প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়ক :৯০ কিলোমিটারে ৪৩ স্থায়ী হাটবাজার ১২টিতে তীব্র যানজট

ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়ক :৯০ কিলোমিটারে ৪৩ স্থায়ী হাটবাজার ১২টিতে তীব্র যানজট

বণিক বার্তা : টুকরি নিয়ে ছুটছে কুলি-মুটের দল, চলছে সবজিবাহী রিকশা-ভ্যান। সড়কের পাশে এলোমেলো দাঁড়ানো ট্রাক। সড়কেও অবস্থান করছে দু-একটি। ক্রেতা-বিক্রেতার হাঁক-ডাক, মানুষের কোলাহল, যানবাহনের হর্ন— সব মিলিয়ে জমজমাট বাজার। ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কের বাইপাইল ব্রিজ কাঁচাবাজারের নিত্যদিনের চিত্র এটি।

কেবল এটি নয়, ঢাকার গাবতলী থেকে টাঙ্গাইলের এলেঙ্গা পর্যন্ত ৯০ কিলোমিটারের মধ্যে এ রকম প্রায় অর্ধশত স্থায়ী হাটবাজার রয়েছে মহাসড়কটির দুপাশে। রাস্তার পাশে অবৈধভাবে গড়ে ওঠা এসব হাটবাজারের কারণে রাজধানীর সঙ্গে উত্তরাঞ্চলের ১৬ জেলায় যাতায়াতের প্রধান এ সড়কে প্রায় লেগে যায় তীব্র যানজট।

১৯২৫ সালের হাইওয়ে অ্যাক্ট ও ২০১৮ সালের সড়ক পরিবহন আইন অনুযায়ী, মহাসড়কের দুই পাশে ১০ মিটারের মধ্যে কোনো হাটবাজার বা অবৈধ স্থাপনা থাকতে পারবে না। তবে সম্প্রতি ঢাকার গাবতলী থেকে টাঙ্গাইলের এলেঙ্গা পর্যন্ত সরেজমিন ঘুরে মহাসড়কের দুই পাশে ১০ মিটারের মধ্যে অন্তত ৪৩টি স্থায়ী বাজারের দেখা মিলেছে। এর মধ্যে অন্তত ১২টি বাজার এলাকায় দেখা দিচ্ছে তীব্র যানজট। এক বা একাধিক দিনের সরকারি ও ধর্মীয় ছুটিতে তা প্রকট আকার ধারণ করছে। মহাসড়কের পাশে গড়ে ওঠা হাটবাজারগুলোকে যানজটের অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করে পরিবহন বিশেষজ্ঞরাও বলছেন, অবকাঠামো এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য বিরাট অন্তরায় এসব অবৈধ হাটবাজার।

বুড়িগঙ্গার একপাড়ে গাবতলী, অন্যপাড়ে আমিনবাজার। মাঝে গাবতলী-আমিনবাজার সেতু। ঢাকা থেকে রওনা দিয়ে এ সেতু পার হয়েই প্রথম মন্থর হয়ে আসে উত্তরাঞ্চলমুখী যানবাহনের গতি। দিন-রাতের একটা বড় সময় থাকে তীব্র যানজট। মহাসড়কের দুই পাশে ১০ মিটারের মধ্যে স্থায়ী হাটবাজার থাকায় মানুষের চলাচল বেশি এখানে। ফলে যানজট না থাকলেও কাঙ্ক্ষিত গতিতে চলতে পারে না কোনো যানবাহন।

আমিন বাজারের পর মহাসড়কটির আরেকটি যানজটপ্রবণ এলাকা হেমায়েতপুর। এখানেও রাস্তার ১০ মিটারের মধ্যে গড়ে উঠেছে অবৈধ হাটবাজার। আমিনবাজার-হেমায়েতপুরের ১০ কিলোমিটারের মধ্যে স্থায়ী হাটবাজার রয়েছে আরো দুটি। একটি দেওয়ানবাড়ী এলাকায়, অপরটি বলিয়ারপুরে।

সাভারে এসে যানজটে না পড়ার অভিজ্ঞতা কালেভদ্রে পান উত্তরাঞ্চলে যাতায়াতকারী মানুষ। সাভার বাসস্ট্যান্ডসহ আশপাশে মহাসড়কের ধার ঘেঁষে হাটবাজার ও পার্শ্ব রাস্তার সংযোগ এখানে যানজটের প্রধান কারণ। হেমায়েতপুর-সাভার (১২ কিলোমিটার) অতিক্রম করতে গিয়ে ছোট-বড় আরো পাঁচটি হাটবাজার এলাকা পাওয়া যাবে, যেগুলো গড়ে উঠেছে রাস্তার ১০ মিটারের মধ্যে। এগুলো হলো— উলাইল বাজার, গেডা, আনন্দপুর, থানা বাসস্ট্যান্ড ও মজিদপুর।

গাবতলী ও আবদুল্লাহপুর ছেড়ে যাওয়া গাড়ি একবিন্দুতে মেলে আশুলিয়ায়। যানবাহনের চাপ বেড়ে যাওয়ায় এখানে দিনের বেশির ভাগ সময়ই যানজট থাকে। একদিকে বাড়তি যানবাহনের চাপ, অন্যদিকে সড়কের ধার ঘেঁষা হাটবাজার— এ দুয়ে সৃষ্ট যানজটে নাজেহাল হয় মানুষ।

সাভার থেকে আশুলিয়ার দূরত্ব মাত্র সাড়ে সাত কিলোমিটার। এ সাড়ে সাত কিলোমিটারের মধ্যে এ রকম আরো পাঁচটি স্থায়ী হাটবাজার রয়েছে। ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কের অন্যতম যানজটপ্রবণ এলাকা বাইপাইল। এখানেও মহাসড়কের ১০ মিটারের মধ্যে গড়ে তোলা হয়েছে অবৈধ হাটবাজার। আশুলিয়া থেকে বাইপাইল যেতে এ রকম আরো তিনটি স্থায়ী হাটবাজার পড়বে, যেগুলোর কারণে যান চলাচল বিঘ্নিত ও যানজট তৈরি হয়। বাইপাইল পার হলেই ঢাকা ইপিজেড এলাকা। এখানে পণ্যবাহী যানবাহনের চাপ রয়েছে। তার ওপর দুই পাশে গড়ে তোলা হাটবাজারের কারণে যানজট এখানে নিত্যসঙ্গী।

ঢাকা ইপিজেড এলাকা থেকে গাজীপুরের শ্রীপুর বাসস্ট্যান্ড পর্যন্ত সড়কের পাশে গড়ে উঠেছে আরো চারটি হাটবাজার। শ্রীপুরের চন্দ্রা ও কালিয়াকৈর এলাকাতেও একই অবস্থা। গাজীপুরের কালিয়াকৈর থেকে টাঙ্গাইলের মির্জাপুরের আগ পর্যন্ত হাটবাজার রয়েছে তিনটি। এরপর দেওহাটা বাসস্ট্যান্ড, কদিম বাসস্ট্যান্ড, পাকুল্যা বাজার, মহেড়া, নাটিয়াপাড়া বাজার, নয়া বাইপাস বাজার, রাবনা বাইপাস ও এলেঙ্গায় মহাসড়কের ১০ মিটারের মধ্যে অবৈধ হাটবাজার গড়ে তোলা হয়েছে।

শুধু ঢাকা-টাঙ্গাইল নয়, দেশের সব মহাসড়কেই গড়ে উঠছে অবৈধ হাটবাজার। এগুলো একদিকে যেমন যানজট তৈরি করে সময় ও অর্থ অপচয় করছে, তেমনি হাটবাজার এলাকায় বাড়ছে সড়ক দুর্ঘটনা। পাশাপাশি হাটবাজার এলাকায় সড়ক ক্ষতিগ্রস্তের হারও বেশি।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মাত্র ১০ মিটার নয়, মহাসড়কের ১০০-২০০ মিটারের মধ্যে হাটবাজার বসতে দেয়া উচিত নয়। এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) অধ্যাপক ড. সামছুল হক বলেন, মহাসড়কের পাশে বাজারভিত্তিক কর্মচাঞ্চল্য কখনই গ্রহণযোগ্য নয়। আমাদের দেশের মহাসড়কগুলো কিন্তু নামের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ না। মহাসড়কের মানদণ্ডে রাস্তার অন্তত ১০০ মিটারের মধ্যে হাটবাজার কোনোভাবেই যায় না।

তিনি বলেন, কোথাও একবার বাজার গড়ে উঠলে সেটি অপসারণ হওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। সড়কের পাশে হাটবাজার গড়ে ওঠা বন্ধে সরকারকে এখনই উদ্যোগী হতে হবে। পাশাপাশি বিদ্যমান আইনটি সংশোধন করে রাস্তার অন্তত ১০০ মিটারের মধ্যে হাটবাজার গড়ে তোলার উপরে বিধিনিষেধ আরোপ করতে হবে এবং সেগুলোর কঠোর প্রয়োগ করতে হবে।

১৯২৫ সালের হাইওয়ে অ্যাক্টে মহাসড়কের দুই পাশে ১০ মিটারের মধ্যে কোনো স্থাপনা নির্মাণের বিষয়ে বিধিনিষেধ রয়েছে। অন্যদিকে অনুমোদিত সড়ক পরিবহন আইন, ২০১৮-এর ৩৭ নম্বর (১ ও ২) ধারায় বলা আছে, কোনো ব্যক্তি ব্যবসায়িক বা অন্য কোনো উদ্দেশ্যে, মহাসড়কের মালিকানাধীন জায়গায় বা ক্ষেত্রমতে মহাসড়কের ঢাল থেকে উভয় পাশে ১০ মিটারের মধ্যে অবৈধভাবে কোনো স্থায়ী বা অস্থায়ী স্থাপনা (যেমন, হাটবাজার, দোকান ইত্যাদি) নির্মাণ করতে পারবেন না।

আইনটি উল্লেখ করে দেশের মহাসড়কগুলোর পাশে গড়ে ওঠা হাটবাজার অপসারণে কী ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে, তা জানতে চাইলে সওজ অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী ইবনে আলম হাসান বলেন, অবৈধ হাটবাজার অপসারণে আগে কার্যকরী আইন ছিল না। নতুন আইনে এটি যুক্ত হয়েছে। সারা দেশের সড়ক নেটওয়ার্কে গড়ে ওঠা অবৈধ হাটবাজার অপসারণ ও নতুন হাটবাজার গড়ে ওঠা রোধে আমরা কাজ করে যাচ্ছি।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বাধিক পঠিত