প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

কাজটা আওয়ামী লীগই করুক

সালেহ্ রনক : জাতীয় নির্বাচনের আর মাত্র ১৩ দিন বাকি। নির্বাচনকে সামনে রেখে সাধারণত রাজনৈতিক দলগুলো নিজ নিজ দলের নির্বাচনী ইশতেহার প্রকাশ করে। যদিও বিগত দিনগুলোতে ক্ষমতাসীন দলগুলোকে তাদের নির্বাচনী ইশতেহারের খুব সামান্যই বাস্তবায়ন করতে দেখা গেছে। কিন্তু দিন পাল্টাচ্ছে। তরুণ ভোটারদের কাছে প্রতিটি দলের নির্বাচনী ইশতেহার বেশ গুরুত্ব পাচ্ছে। আর পাচ্ছে বলেই এবার নির্বাচনে অংশগ্রহণ করা প্রতিটি দল ইশতেহার তৈরিতে বেশ সময় ব্যয় করছে, সহযোজন করছে নতুন নতুন প্রতিশ্রুতি। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোটের হিসাবে বড় দলগুলো এখনো তাদের নির্বাচনী ইশতেহার প্রকাশ করেনি। বিএনপি জোট তথা ঐক্যফ্রন্ট নির্বাচনী ইশতেহার প্রকাশের দিনক্ষণ ঘোষণা দিয়ে সরে এসেছে। তাই বলতেই হয় এবারের নির্বাচনে বড় রাজনৈতিক দল ও জোট ইশতেহার তৈরিতে তাড়াহুড়া করে কোনো ভুল করতে চাইছে না।

হাঁটি হাঁটি পা পা করে পুরো দেশ ৩০ ডিসেম্বরের খুব কাছাকাছি চলে এসেছে। কিন্তু উল্লেখ করার মতো, ১৫ ডিসেম্বর পর্যন্ত আলোচিত রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি) ও জাতীয় পার্টি(এরশাদ) তাদের নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণা করেছে। তবে সাধারণ জনগণের চোখ যেসব রাজনৈতিক দলের নির্বাচনী ইশতেহারের দিকে তাকিয়ে আছে তাদের মধ্যে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগসহ মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তির অন্যান্য রাজনৈতিক দলের নির্বাচনী ইশতেহার এখনও ঘোষিত হয়নি। যদিও ঐক্যফ্রন্ট ও আওয়ামী লীগ নানা সভা-সমাবেশে নতুন নতুন প্রতিশ্রুতির কথা তুলে ধরছে। যা দেখে কিছুটা হলেও আঁচ করা যাচ্ছে কি থাকতে যাচ্ছে তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে। কিন্তু যে ইস্যুতে রাজনৈতিক দলগুলো দ্বিধাবিভক্ত, রাজনৈতিক সংকট দিন দিন বেড়েই চলছে সে ব্যাপারে এখনো পর্যন্ত কেউ কিছু বলেনি, ইঙ্গিতেও প্রকাশ করেনি। নির্বাচনী ইশতেহারে যুদ্ধাপরাধীদের রাজনীতি নিষিদ্ধের প্রশ্নে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের রাজনৈতিক দলগুলোর স্পষ্ট বক্তব্য এখন সময়ের দাবি।

সিপিবি তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে ৩০ দফা কর্মসূচি বাস্তবায়নে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা পুনরুদ্ধার ও বাহাত্তরের সংবিধানের মূলভিত্তি পুনঃপ্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। কিন্তু সবচেয়ে যে বিষয়টি জরুরি সেই যুদ্ধাপরাধী ও তাদের পরিবারের সদস্য এবং সংগঠনের ক্ষেত্রে তাদের কোনো সুস্পষ্ট বক্তব্য পাওয়া যায়নি। যুদ্ধাপরাধীদের সম্পদ বাজেয়াপ্তকরণ বিষয়ক কোনো প্রতিশ্রুতিও নেই তাতে। বিষবৃক্ষের আগা কেটে গোড়ায় পানি ঢাললে তাতে বিষবৃক্ষের তেমন কোনো ক্ষতি সাধিত হয় না। বরং নতুন ডাল-পালাসহ পত্রপল্লবে সুশোভিত হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়। আর এই অপকর্মটিই এ যাবৎকাল ধরে হয়ে এসেছে। কাল পরিক্রমায় যুদ্ধাপরাধী, তাদের পরিবার ও তাদের সংগঠনের শিকড় শুধু গভীরেই প্রবেশ করেছে, এ দেশের আলো বাতাসে হয়েছে হৃষ্টপুষ্ট। ফলে যুদ্ধাপরাধের দায়ে অভিযুক্ত দলটির নিবন্ধন বাতিল হলেও রাজনীতি ও নির্বাচন থেকে দূরে সরিয়ে রাখা সম্ভব হয়নি। নিরাপদ বাংলাদেশের প্রশ্নে, দ্বিধাবিভক্ত জাতিকে একত্রীকরণের প্রশ্নে কীভাবে এই অপশক্তিকে মোকাবেলা করা হবেÑ সে বিষয়টি এখনও অস্পষ্ট। রাজনীতির অংশীদার করে, ক্ষমতার সংস্পর্শে,অর্থনৈতিক শক্তি মজবুত করার সুযোগ দিয়ে এই দানবীয় শক্তিকে পরাভূত করা সম্ভব নয়।

জল অনেক গড়িয়েছে, এদের নগ্ন উপস্থিতি ও হস্তক্ষেপে দেশের রাজনীতি হয়েছে কলুষিত ও কালিমালিপ্ত । এখন আর নিরপেক্ষতার ভানে চোখ বন্ধ রাখলেই প্রলয় ঠেকিয়ে রাখা যাবে না। নতুন করে ভাবার সময় পার হয়ে যাচ্ছে দ্রুতই, রুখে দাঁড়াতেই হবে, নিতে হবে সাহসী সিদ্ধান্ত। বিজয়ের মাসে দাঁড়িয়ে একাত্তরের ঘাতক-দালাল-যুদ্ধাপরাধীদের বিষয়ে বাহাত্তরের সংবিধানকে ভিত্তিমূল ধরে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হবে। বাহাত্তরের সংবিধানে ওই ঘৃণিত শক্তির রাজনীতি করার কোনো অধিকারই ছিলো না। কিন্তু পরিতাপের বিষয় বাংলা জননী আটচল্লিশে পা রাখার পরও এরা এখনো রাজনীতিতে বহাল তবিয়তে বর্তমান এবং এই দানব শক্তির অর্থনৈতিক শরীরও বেশ মোটাতাজা। তারা শুধু তাতেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, এই অপশক্তি তাদের দেশি-বিদেশি দোসরদের সাথে নিয়ে স্বাধীন বাংলাদেশের নিরাপত্তাকে হুমকির মুখে ফেলে দিয়েছে। শুধু তাই নয় বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের প্রশ্নে প্রকাশ্যে তারা যুদ্ধ ঘোষণা করেছে। তারা বাংলাদেশ বিরোধী নানাবিধ আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রে জড়িত, অর্থায়নের মাধ্যমে সুসংগঠিত করছে জঙ্গিগোষ্ঠীকে, উসকে দিচ্ছে মৌলবাদকে। দেশের এমন সংকটময় মুহূর্তে তাদের নাগরিকত্ব বড় প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে। তাই আসন্ন নির্বাচনে বেকার ভাতা কিংবা চাকরির বয়সসীমা অথবা দ্বিতীয় পদ্মা সেতুর চেয়েও অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ যে বিষয়টি তা হলো একাত্তরের ঘাতক দালাল, যুদ্ধাপরাধী ও তাদের পরিবারের সদস্যদের নাগরিকত্ব বাতিলের বিষয়টি নির্বাচনী ইশতেহারে এটা থাকা অধিক জরুরি। আগামী নির্বাচনের মাধ্যমে যে দল বা জোট ক্ষমতার মসনদে যাবে তারা এই বিষয়ে কী পদক্ষেপ গ্রহণ করবে তার জন্য দরকার সুস্পষ্ট ঘোষণা ও দিকনির্দেশনা দেখতে চাই।

মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষের দল হিসেবে আওয়ামী লীগ নিজেদের দাবি করে আসছে এবং এই পরিচয়ে তারা গর্ববোধ করতে পছন্দ করে। তাই শুধু দাবি আর গর্ব অনুভবের মাঝেই দল হিসেবে নিজেদের সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না। কার্যকরী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে সেই দাবির পক্ষে জনমত জোরালো করে তুলতে হবে। বিএনপিও নিজেদের মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষের শক্তি হিসেবেই নিজেদের দাবি করে এবং আমরা সাধারণ জনতাও সেই দাবিতে বিশ্বাস রাখতে চাই। কিন্তু বিএনপি ও তার জোট যুদ্ধাপরাধী ও তাদের সংগঠনের দীর্ঘদিনের নির্ভরযোগ্য মিত্র হিসেবে অংশীদারভিত্তিক রাজনীতি করে আসছে। দেশি-বিদেশি নানা চাপের মুখেও তাদের দীর্ঘদিনের মিত্রকে ত্যাগ করেনি। জামায়াতে ইসলামীকে সাথে রাখার কারণে সাংগঠনিক দুর্বলতাসহ বিএনপি নানা বিতর্ক ও সমালোচনার মুখে পড়লেও সেই দলকে নিয়েই আসন্ন নির্বাচনে জোটবদ্ধ হয়ে অংশগ্রহণ করেছে। শুধু তাই নয়, ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে নির্বাচনের মাঠে লড়ছে। তাই বিএনপি ও তার জোটের কাছ থেকে একাত্তরের ঘাতক দালাল, যুদ্ধাপরাধী ও তাদের পরিবারের সদস্যদের রাজনীতি থেকে দূরে রাখার প্রশ্নে নাগরিকত্ব বাতিলে বিষয়ে নির্বাচনী ইশতেহারে প্রতিশ্রুতি আশা করা বেশি হয়ে যাবে এবং তা প্রায় অসম্ভব। এবং অনেকটা হাস্যকরও বটে। তারপরও আশা রাখতে চাই, যেহেতু তাদের দলের প্রতিষ্ঠাতা একজন মুক্তিযোদ্ধা ও তারা দাবি করে আসছে তাদের দলে প্রচুর মুক্তিযোদ্ধা রয়েছে সেহেতু তারাও এই সাহসটা দেখাক। যদিও স্বাধীন দেশের রাজনীতিতে মুক্তিযোদ্ধা জিয়াউর রহমানই স্বাধীনতাবিরোধীদের পুনর্বাসিত করে গেছেন। তাই অতীতকে পেছনে ফেলে সামনে এগিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রেও সম্ভবনা ক্ষীণ। কারণ যখন দেখি ঐক্যফ্রন্টের মোড়কে বিএনপি-জামায়াত নতুন করে মিত্রতাকে পাকাপোক্ত করেছে, জামায়াত প্রশ্নে ঐক্যফ্রন্ট বেফাস মন্তব্য করছে তখন আশা দ্রুতই সংকুচিত হয়ে পরে।

বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ ২০০৮ সালের নির্বাচনে তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে অত্যন্ত জোরালোভাবে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলো। তখনকার নতুন ভোটাররা আওয়ামী লীগের দেয়া প্রতিশ্রুতির আলোকে তাদেরকে ভোট দিয়ে নির্বাচিত করে সরকারে বসিয়েছিলো। এতে প্রমাণিত হয় যে, সে সময়কার নতুন প্রজন্মের তথা ভোটারদের তা ছিলো প্রাণের দাবি। আওয়ামী লীগ সরকারও তাদের দেয়া প্রতিশ্রুতি রক্ষা করেছে। যুদ্ধাপরাধের দায়ে অভিযুক্তদের বিচারের মাধ্যমে ফাঁসির দণ্ডে দণ্ডিত করেছে, কেউ কেউ যাবৎজীবন কারাদণ্ড ভোট করছে। প্রমাণ সাপেক্ষে এটা বলা যায়, আওয়ামী লীগ সরকার গত দশ বছর তাদের দেয়া প্রতিশ্রুতি রক্ষার পথেই হেঁটেছে। কিন্তু এই দশ বছরের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের পথ মোটেই মসৃণ ছিলো না। পুরো বিচার প্রক্রিয়াকে বিতর্কিত ও নস্যাৎ করার জন্য হত্যা ও নাশকতার পথ বেছে নিয়েছিলো জামায়াত-শিবির নামক অপশক্তি। নিকট অতীত ঘাটলে দেখা যায় যুদ্ধাপরাধীদের উত্তরসূরীদের প্রত্যক্ষ মদদে জঙ্গিবাদ বিস্তার লাভ করেছে। আর এর কারণ জামায়াতের রাজনীতি নিষিদ্ধ না হওয়ার কারণে, তাদের রাজনৈতিক অধিকার কেড়ে না নেয়ার সুযোগে।

এটা দ্রুব সত্য যে, একাত্তরের ঘাতক দালাল, যুদ্ধাপরাধী ও তাদের উত্তরসূরীদের রাজনৈতিক অধিকার তথা নাগরিকত্ব কেড়ে না নেয়া পর্যন্ত বাংলাদেশের রাজনীতিতে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে না। দেশের অভ্যন্তরে মুক্তিযুদ্ধের বিরোধী পক্ষকে নাগরিক অধিকার দিয়ে বাঁচিয়ে রেখে স্বাধীনতার প্রকৃত সুফল ভোগ করা সম্ভব নয়। যেহেতু স্বাধীনতার পক্ষের বৃহৎ দল হিসেবে আওয়ামী লীগ অতীতে তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের প্রতিশ্রুতি দেয়ার সাহস দেখিয়েছে এবং তা বাস্তবায়নে দক্ষতা দেখিয়েছে তাই স্বাভাবিক কারণেই সাধারণ জনতা চাইছে এবারের নির্বাচনী ইশতেহারেও যুদ্ধাপরাধী ও তাদের উত্তরসুরীদের রাজনীতিতে নিষিদ্ধ তথা তাদের নাগরিকত্ব রহিতকরণে প্রতিশ্রুতি আশা করে। আওয়ামী লীগের পাশাপাশি স্বাধীনতার স্বপক্ষের অন্যান্য দলও যদি তাদের ইশতেহারে একই প্রতিশ্রুতি নিয়ে এগিয়ে আসে তাহলে স্বাধীন দেশের রাজনীতি থেকে এই বিষবৃক্ষ সমূলে উৎপাটন খুব বেশি কঠিন কাজ হবে না। আর আওয়ামী লীগসহ অন্যান্য স্বাধীনতার পক্ষের দলগুলো যদি তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে এই প্রতিশ্রুতি রাখতে ব্যর্থ হয় তাহলে স্বাধীনতার পক্ষ বিপক্ষের বিভাজন রেখা তাদেরই তুলে নিতে হবে। স্বাধীনতা লাভের প্রকৃত সুফল ভূলুণ্ঠিত হবে এমন কাজ তারা করবেন না বলেই প্রত্যাশা করছি। ফেসবুক থেকে

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত