প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

আমরা কি ভুলে যাবো তরতাজা রক্তের দাগ?

অসীম সাহা : আজ ১৪ ডিসেম্বর শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস। প্রকৃতপক্ষে আজ বুদ্ধিজীবী স্মরণ দিবস। কারা সেই বুদ্ধিজীবী, যাদের আমাদের আজ স্মরণ করতে হবে? ১৯৭১ সালের এই দিনে আমাদের জাতীয় বিবেকের প্রতীক, আমাদের প্রগতিশীল ও ধর্মনিরপেক্ষ আন্দোলনের অকুতোভয় সৈনিক বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করেছিলো পাকিস্তান সেনাবাহিনীর এদেশিয় দোসর আল বদর, আল শামস-এর কশাইরা। পাকিস্তান সেনাবাহিনী ২৫শে মার্চ অপারেশন সার্চ লাইটের মাধ্যমে যেভাবে বাঙালিনিধন শুরু করেছিলো, তারই ধারাবাহিকতায় ডিসেম্বরে মুক্তিযোদ্ধা ও ভারতীয় মিত্রবাহিনীর যৌথ আক্রমণে পর্যুদস্ত পাকিস্তানবাহিনি দেশের প্রগতিশীল বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করতে এদের লেলিয়ে দিয়েছিলো। জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য চৌধুরী মইনুদ্দিন প্রদত্ত তালিকার ভিত্তিতে রাও ফরমান আলীর নীলনকশায় এই হত্যাযজ্ঞ শুরু হয় ১০ ডিসেম্বর থেকে ১৪ ডিসেম্বর পর্যন্ত।

বাংলাদেশকে মেধাশূন্য করার সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়িত করেছিলো যারা, তাদের কারও কারও বিচার হয়েছে, অনেকে পলাতক আছে; আর কেউ কেউ মৃত্যুবরণ করেছে। কিন্তু যে রক্তের হোলিখেলায় মত্ত হয়ে সেদিন বাংলাদেশের প্রাণভোমরাদের মেরে ফেলে বাংলাদেশকে মেধাশূন্য করার পরিকল্পনা তারা করেছিলো, তাতে তারা সফল হয়েছিলো। আজ আমাদের বর্তমান বুদ্ধিজীবীদের দিকে তাকালে আমরা তা সহজে বুঝতে পারি। সেই বিবেক, সেই কণ্ঠ, সেই শাণিত লেখনি এখন কোথায়? বুদ্ধিজীবীরা যে কারণে প্রাণ দিয়েছিলো, স্বাধীন বাংলাদেশে তাঁদের সেই স্বপ্ন কি পূরণ হয়েছে? আজ বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে সেই ত্যাগী ও মেধাবী মানুষ কই?

এইসব বুদ্ধিজীবীর শুধু চাওয়া আছে, দেয়া নেই। আজ সারাদেশে কারণে-অকারণে কতো অন্যায়-অবিচার ঘটে যাচ্ছে। কিন্তু বুদ্ধিজীবীদের ভূমিকা এখন এতোটাই ক্ষীণকায় স্রোতের মতো যে, তার সামান্যতম দোলাও এখন আর কোনো কাজে লাগে না। কিন্তু বুদ্ধিজীবীরা নির্বিকার। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর বদান্যতায় শুধু নানা ধরনের সুবিধা নেয়ার তৎপরতায় তারা ব্যস্ত। তাই সরকারি/আধা-সরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে বছরের পর বছর ধরে চেনা চেহারার জংধরা বস্তাপচা মালেরা রাজত্ব করে বেড়াচ্ছে। আসলে ভাবখানা এমন, তারা তো পদ ছাড়তেই চান। কিন্তু তাদের আসনে ‘সুপার-গ্লু’ লাগানো আছে বলে তারা সরতে চাইলেও চেয়ারসুদ্ধ উঠে আসে। তাই ‘পিরিতি কাঁঠালের আঠা/লাগলে পরে ছাড়ে না’র মতো তারা জড়িয়ে থাকেন। এই জন্যেই কি দেশের মেধাবী বুদ্ধিজীবীরা ১৪ ডিসেম্বরে তাঁদের জীবন দিয়েছিলেন? এ-জন্যেই কি সন্তানদের পিতামাতার তরতাজা রক্তে ভরে গিয়েছিলো বাংলাদেশের মাটি? মুষ্টিমেয় সুবিধাবাদী বুদ্ধিজীবীর স্বার্থ উদ্ধারের জন্য তবে এই রক্তদান? খুব স্বাভাবিকভাবেই যদি আজ আত্মদানকারী বুদ্ধিজীবীদের সন্তানদের মনে এই প্রশ্ন জাগে, তা হলে কি তাদের খুব দোষ দেয়া যাবে?

এ-প্রশ্ন জাতিরও। আজ ১৪ ডিসেম্বর আমরা আমাদের সেই সব বুদ্ধিজীবীকে স্মরণ করছি, যাদের কোনো লোভ ছিলো না। লোভের কাছে পরাজিত হয়ে তাঁরা সুবিধার যূপকাষ্ঠে নিজেদের বলি দেননি। তরুণ প্রজন্মকে এই দিনে সেই শপথ নিতে হবে, বুদ্ধিজীবীদের রক্তের ঋণ আমরা অবশ্যই শোধ করবো। আমরা কি ভুলে যাবো তরতাজা রক্তের দাগ? যদি ভুলি, তা হলে পৃথিবী জানবে, জাতি হিসেবে আমরা বেঈমান। যেভাবে মুষ্টিমেয় কুলাঙ্গার জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যা করে জাতি হিসেবে আমাদের কলংকিত করেছে, তেমনি করে আমরা আর কলংকিত হতে চাই না! জাতির মেধা ও মননের প্রতীক শহীদ বুদ্ধিজীবীদের স্মরণ করতে গিয়ে বুদ্ধিজীবীদের রক্তদানের বিদীর্ণ আত্মার হাহাকারের কথা যেন আমরা ভুলে না যাই। একমাত্র তা হলেই ১৪ ডিসেম্বর বুদ্ধিজীবীদের রক্তদান সার্থক হবে, অন্যথায় নয়।

লেখক : কবি ও সংযুক্ত সম্পাদক, দৈনিক আমাদেও নতুন সময়

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত