প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

আইএসআইয়ের সঙ্গে জামায়াতের পুরনো দোস্তি

বাংলা ট্রিবিউন : দেশের রাজনীতিতে বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর তৎপরতার অভিযোগ দীর্ঘদিনের। সাম্প্রতিক রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বিষয়টি আরও জোরালো হয়ে সামনে এসেছে। পাকিস্তানি গোয়েন্দা সংস্থা ইন্টার সার্ভিসেস ইন্টেলিজেন্স—আইএসআইয়ের সঙ্গে বরাবরই ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রক্ষা করে চলে জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্ব। তাদের মিত্র বিএনপিও অবশ্য এ ক্ষেত্রে পিছিয়ে নেই খুব একটা। বিভিন্ন নথিপত্র ঘেঁটে দেখা গেছে, আইএসআই এদেশে জামায়াতকেই তাদের প্রধান মিত্র মনে করে। জামায়াতের নেতারাও আইএসআইয়ের পরামর্শমতো তাদের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করেন।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল বলেন, ‘বিএনপি-জামায়াতের নেতাদের মাধ্যমে আইএসআই অনেক আগে থেকেই বাংলাদেশের রাজনীতির ওপর নগ্নভাবে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করছে। বিএনপি-জামায়াতের অনেক নেতাকর্মী তাদের এজেন্ট হিসেবে কাজ করে থাকে। বিষয়গুলো আমাদের নজরদারির মধ্যে রয়েছে। আমরা বিষয়টি খতিয়ে দেখছি।’
সম্প্রতি বিএনপির স্থায়ী কমটির সদস্য খন্দকার মোশাররফ হোসেনের সঙ্গে আইএসআইয়ের এক কর্মকর্তার কথোপকথনের অডিও ফাঁসের সূত্র ধরে চালানো গোয়েন্দা অনুসন্ধানের সূত্রে হাতে পাওয়া একাধিক নথি থেকে জানা যায়, আইএসআই এজেন্টরা জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল ডা. শফিকুর রহমানসহ সৌদি আরবের জেদ্দায় দলটির প্রতিনিধিদের সঙ্গে গত ২৫ ও ২৬ মে বৈঠক করেন। ওই বৈঠকে জেদ্দা জামায়াতে ইসলামীর আমির শহীদ উল ইসলাম উপস্থিত ছিলেন। সেখানে দেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও আসন্ন জাতীয় নির্বাচনে ভবিষ্যত কৌশল নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে আলোচনা হয়। ওই বৈঠকে ডা. শফিকুর রহমান পাকিস্তানি গোয়েন্দা সংস্থাটির সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখার ব্যাপারে আশ্বাস দেন। এছাড়া দলের আমিরের সঙ্গে আলাপ করে দলের আর্থিক চাহিদার ব্যাপারে আবারও বৈঠকে বসার কথা জানান।
অনুসন্ধানে পাওয়া গোয়েন্দা নথি থেকে জানা যায়, ওই বৈঠকে ডা. শফিকুর রহমান স্বীকার করেন, ২০১৩ সালে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত জামায়াতের সাবেক সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল আব্দুল কাদের মোল্লা অতীতে আইএসআইয়ের আস্থাভাজন ছিলেন। অতীতে তার সঙ্গেই গোয়েন্দা সংস্থাটি যোগাযোগ রক্ষা করতো। ওই বৈঠকে ডা. শফিকুর রহমান বাংলাদেশে তাদের লোকজনের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ না করতে আইএসআই এজেন্টদের অনুরোধ করেন। তিনি আইএসআই এজেন্টকে বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে এটা (সরাসরি যোগাযোগ) খুবই ঝুঁকিপূর্ণ। যেকোনও পরিস্থিতিতে বিএনপির সঙ্গে জোট টিকিয়ে রাখার ব্যাপারে তিনি আইএসআইকে আশ্বস্ত করেন। এছাড়া নির্বাচনে আসন ভাগাভাগির ব্যাপারে পাকিস্তানি সংস্থাটির সহযোগিতা ‘যথারীতি’ অব্যাহত থাকবে বলে আশা প্রকাশ করেন জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল।
নথি বলছে, ওই বৈঠকে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ভারতের মদদে সরকার দলের নেতাদের গুম করাসহ বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড চালাচ্ছে। বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট ক্ষমতায় এলে তিনি ‘কড়ায়-গণ্ডায় তা শোধ দেওয়ার’ অঙ্গীকার করেন। তিনি ইসলামিক সহযোগী সংস্থা—ওআইসিসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ফোরামে পাকিস্তানের সমর্থনের জন্য আইএসআইয়ের প্রতি অনুরোধ জানান। এছাড়া চীনসহ পাকিস্তানের বন্ধু রাষ্ট্রগুলো যাতে আওয়ামী লীগ সরকারের ওপর চাপ দেয়, সে ব্যাপারে পাকিস্তানকে ভূমিকা রাখতে বলেন।
সূত্র বলছে, জেদ্দার ওই বৈঠকে আইএসআইয়ের পক্ষ থেকে বলা হয়, তারা জামায়াতে ইসলামীকেই বাংলাদেশে তাদের প্রধান অবলম্বন ও সত্যিকারের বন্ধু মনে করে। এ কারণে দুই পক্ষের মধ্যে নিয়মিত যোগাযোগ থাকা উচিত। আইএসআইয়ের পক্ষ থেকে বলা হয়, সরকারবিরোধী তুমুল রাজনৈতিক আন্দোলন গড়ে তুলতে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোটকে অনুপ্রাণিত করা প্রয়োজন। এ জন্য ইসলামি ঐক্যজোটের নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়ানো উচিত। এছাড়া বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোটের পক্ষে জনমত গড়ে তোলার জন্য গণমাধ্যমকে ব্যবহার করতে হবে। সরকারকে একটি অবাধ নির্বাচন দিতে বাধ্য করতে চীনের প্রভাবকে কাজে লাগানোর কথাও বলেন আইএসআই প্রতিনিধিরা।
গোয়েন্দা সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, দুবাইয়ে অবস্থানরত আইএসআই এজেন্ট শহীদ মেহমুদ মুহাম্মদ শরিফ (পাকিস্তান সেনাবাহিনী ও আইএসআইয়ের সাবেক কর্মকর্তা)যোগাযোগের কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে কাজ করেন। তিনি আইএসআই কর্মকর্তা জাভেদ মেহেদীর কাছ থেকে পরামর্শ ও নির্দেশনা পান। সংযুক্ত আরব আমিরাতে বিএনপির সভাপতি জাকির হোসেন বিএনপির পক্ষ থেকে মেহমুদের সঙ্গে সব তথ্য দেওয়া-নেওয়া করেন এবং ‘বস’-এর (তারেক রহমান) সব সিদ্ধান্ত আইএসআইকে জানিয়ে থাকেন।
একাধিক গোয়েন্দা নথি থেকে জানা যায়, গত জুনে দুবাইয়ে জাকির হোসেনের সঙ্গে বৈঠকে আইএসআই এজেন্ট মেহমুদ এক মাস আগে জামায়াত নেতাদের সঙ্গে তার এই বৈঠকের কথা বলেন। মেহমুদের সঙ্গে দুবাইয়ে আরেক বৈঠকে জাকির হোসেন সিলেট সিটি করপোরেশন নির্বাচনে বিএনপি প্রার্থীর বিপরীতে জামায়াতের স্বতন্ত্র প্রার্থী দেওয়া নিয়ে অনুযোগ করেন। জামায়াত যাতে তাদের প্রার্থী প্রত্যাহার করে এজন্য দলটির ওপর চাপ দিতে জাকির হোসেন এই আইএসআই এজেন্টকে অনুরোধ করেন। জামায়াত পরে প্রার্থী প্রত্যাহার করেছিল।
গোয়েন্দা সূত্র বলছে, ওই বৈঠকেই জাকির হোসেনকে আইএসআই এজেন্ট মেহমুদ বলেন, সংস্থাটির নীতিনির্ধারণী কর্মকর্তা জাভেদ মেহেদী জামায়াতের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করতে বিএনপিকে পরামর্শ দিয়েছেন। আইএসআইয়ের পক্ষ থেকে বিএনপিকে বলা হয়, জামায়াতের সঙ্গে ঐক্য অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। কেননা ভবিষ্যতে আরও বড় কিছুর জন্য এই জোট টিকিয়ে রাখা গুরুত্বপূর্ণ।
জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল ডা. শফিকুর রহমানের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাকে পাওয়া যায়নি। হোয়াটসঅ্যাপের মাধ্যমে তার নির্বাচনি এলাকার সমন্বয়ক ও শিবিরের সাবেক দফতর সম্পাদক আতাউর রহমান সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ করেও ডা. শফিকুর রহমানকে পাওয়া যায়নি। তবে জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির অধ্যাপক মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, ‘ডা. শফিকুর রহমান দীর্ঘদিন কারাগারে ছিলেন। কারাগার থেকে বেরিয়ে তিনি ওই সময়টাতে ওমরাহ করতে সৌদি আরবে গিয়েছিলেন। কিন্তু তার বিরুদ্ধে যে অভিযোগ আনা হচ্ছে তা সত্য নয়। এই বিষয়টি আপনাদের কাছেই প্রথম শুনলাম। আমাদের রাজনীতি খুবই স্বচ্ছ ও পরিষ্কার। আমরা কোনও দেশের গোয়েন্দা সংস্থার ওপর নির্ভর করে রাজনীতি করি না। আমাদের সঙ্গে কারো সঙ্গে কোনও যোগাযোগ নেই।’

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ