প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

তৈরি পোশাক শিল্প : ধারাবাহিক কর্ম বিরতিতে উদ্বেগে মালিকরা

বণিক বার্তা : শিল্প অধ্যুষিত অঞ্চলের বেশকিছু পোশাক কারখানার শ্রমিকরা নতুন মজুরি কাঠামোর প্রতিবাদে পাঁচদিন ধরে কর্মবিরতি পালন করছেন। এতে অঘোষিতভাবে বন্ধ হচ্ছে একের পর এক কারখানা। এ ধারা অব্যাহত ছিল গতকালও। শ্রমিকদের কর্মবিরতির জেরে এখন পর্যন্ত আশুলিয়া ও সাভারেই বন্ধ হয়েছে অর্ধশতাধিক কারখানা। এ নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে শিল্প মালিকদের মধ্যে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে আগামীকাল ক্রাইসিস ম্যানেজমেন্ট কোর কমিটির সভা আহ্বান করা হয়েছে।

শিল্প অধ্যুষিত অঞ্চলগুলোয় খোঁজ নিয়ে জানা যায়, নতুন মজুরি কাঠামোয় অসন্তোষ প্রকাশ করে গতকাল পঞ্চম দিনের মতো অনেক শ্রমিক কারখানায় এসেও কাজ না করে ফিরে যান। একপর্যায়ে কারখানা বন্ধ করে দেয়া হয়। গতকাল কর্মবিরতির ঘটনা আশুলিয়ায়ই বেশি ঘটেছে। এ এলাকায় পোশাক কারখানা আছে প্রায় ২০০টি। এর মধ্যে ৪৩টি কারখানা শ্রমিকদের কর্মবিরতির ঘটনায় বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। আনুষ্ঠানিক ঘোষণা না থাকলেও নিজস্ব উদ্যোগে কোনো কোনো শিল্প মালিক ১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত কারখানা বন্ধ রাখার সিদ্ধান্তও নিয়েছেন।

গতকাল কর্মবিরতির জের ধরে যেসব কারখানার কার্যক্রম বন্ধ ছিল, সেগুলোর মধ্যে আছে আশুলিয়ার জেনারেশন নেক্সট, ক্রসওয়্যার, হা-মীম, টপ জিন্স, শ্রাবণ, নিউ এজ, এআর জিন্স, এফবিএস ডেনিম, লিলি অ্যাপারেল, শারমিন, উইন্টি, জি-ম্যাট ক্লদিংসহ মোট ৪৩টি কারখানা। গাজীপুর এলাকায় এ ধরনের কারখানার সংখ্যা ৩৮। সব মিলিয়ে প্রায় ৮০টি কারখানায় কর্মবিরতি ও উৎপাদন বন্ধের ঘটনা ঘটেছে। সংখ্যাটি ক্রমেই বাড়ছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয় আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা।

আশুলিয়া শিল্প পুলিশ-১-এর পরিদর্শক মাহামুদুর রহমান বলেন, মজুরিবৈষম্যের অভিযোগ তুলে টানা পঞ্চম দিনের মতো সাভার-আশুলিয়ার প্রায় ৩০টি পোশাক কারখানায় বিক্ষোভ করেছেন শ্রমিকরা। এর মধ্যে ২০টি কারখানায় সাধারণ ছুটি ঘোষণা করা হলে শ্রমিকরা বাড়ি ফিরে যান। তবে যেকোনো ধরনের অপ্রীতিকর পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কারখানাগুলোর সামনে অতিরিক্ত পুলিশ ও বিজিবি মোতায়েনের পাশাপাশি শিল্প এলাকায় চারজন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট কাজ করছেন।

আশুলিয়ার পোশাক শ্রমিকদের উত্তেজনা মূলত নতুন মজুরি কাঠামো বাস্তবায়নকে ঘিরে। তারা নিশ্চিন্ত হয়ে জানতে চাইছেন, নতুন কাঠামোয় মজুরি ঠিক কত হবে। এ বিষয়ে তাদের নিজস্ব প্রত্যাশার হিসাবও আছে, যার সঙ্গে তুলনামূলক বিশ্লেষণও করছেন তারা। তাদের দাবি, সব গ্রেডেই মজুরি ন্যূনতম ২ হাজার ৭০০ টাকা বাড়াতে হবে।

যদিও শিল্প মালিকদের অনেকেই জানুয়ারিতে কোন গ্রেডের কোন শ্রমিক কত মজুরি প্রাপ্য হবেন, তা বিশ্লেষণ শুরু করেছেন। শ্রমিকরা জানতে চাইলে তারা বলছেন, আইনি কাঠামো অনুযায়ী শ্রমিকদের মজুরি যা হবে, তা-ই তারা পাবেন। কিন্তু কোনো শিল্প মালিকই স্পষ্ট করে বলছেন না, শ্রমিকদের প্রাপ্য কত হবে। এমন প্রেক্ষাপটেই শ্রমিকদের কর্মবিরতি।

আশুলিয়া এলাকার শিল্পসংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, ৯ ডিসেম্বর থেকে প্রতিদিনই কর্মবিরতি ও কারখানা বন্ধের ঘটনা বাড়ছে। ৯ ডিসেম্বর কর্মবিরতি ও বন্ধ হয় সাত-আটটি কারখানা। পরদিন সংখ্যাটি বেড়ে হয় প্রায় ১২। ১১ ডিসেম্বর বন্ধ হয় প্রায় ২৩টি, ১২ ডিসেম্বর ৩৬টি ও সর্বশেষ গতকাল বন্ধ হয় ৪৩টি কারখানা।

গাজীপুর সিটি করপোরেশনের চান্দনা চৌরাস্তায় স্টাইলিশ গার্মেন্টস কারখানার স্বত্বাধিকারী মো. সালাউদ্দিন চৌধুরী বলেন, পোশাক শ্রমিকদের সর্বনিম্ন বেতন ধরা হয়েছে ৮ হাজার টাকা, আগামী মাস থেকে যা কার্যকর হওয়ার কথা রয়েছে। কিন্তু শ্রমিকরা এখনই তা কার্যকরের দাবি জানাচ্ছেন। আবার কোনো কোনো এলাকায় শ্রমিকরা সর্বনিম্ন ৮ হাজার টাকা বেতনও মানতে চাইছেন না। বিভিন্ন মহল থেকে শ্রমিকদের মধ্যে অপপ্রচার চালানো হচ্ছে, তাদের বিভ্রান্ত করা হচ্ছে। শ্রমিকদের বিভ্রান্ত হওয়ার কোনো কারণ নেই। সর্বনিম্ন যে বেতন নির্ধারণ করা হয়েছে, যথাসময়েই তা কার্যকর করা হবে।

শ্রমিক অসন্তোষের কারণে গাজীপুর শিল্প এলাকায় বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে জেলা প্রশাসন। এর অংশ হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ এলাকাগুলোয় বিজিবি ও র্যাবের টহল বাড়ানো হয়েছে, যাতে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি না ঘটে। গাজীপুরের জেলা প্রশাসক ড. দেওয়ান মোহাম্মদ হুমায়ূন কবিরের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, যেসব কারখানায় বকেয়া বেতনসহ অন্যান্য সমস্যা রয়েছে, তা দ্রুত সমাধানের জন্য আমরা বিজিএমইএ, কারখানা কর্তৃপক্ষ, শ্রম অধিদপ্তর, কল-কারখানা পরিদর্শন বিভাগ, শিল্প পুলিশসহ সংশ্লিষ্ট সবার সঙ্গে আলোচনা করেছি। আশা করি, দ্রুত এসব সমস্যা সমাধান হয়ে যাবে।

শিল্পাঞ্চল সাভার-আশুলিয়ায় মজুরি কাঠামোয় বৈষম্যের অভিযোগে প্রায় ৩০টি কারখানায় গতকাল পঞ্চম দিনের মতো বিক্ষোভ করেছেন পোশাক শ্রমিকরা। সকালে কারখানায় প্রবেশ করেই উৎপাদন বন্ধ রেখে কর্মবিরতি শুরু করেন তারা। একপর্যায়ে তারা কারখানা থেকে বের হয়ে রাস্তায় নেমে এলে পুলিশের সঙ্গে পাল্টাপাল্টি ধাওয়া ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে।

একই দাবিতে আশুলিয়ার জিরাব, কাঠগড়া ও নরসিংহপুর এলাকার হা-মীম গ্রুপ, শারমিন গ্রুপ, টেক্স টাউন, এফজিএস ফ্যাশন, লিলি অ্যাপারেলস, সাউদার্ন গ্রুপসহ প্রায় ৩০টি কারখানার শ্রমিকরা বিক্ষোভ অব্যাহত রাখেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কর্তৃপক্ষ কারখানাগুলোয় সাধারণ ছুটি ঘোষণা করলে শ্রমিকরা বাড়ি ফিরে যান।

মজুরিবৈষম্যের অভিযোগে সাভারের হেমায়েতপুর হরিণধরা এলাকার স্ট্যান্ডার্ড গ্রুপের দুটি কারখানার শ্রমিকরা গতকাল প্রথম দিনের মতো কর্মবিরতিসহ বিক্ষোভ করেন। একপর্যায়ে তারা কারখানা থেকে বের হয়ে রাস্তায় অবস্থান নেন। এ সময় বিক্ষুব্ধ শ্রমিকরা পার্শ্ববর্তী ডার্ড গ্রুপের একটি কারখানায় ইটপাটকেল নিক্ষেপ করে ভাংচুর চালান। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে মালিকপক্ষ কারখানাটিতে সাধারণ ছুটি ঘোষণা করে।

শ্রমিকদের টানা কর্মবিরতি প্রসঙ্গে গতকাল রাত সাড়ে ৯টায় যোগাযোগ করা হলে বিজিএমইএ সভাপতি সিদ্দিকুর রহমান বলেন, আশুলিয়া ও গাজীপুরের একটি অংশ ঘিরে একই পরিস্থিতি বিরাজ করেছে। ১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত স্বাভাবিকভাবেই কারখানা ছুটি হয়ে যাচ্ছে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে ১৫ ডিসেম্বর ক্রাইসিস ম্যানেজমেন্ট কোর কমিটির সভা আহ্বান করা হয়েছে। নতুন কোনো সিদ্ধান্তের প্রয়োজন পড়লে সেখানে নেয়া হবে।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত