প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

নিরপেক্ষতার নীরিখে সুযোগের সদ্ব্যবহার

ড. মোহাম্মদ আবদুল মজিদ : এবারের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন বাংলাদেশের জনগণ, রাষ্ট্র ও সরকারের জন্য গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাপনায় রাষ্ট্র পরিচালনায় দায়িত্ব হস্তান্তর পদ্ধতি প্রক্রিয়ায় দীর্ঘদিনে জমে ওঠা সমস্যা-সংকট থেকে উত্তরণের সুযোগ সমুপস্থিত করেছে। নিরপেক্ষতার নিরিখে, দায়িত্বশীলতার সাথে এই সুযোগের সদ্ব্যবহারের কোনো বিকল্প নেই। কেননা গণতন্ত্র, সুশাসন, স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও মত প্রকাশের স্বাধীনতা সংক্রান্ত মহাজন বাক্যাবলী, ধ্যান ধারণা ও চিন্তাচেতনা অনুসরণের অনুধাবনের ও প্রয়োগের পরিবর্তে তা বিকৃত হয়ে মনগড়া পথ ও পন্থার জন্ম দিলে সৃজিত পরিস্থিতির শিকার হতে হবে আজ হোক আর কাল হোক সকলকেই ।

অমিত সম্ভাবনাময় আমাদের বাংলাদেশ অবশ্যই প্রকৃতির বিশেষ আশীর্বাদপুষ্ট। অথচ দেশটি ইপ্সিত উন্নয়নের পথে যেতে ইতিবাচকতার পরিবর্তে নানান নেতিবাচক আবহ সৃষ্টি হচ্ছে। মাথায় উত্তরের হিমালয় পর্বত এবং পদপ্রান্তে দক্ষিণে বঙ্গোপসাগর হওয়ায় কর্কটক্রান্তি রেখায় অবস্থানকারী হয়ে দেশটি মরুভূমি না হয়ে নাতিশীতোষ্ণ আবহাওয়ার বদৌলতে সুজলা সুফলা। হাজার হাজার বছর বিদেশি শাসন শোষণের পর ১৯৭১ সালে ‘স্বাধীন আশায় পথ চলা’র অধিকার অর্জন করে বাংলাদেশের জনগণ। বিগত ৪৭ বছরে যতোগুলো সরকার রাষ্ট্র পরিচালনায় এসেছে তারা সমুদয় সাফল্যকে নিজেদের একক সাফল্য বলে প্রচারে মগ্ন থেকেছে। তাদের মনের মধ্যে সকল বয়ানের মধ্যে যেন ‘আমরাই’ সব। অন্য সবাই বিপক্ষ। আর যে বা যারা যখনই ক্ষমতাবান হয়েছে তারা দলীয় সাম্প্রদায়িকতা বা স্বৈরাচারী মনোভাবের শিকলে আটকা পড়েছে বলে প্রতীয়মান হয়েছে। মহান মুক্তিযুদ্ধে (কতিপয় সুনির্দিষ্ট অভিযোগে অভিযুক্তরা ব্যতীত) দেশের সকল মানুষ অংশগ্রহণ করলেও পক্ষ-বিপক্ষ নাম দিয়ে নিজেদেরকে নিজেরাই বিভক্ত করে ‘আমরাই আমাদের শত্রু’ বনে যাচ্ছে যেন। এমন এক সংস্কৃতির উদ্ভব ঘটেছে যে সবাই পারস্পরিক দোষারোপে সিদ্ধহস্ত-নিজের দোষত্রুটির দিকে তাকানোয় নিমরাজি। ক্ষমতাসীনেরা নিজের দোষ দেখতে পায় না- আর যতো দোষ যেন বিরোধী পক্ষের। মনে হবে সবাই বুদ্ধি প্রতিবন্ধীত্ব বরণ এবং দলীয় সাম্প্রদায়িকতার শিকার। আজ যিনি তার গৌরবময় ভূমিকার জন্য নমস্য তার কোনো একটা বেফাঁস মন্তব্যে মুহূর্তের মধ্যে তিনি আস্তকুঁড়ে নিমজ্জিত হতে পারেন। চরিত্র হনন এর এই প্রেক্ষাপটে আশংকা এই যে দিনবদলে সকলকেই এক সময় এ ধরনের হেনস্থার শিকার যে হতে হবে সেটা কারোরই কর্ণকুহরে মনে হচ্ছে যেন পৌঁছাচ্ছে না।

এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে এ প্রেক্ষাপটে নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী সকল পক্ষের কাছে জনগণের উপলদ্ধি শানাতে বা সিদ্ধান্ত নিতে সহায়ক হয় এমন ব্যাখ্যামূলক কর্মসূচি, কর্ম পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের উপায় সম্পর্কে নির্বাচনী ইশতেহারের প্রত্যাশা ও প্রয়োজনীয়তা উঠে এসেছে। সকল পক্ষের কাছে দেশবাসীর এই পত্যয়, প্রতিজ্ঞা ও কর্মপরিকল্পনা প্রত্যাশা যে নির্বাচিত হয়ে সরকার গঠনের পর রাষ্ট্র ও সরকারের মধ্যেকার সম্পর্ক ও পারস্পরিক প্রভাবক ভূমিকাকে স্ব স্ব নীতিগত অবস্থানে রাখা হবে। অর্থাৎ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান, সংস্থা, ও জনগণের স্বার্থ সংরক্ষক খবরদারি ব্যস্থাপনাকে সরকারি বা দলীয়করণ বা আজ্ঞাবহ হবে না। প্রজাতন্ত্রের কর্মী বাহিনীকে ক্ষমতাসীন সরকারের সুরক্ষাকল্পে সরকারের হয়ে জনগণের প্রতিপক্ষ করে তোলার প্রবণতা পরিহারের পরিবেশ তৈরি হতে হবে সকলের স্বার্থেই। দক্ষ জনবল, জনসম্পদ তৈরিতে, তাদের জন্য ব্যাপক কর্মসৃজনে বিশেষ উদ্যোগ থাকতে হবে। সরকার গঠনের পর সরকার সম্পূর্ণ দেশের সকল জনগণের

সরকার হবে, তারা অবশ্যই দল নিরপেক্ষ হবেন, সকলে প্রতি সমান আচরণ, কোনো প্রকার রাগ-অনুরাগের বশবর্তী হয়ে জন্মস্থান, ধর্ম, মত বা দল, পক্ষ কিংবা বিপক্ষ বিবেচনা নির্বিশেষে কারো প্রতি ভিন্ন বা সাম্প্রদায়িক আচরণ করা যাবে না। শুধুমাত্র ব্যক্তিগত আক্রোশের কারণে কারো প্রতি প্রতিশোধপরায়ন হওয়া যাবে না, প্রতিরোধ প্রতিশোধের পরিবর্তে রাষ্ট্রকে আইনের আওতায় পদক্ষেপ নিতে সহায়তা দেয়াই বাঞ্ছনীয় হবে। জনগণের নামে রাষ্ট্রের অর্জিত আয় বা ধার কর্জ করা টাকা জনগণের জ্ঞাতসারেই ব্যয় করা হবে, আয়ব্যয়ে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত হলেই, সকল আয় রাষ্ট্রের হিসেব ভুক্ত হবে, দুর্নীতিমুক্ত ও ব্যয় সাশ্রয়ী হবে উন্নয়ন কর্মকা- এবং সেই উন্নয়নের প্রতি আস্থা প্রতিস্থাপিত হবে, ধনি দরিদ্রের বৈষম্য দূর হবে, তবেই সকলের জন্য উন্নয়ন টেকসই হবে। রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনা সরকারের আজ্ঞাবহ হবে না, সেখানে জনগণের মালিকানা প্রতিষ্ঠিত হবে। মোদ্দা কথা গণতন্ত্রকে গণতন্ত্রের স্বার্থে গণতান্ত্রিক হবার কোনো বিকল্প নেই।
লেখক : উন্নয়ন অর্থনীতির বিশ্লেষক ।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত