগ্ম সম্পাদক, আমাদের নতুন সময়

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত