প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

শেখ হাসিনাই শেষ ভরসা!

আবেদিন কাদের : আমাদের দেশের রাজনীতি বহুদিন ধরেই ধর্ম দ্বারা প্রভাবিত। কিন্তু পঁচাত্তরের পর ‘রাষ্ট্রধর্ম’ দ্বারা অবিশ্বাস্য রকম নিয়ন্ত্রিত, আর সেটার জন্য নিশ্চিতভাবে দুই সেনা একনায়ক জিয়া ও এরশাদ এবং আধা- একনায়ক, অগণতান্ত্রিক বিএনপি-জামায়াত এবং কিছু হঠকারী বামই মূলত দায়ী, যারা সেনা শাসকদের উচ্ছিষ্টভোগী। আওয়ামী লীগ ধর্ম নিয়ে রাজনীতি করেনি তা নয়। কিন্তু সেটা করেছে অনেকটা ক্যাচ ২২ অবস্থায় পড়ে। কেন এবং কী অবস্থায় তা করেছে তা আলোচনার জন্য সংকীর্ণ ফেসবুক মঞ্চ ভালো ক্ষেত্র নয়। পঁচাত্তরের পর যতোবার আওয়ামী লীগ ধর্মকে রাষ্ট্রচিন্তার বাইরে রাখার চেষ্টা করেছে, ততোবার তাদের অবস্থা বিপন্ন হয়েছে। আমাদের ইতিহাসবিদ বা সমাজবিজ্ঞানীরা খুব গভীরভাবে বিষয়টি নিয়ে কখনোই ভাবেননি। কেন এই অঞ্চলের মানুষরা রাষ্ট্র থেকে ধর্মকে আলাদা করে দেখে না বা রাজনীতিতে ধর্মের ব্যবহার এতো সহজে গ্রহণ করে? মোহাম্মদ আলী জিন্নাহকে ৪৬ সালে এ অঞ্চলের মানুষরাই পাকিস্তান বানাতে সাহায্য করেছিলো বিপুল ভোট দিয়ে। এর কিছুদিন পর থেকে বঙ্গবন্ধু দীর্ঘদিন সংগ্রাম করেছেন, জেল খেটেছেন রাষ্ট্রকে ধর্ম থেকে আলাদা রাখতে এবং শেষ পর্যন্ত একটি ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, স্বাধীন একটি দেশের জন্ম দিয়েছিলেন বাঙালির জন্য। কিছুদিনের মধ্যেই রাষ্ট্র পেছনের দিকে হাঁটতে শুরু করে জেনারেল জিয়া ও তার দোসরদের চেষ্টায়। বঙ্গবন্ধুর খুনিরা তাকে ও তার পরিবারকে নৃশংসভাবে হত্যা করেছে তাই নয়, তার সারাজীবনের সংগ্রামের ফসল একটি গণতান্ত্রিক ধর্মনিরপেক্ষ শিশু রাষ্ট্রকে গলা টিপে হত্যা করেছে। এর পুরো দায় সেনা স্বৈরাচার একনায়কদের। পরবর্তী সময়ে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এসেছে ঠিকই, কিন্তু রাষ্ট্রের চারিত্র তেমন বদলাতে সক্ষম হয়নি। এটা তাদের ব্যর্থতা, কিন্তু সে বেদনার গ্লানি থেকে তারা মুক্ত নন। তারা অসহায়ভাবে দেখেছেন কীভাবে বরং দিনে দিনে সমাজ ইসলামাইজড হতে হতে পুরো জাতির মনোজগৎ ধর্ম দ্বারা, যুক্তিবিবর্জিত বিজ্ঞানমনস্কতাহীনতা দ্বারা আচ্ছন্ন হয়ে তিমির তমসাচ্ছন্ন হয়ে পড়ে। রাজনীতির বাইরে কয়েকটি সাংস্কৃতিক সংগঠন যেমন ‘ছায়ানট’ বা ব্যক্তি পর্যায়ে ওয়াহিদুল হক, মফিদুল হক বা রামেন্দু মজুমদারসহ কিছু মানুষ তাদের সাধ্য মতো প্রয়াস চালিয়েছেন, কিন্তু বানের তোড়ের মতো মধ্যপ্রাচ্যের টাকা আর  স্বৈরসেনা-একনায়ক ও জামায়াত- বিএনপির রাজনীতিকরা প্রগতিশীল মানুষগুলোর প্রয়াসকে মুহূর্তে উড়িয়ে দিয়েছে। এসবের নিশ্চিত ফল আজকের রাজনীতি।

গত কয়েক দিনে সোশ্যাল মিডিয়ায় দুটো ছবি এসেছে ভাইরাল হয়েÑ একটি হচ্ছে অভিনেতা, রাজনীতিক আসাদুজ্জামান নূরের এবং অন্যটি ড. কামাল হোসেনের, মাথায় টুপি পরিহিত অবস্থায়। বিষয়টি কারো কারো কাছে বিনোদনের হলেও, গভীর বেদনার কোনো সন্দেহ নেই। ’৪৭-এর আগে এক বিলেতি ইতিহাসবিদকে একজন ভারতীয় সাংবাদিক জিজ্ঞেস করেছিলেন, ‘কেমন গণতান্ত্রিক দেশ গড়বেন জিন্নাহ?’ উত্তরে তিনি বলেছিলেন, ‘লন্ডনের সেভিলস’ রো-এর ট্রিপল পিস স্যুটের ওপর একখানা পশমি জিন্নাহ ক্যাপ পরিয়ে দিলে একজন মানুষকে যে রকম আধুনিক মানুষ মনে হয়, ঠিক সেরকম গণতন্ত্র হবে পাকিস্তানে। যার স্থান ধর্ম বা গণতন্ত্রের সীমানায় থাকবে না।’ আজ একাত্তর বছর পর পাকিস্তানের দিকে তাকালে সে কথা মনে পড়বে আরেক বার।

আমার অধিকাংশ কবি সাহিত্যিক বন্ধুরা চান শত বিপত্তি বা ভুলভ্রান্তির পরও শেখ হাসিনার ক্ষমতায় ফিরে আসা উচিত দেশটাকে কিছুটা হলেও বাসযোগ্য রাখতে বা উন্নয়নের ধারা বজায় রাখতে। আমি তাদের সঙ্গে একমত। আমার প্রিয়বন্ধু ও কাজিন শেখ আজহার আলী কদিন আগে ফেবুতে প্রশ্ন রেখেছেন দেশের সাংস্কৃতিক জগতের প্রায় সবাই শেখ হাসিনাকে কেন সমর্থন করেন! প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের সাংস্কৃতিক জগতের মানুষরা নিজেদের চেষ্টায় সমাজের মনোজগৎ বদলাতে পারেন নি, ব্যর্থ হয়েছেন। দেশের সিভিল সোসাইটি সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে। বাংলা একাডেমি, শিল্পকলা একাডেমি, বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র বা বেলীরোড শহুরে কিছু মানুষকে কিছুটা আলোকিত করতে পারলেও দেশের অধিকাংশ মানুষের কাছে তাঁরা গ্রহণযোগ্য নন, যতোটা গ্রহণযোগ্য ধর্ম ব্যবসায়ীরা। তাই হয়তো দেশের সাংস্কৃতিক কর্মীরা তাদের দায়িত্বটুকু শেখ হাসিনার ওপর দিয়ে নিশ্চিত থাকতে চান। বিষয়টা রাজনীতিকরা বা সাংস্কৃতিক জগতের মানুষরা হয়তো বুঝতে চেষ্টা করেন নি।

গত সাড়ে তিন দশকে ভারত উপমহাদেশের হিন্দু মুসলিম রাজনীতি নিয়ে অনেক উৎকৃষ্ট গ্রন্থ রচিত হয়েছে, এর মধ্যে ক্যামব্রিজের দুই কৃতি ছাত্র অধ্যাপক আয়েশা জালালের ১৯৮৫ সালে প্রকাশিত ঝড়ষব ঝঢ়ড়শবংসধহ এবং অধ্যাপক জয়া চ্যাটারজির ২০০৭ সালে প্রকাশিত ঞযব ঝঢ়ড়রষং ড়ভ চধৎঃরঃরড়হ অসাধারণ দুটি গ্রন্থ। দুজনই চেষ্টা করেছেন উপমহাদেশের রাজনীতিতে ধর্মের ভূমিকার কারণগুলো শনাক্ত করতে। আমার ধারণা আমাদের ইতিহাসবিদ, সাংস্কৃতিক বিশেষজ্ঞদের দায়িত্ব আমাদের সমাজের রাজনৈতিক ব্যধিগুলোকে শনাক্ত করার চেষ্টা করা। চেষ্টা করা ধর্মীয় রাজনীতির কারণগুলো শনাক্ত করতে। বিষয়টি সত্যি জটিল।

সেদিন আমার এক প্রিয় সাংবাদিক-লেখক বিভুরঞ্জন সরকারের সঙ্গে ফেসবুকে আমার একটু তক্কাতক্কি হয়েছিলো সাংবাদিকের ভূমিকা বিষয়ে। তার রাজনৈতিক বা পেশাগত সততা নিয়ে আমার কোনো সন্দেহ নেই, কিন্তু তার সঙ্গে আমি দ্বিমত করেছিলাম সাংবাদিকের ভূমিকা নিয়ে। তিনি এমন বিষয়ে তর্ক করতে চাননি যাতে জামায়াত-বিএনপির লাভ হয়, আমিও তা চাই না নিঃসন্দেহে। কিন্তু যে নেত্রী বা যে দল আমাদের শ্রদ্ধেয় এবং প্রিয়, তিনি বা সেই দল যদি ধর্মভিত্তিক রাজনীতির দ্বারা প্রভাবিত হয়ে পড়েন বা পড়ে, তখন আমাদের বেদনার্ত হৃদয়ের ভূমিকাটা কী হবে! সাংবাদিকের কি রাজনৈতিক আদর্শ দ্বারা তাড়িত হওয়া উচিত, নাকি রাজনৈতিক দল দ্বারা? সেটা নির্ধারণ খুব সহজ নয় বোধ হয়! আমার ধারণা এই দুঃসময়ে রাজনীতিক শেখ হাসিনা বা সাংবাদিক-লেখক বিভুরঞ্জন সরকার প্রায় একই রকম ক্যাচ ২২ অবস্থার শিকার! অসহায় তারা দুজনেই, তাদের নিজের নিজের ক্ষেত্রে, অসহায় তারা এক দুরারোগ্য রাজনৈতিক ব্যাধি দ্বারা আক্রান্ত সমাজে!

সবশেষে বলি, আমাদের সমাজ একটি রাজনৈতিক ঈৎড়ংং জড়ধফ বা ঔঁহপঃঁৎব এসে দাঁড়িয়েছে। তাই এই নির্বাচনটি সত্যিই গুরুত্বপূর্ণ। আমি আমার সকল কবি সাহিত্যিক বন্ধুদের মতোই চাই দেশের অগণিত মানুষ স্বাধীনতার চেতনাকে সমুন্নত রাখতে এবং একটু-আধটু গণতন্ত্র বাঁচানোর জন্য শেখ হাসিনাকেই ভোট দেবেন, তিনিই শেষ ভরসা। সকল রাজনৈতিক ত্রুটির পরও ব্যক্তিগত সততা এবং তুলনারহিত রাজনৈতিক সংগ্রামের জন্য শেখ হাসিনাই আমাদের বিরানভূমিতে শ্রদ্ধেয় রাজনীতিক! ফেসবুক থেকে

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বাধিক পঠিত