প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

প্রাচ্য-প্রতীচীর পথে প্রান্তরেঃ নারিতা থেকে ঢাকা

ডঃ শোয়েব সাঈদ : প্রকৃতির কোলে নাগানোর চারটি শহরে ছড়িয়ে আছে জাপানের অন্যতম জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় শিনশুর বিভিন্ন ফ্যাকাল্টি। মেডিকেল স্কুলসহ মূল ক্যাম্পাস মাতসুমতো শহরে, ইঞ্জিনিয়ারিং আর সামাজিক বিজ্ঞান স্কুলগুলো নাগানো শহরে। ওয়েদা শহরে আছে মলিকুলার বায়োলজি, টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং, সিল্ক সায়েন্স ইত্যাদি বিভাগগুলো। ইনা ভ্যালিতে রয়েছে কৃষি অনুষদ এবং তৎসংশ্লিষ্ট বায়োটেক বিভাগগুলো। জাপানের বিশ্ববিদ্যালয়ের সাথে বাংলাদেশের তো বটেই অনেক উন্নত দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের সাথে মৌলিক পার্থক্য হচ্ছে কর্ম নিষ্ঠায়। রাত বারোটায় যদি ল্যাবে যান দেখবেন অনেকেই গবেষণা বা অধ্যয়নরত। অধ্যাপকগন রাত ৯-১০টা পর্যন্ত গবেষণাগারে থাকেন। জাপানি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের সন্ধ্যার আগেই ক্লাবে যাওয়া এবং তারপর লাল, নীল, সোনালী বাহারি বর্ণে বিভক্ত হয়ে ব্যাক্তি বা গোষ্ঠী স্বার্থসংশ্লিষ্ট বাহারি তরঙ্গদৈর্ঘ্যে রাজনীতি করার সময় এবং রুচি কোনটাই নেই। গবেষকদের কখনও কখনও দুই ২-৩ দিন একটানা ল্যাবেই সময় কাটাতে হয়। ল্যাবে ঘুমানোর সরঞ্জামও থাকে। এমনই এক পরিবেশে ব্যস্ততা আর চাপের মাঝে দেখতে দেখতে বেশ প্রথম প্রবাসকালীন অভিজ্ঞতায় খানিকটা সময় পার হয়ে গেল। প্রথবারের মত দেশ ছেড়ে একটানা আড়াইবছর প্রবাসী ছাত্রজীবন কাটানোর পর মাস্টার্সটা শেষ করে পিএইচডি কোর্স শুরু করে ৯৩ সালের সামার ভেকেশনে ভাবলাম দেশ থেকে একবার বেড়িয়ে আসি।

দেশে যাবার প্রস্তুতিতে সস্তায় টিকেট খুঁজতে গিয়ে দেখলাম পিআইএ আর বাংলাদেশ বিমানের ফ্লাইটদ্বয়ে নারিতা থেকে ঢাকা বেশ সুবিধেজনক। ছাত্র অবস্থায় একটু কম দামে প্রয়োজনীয় কিছু কিনতে পারলে অন্য খাতে খরচ করার একটু সুবিধে হয়। তবে জীবনের বিভিন্ন বাঁকে বাঁকে দেখেছি সস্তার আসলেই তিন অবস্থা। মাসে ১৮০০ মার্কিন ডলারের সম্পূর্ণ ট্যাক্স-ফ্রি মনবুশো (জাপান শিক্ষা মন্ত্রণালয়) স্কলারশিপে বলা যায় ছাত্র হিসেবে মোটামুটি উচ্চবিত্তের পর্যায়ে। এখনকার অভিজ্ঞতায় মনে হয় ১০০-২০০ ডলার বাঁচাতে গিয়ে দুর্গতির পথে না হাঁটাই ভাল, বিশেষ করে যখন সঙ্গতি থাকে। কেনাকাটার সবচেয়ে বড় সেলুকাসটা হচ্ছে, কেনার আগে পয়সা বাঁচানোর একপেশে চিন্তাটা কেনার পরে একেবারেই উবে যায় এবং ভর করে পণ্যটির গুনগত মানের সন্তুষ্টির উপর অর্থাৎ কেনার পর দামের চাইতে সার্ভিসটাই মুখ্য হয়ে যায়। বহু ক্ষেত্রেই সস্তা আর সন্তুষ্টি একপথে হাঁটে না।

বাংলাদেশে উড়বার জন্যে ইনাভ্যালী থেকে উজার করে দেওয়া প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের মাঝে অসংখ্য পাহাড়ের পাশ দিয়ে এঁকেবেঁকে বা পাহাড় ভেদ করা অসংখ্য টানেলের উচ্চপ্রযুক্তির হাইওয়ে ধরে বাসে করে পৌঁছলাম টোকিওর ব্যস্ততম রেল ষ্টেশন শিঞ্জুকুতে। শিঞ্জুকু টোকিওর অন্যতম বিজনেস ডিসট্রিক্ট। টোকিও মেট্রোপলিটন গভর্নমেন্ট অফিসসমূহ আর সুউচ্চ স্কাইস্ক্রেপারের জন্যে বিখ্যাত এই শিঞ্জুকু। গিনিজ বিশ্ব রেকর্ড অনুসারে পৃথিবীর ব্যস্ততম রেলস্টেশন হচ্ছে শিঞ্জুকু। গড়পড়তায় প্রতিদিন প্রায় ৪০ লক্ষ লোক এই রেল ষ্টেশন ব্যবহার করে। ৩৬টি নিজস্ব প্লাটফর্ম, পরবর্তী স্টেশনের সাথে সংযুক্ত ১৭টি প্লাটফরম আর ২০০ এর অধিক মাটির নীচে আর উপরে নির্গমন/এক্সিট গেট সমৃদ্ধ এই শিঞ্জুকু ষ্টেশন। আন্ত-সিটির দূরপাল্লার বাস এবং এয়ারপোর্ট শাটল বাসের হাইটেক বাস টার্মিনালের জন্যেও বিখ্যাত শিঞ্জুকু ষ্টেশন। শিঞ্জুকু ষ্টেশন থেকে দ্রুতগতির এয়ারপোর্ট শাটল ট্রেন নারিতা এক্সপ্রেসে নারিতা এয়ারপোর্টে পৌছানো সবচেয়ে আরামদায়ক। ১৯৯১ সাল থেকে নারিতা এক্সপ্রেসের যাত্রা শুরু। নারিতা এক্সপ্রেস পিক আওয়ারে প্রতি ৩০ মিনিট অন্তর অন্তর টোকিওর গুরুত্বপূর্ণ রেলষ্টেশনগুলো থেকে নারিতা এয়ারপোর্টে আসা-যাওয়া করে। প্রায় ১৩০ কিমি গতির এত ট্রেনটি টোকিও থেকে ৬০ কিমি পূর্বে অবস্থিত নারিতা এয়ারপোর্টের টার্মিনাল ১ এবং টার্মিনাল ২ এ থামে।

নারিতার এয়ারপোর্ট জাপানের দ্বিতীয় ব্যস্ততম আর বিশ্বের দশম ব্যস্ততম এয়ারপোর্ট। টোকিও শহরতলির হানেদা বিমানবন্দর জাপানের ব্যস্ততম আর পৃথিবীর চতুর্থ ব্যস্ততম এয়ারপোর্ট। হিথ্রোকে অতিক্রম করে সহসাই হানেদার তৃতীয় স্থানে চলে যাবার সম্ভাবনা। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জর্জিয়ায় হার্টসফিল্ড-জেক্সন আটলান্টা এয়ারপোর্ট বিশ্বের ব্যস্ততম এয়ারপোর্ট যার পরেই রয়েছে বেইজিং এয়ারপোর্ট। নারিতা এয়ারপোর্ট টোকিওর পাশের প্রিফেকচার চিবাতে অবস্থিত। মোট ৫টি রানওয়ে থাকার কথা থাকলেও স্থানীয় বাসিন্দাদের প্রচণ্ড বিক্ষোভের মুখে ১৯৭৮ সালে একটিমাত্র রানওয়ে নিয়ে যাত্রা শুরু এই এয়ারপোর্টের।বর্তমানে রানওয়ের সংখ্যা বেড়েছে। নারিতায় রয়েছে জাপানের দীর্ঘতম ৪ কিমি লম্বা রানওয়ে। জন-অসন্তোষ, বিক্ষোভ, আইন-আদালত ইত্যাদি কারণে রাত ১১টা থেকে ভোর ৬টা পর্যন্ত ফ্লাইট উঠানামার উপর নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। নারিতা বিমানবন্দরের এই সীমাবদ্ধতার কারণে ওসাকাতে সমুদ্র ভরাট করে কানসাই বিমানবন্দরের নির্মাণ এবং ২৪ ঘণ্টার বিমান উঠানামার আয়োজন। গত ৩৬ বছরে প্রায় ১ বিলিয়ন যাত্রী পরিবহন করেছে নারিতা এয়ারপোর্টটি। জাপান এয়ারলাইন্স(জাল), অল নিপ্পন এয়ারওয়েজ (আনা) এর ইন্টারন্যাশনাল হাব এই এয়ারপোর্টটি যুক্তরাষ্ট্রের ডেল্টা আর ইউনাইটেডের এশিয়া হাবও বটে। নারিতা এয়ারপোর্টে প্রবেশের মুখে আইডি চেক করার বিষয়টি ব্যাতিক্রমধর্মী এবং উন্নত বিশ্বের এয়ারপোর্টগুলোতে এই চিত্রটি দেখা যায় না। সাধারণত বোর্ডিং পাস নেবার পর টার্মিনালের ভেতরে সিকিউরিটি চেকের সময় আইডি দেখাতে হয়। নারিতা এয়ারপোর্ট নিয়ে স্থানীয়দের আপত্তি আর সহিংস ঘটনাগুলো মূলত এই কড়াকড়ির কারণ। সামার অলিম্পিককে সামনে রেখে ২০১৫ সালের শুরুতে অবশ্য এই আইডি চেক ব্যবস্থা প্রত্যাহার করা হয়েছে।

নারিতা এয়ারপোর্ট

নারিতা এয়ারপোর্টের মোট টার্মিনাল তিনটি। স্টার এলায়েন্সের সদস্য বিমান সংস্থা যেমন অল নিপ্পন, থাই, সিঙ্গাপুর, এয়ার কানাডা, ইউনাইটেডের টার্মিনাল হচ্ছে টার্মিনাল ১। ওয়ান ওয়ার্ল্ডের সদস্য এয়ারলাইন্স সমূহ যেমন জাপান এয়ারলাইন্স, আমেরিকান, ব্রিটিশ, ক্যাথে প্যাসিফিক, মালয়েশিয়ান এয়ারলাইন্স ইত্যাদির টার্মিনাল ২ এ উঠানামা করে। টার্মিনাল ৩ যাত্রা শুরু করে ২০১৫ সালের এপ্রিলে সাশ্রয়ী বাজেট এয়ারলাইন্সের বিমান উঠানামার জন্যে।

প্রবাস থেকে প্রথমববারের মত দেশে ফেরবার অনুভূতি অনেক বেশী আবেগঘন এবং এর সঙ্গে আবার জড়িয়ে আছে প্রথবারের মত তৎকালীন সময়ের সেলিব্রেটি বিমানবন্দর নারিতার অভিজ্ঞতাও। পিআইএ’র ফ্লাইট পিকে ৭৬৩ চড়ে নারিতা থেকে ম্যানিলা হয়ে ব্যাংকক। পাকিস্থান এয়ারলাইন্সের ফ্লাইটটির ম্যানিলাতে ছিল দু-ঘণ্টার যাত্রা বিরতি। এই যাত্রা বিরতিতে যে অভিজ্ঞতা অর্জিত হয়েছিল তা খুব সুখকর ছিলনা। বিমানবন্দরের সিকিউরিটি এলাকার ভেতরের ওয়াশরুমে বখশিশের জন্যে পরিছন্নকর্মীর পিড়াপীড়ি দৃষ্টিকটুই বটে। ম্যানিলা এয়ারপোর্টের ব্যবস্থাপনা বিষয়ে তেমন সুনাম ছিলনা। তবে সম্প্রতি অনেক পজিটিভ পরিবর্তন হয়েছে। পেশাগত কারণে বহুবার ম্যানিলা সফর করতে হয়েছে, কিন্তু ১৯৯৩ সালের সেইরকম অভিজ্ঞতার মুখোমুখি আর হতে হয়নি। যাত্রা বিরতির পর প্লেনে উঠতে গিয়ে দেখলাম প্লেনের বোর্ডিং প্যাসেজে একটি ভাঙ্গা টেবিল আড়াআড়ি করে রেখে পথ আগলিয়ে সবার পাসপোর্ট আর বোর্ডিংপাস চেক করা হচ্ছে। যারা চেক করছেন তাদের গায়ে কোন ইউনিফরম ছিলনা। সাধারণ পোশাকে কিছু বেয়াদপ আর রগচটা টাইপের পাকিস্থানী গাবতলির বাসের কন্ডাক্টরের অপেশাদার স্টাইলে যাত্রীদের এক এক করে চেক করে প্লেনে ঢোকাচ্ছেন। পুরো প্রক্রিয়াটিতে কোন পেশাদারিত্ব বা যাত্রী নামক এই ক্লায়েন্টদের প্রতি কোন প্রকার সৌজন্যবোধ ছিলনা। পাকিস্থানিদের ওই আচরণে মনে হচ্ছিল পাকিরা আসলেই সভ্যতা থেকে অনেক দূরে। যাক, অসন্তুষ্টচিত্তে অবশেষে ব্যাংকক পৌছালাম।

তারপর ব্যাংকক থেকে বিমানে ঢাকা, ফ্লাইট বিজি ৭৭। আমাদের ন্যাশনাল ফ্ল্যাগ ক্যারিয়ারে এটিই আমার প্রথম উঠা। নিজের দেশের প্লেনে চড়ার হিসেব-নিকেশটা একটু অন্য রকম; সার্ভিসের গুনগত মানের চেয়ে বড় হয়ে যায় মায়া, দেশপ্রেম আর অনুভূতি। বিমানের ফুড সার্ভিস বরাবরই ভাল। মূল অভিযোগটা ফ্লাইট শিডিউল আর গ্রাউন্ড সার্ভিস নিয়ে। ঢাকায় নেমে যথারীতি কাটা পেলাম স্যুটকেস, হাতিয়ে নিয়েছে অনেক গুরুত্বপূর্ণ জিনিস। বিমানবন্দরে অভিযোগ করেও লাভ নেই। বিগত দিনে এই চুরিটা অনেকটা অধিকারের পর্যায়ে চলে গিয়েছিল। ব্যাগ কেটে জিনিস হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ সম্প্রতি তেমন শোনা যায়না এবং এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি। হাতিয়ে নেওয়া জিনিসপত্রের মধ্যে এক বন্ধুর তার আত্মীয়কে উপহার দেওয়া একটি ক্যামেরা ছিল। বন্ধুত্বের সম্পর্কে এগুলো অনেকসময়ই স্পর্শকাতর বিষয় হিসেবে দেখা দেয়। ক্যামেরাটি নিরাপদে পৌঁছে দেওয়া ছিল আমার দায়িত্ব। কারণ নির্বিশেষে দায়িত্বশীলতা আর নৈতিকতার প্রেক্ষাপটে সেই দায়িত্ব পালনে আমি ব্যর্থ হয়েছিলাম। অতএব বায়তুল মোকাররম আর স্টেডিয়াম মার্কেট ঘুরে সেই একই মডেলের ক্যামেরা কিনে পৌঁছে দিয়েছি বন্ধুর আত্মীয়কে।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত