প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

ভোটের সময় মোবাইলে টুজি চায় আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী

বাংলা ট্রিবিউন : একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ফেসবুকসহ অন্যান্য সোশ্যাল নেটওয়ার্কিং মাধ্যম ব্যবহার করে গুজব ছড়িয়ে পরিস্থিতি অশান্ত করা হতে পারে বলে শঙ্কা প্রকাশ করেছেন আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যরা। এ আশঙ্কা থেকে তারা ভোটের সময় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোকে কঠোর নিয়ন্ত্রণে রাখার প্রস্তাব করেছেন। আর এর অংশ হিসেবে তারা মোবাইল প্রযুক্তি ফোরজি থেকে টুজিতে নামিয়ে আনারও সুপারিশ করেছেন। একইসঙ্গে ভোটে যাতে কালো টাকার লেনদেন না হয়, সে জন্য ভোটের তিন দিন আগ থেকে মোবাইল ব্যাংকিং বন্ধ রাখার সুপারিশ করা হয়েছে।

আসন্ন একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন উপলক্ষে বৃহস্পতিবার নির্বাচন ভবনে অনুষ্ঠিত আইন-শৃঙ্খলাবাহিনীর শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে নির্বাচন কমিশনের বৈঠকে এসব সুপারিশ আসে। বৈঠকে অংশ নেওয়া কয়েকজন রিটার্নিং অফিসার,পুলিশ ও নির্বাচনি কর্মকর্তার সঙ্গে আলাপে এসব তথ্য জানা গেছে। প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কে এম নূরুল হুদার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এ সভায় পুলিশের আইজি,সশস্ত্র বাহিনীর প্রিন্সিপাল স্টাফ অফিসার এবং র‌্যাব, আনসার, কোস্টগার্ডের মহাপরিচালক ও গোয়েন্দা সংস্থার শীর্ষ কর্মকর্তারা অংশ নেন। নির্বাচন ভবনে এ বৈঠক চলে চার ঘণ্টা।

প্রসঙ্গত, বর্তমানে বেশিরভাগ মোবাইল ফোন অপারেটর ফোরজি সুবিধা দিচ্ছে। উচ্চগতির এই সেবা টুজিতে নামিয়ে আনলে ইন্টারনেটের গতি একেবারেই সীমিত হয়ে যাবে। তবে মোবাইল ফোনে কথা বলা ও এসএসএস আদান-প্রদানে কোনও প্রভাব পড়বে না।

এদিকে, মোবাইল ফোনকে টুজি সেবার আওতায় আনা প্রসঙ্গে ইসি সচিব হেলালুদ্দীন আহমদ বৃহস্পতিবার রাতে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে বলেন, ‘বৈঠকে এই ধরনের পরামর্শ এসেছে। তবে কমিশন এখনও এ বিষয়ে কোনও সিদ্ধান্ত নেয়নি।’

জানা গেছে, বৈঠকে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর শীর্ষ কর্তারা বলেন, নির্বাচন সামনে রেখে ব্যাংক থেকে বিপুল অঙ্কের টাকা তোলা হচ্ছে। মোবাইল ব্যাংকিং ও কুরিয়ার সার্ভিসের (পরিবহন) মাধ্যমে বিপুল অঙ্কের টাকা লেনদেন হচ্ছে। এগুলো কী কাজে ব্যবহার হচ্ছে তার খোঁজ নেওয়া দরকার। এ ছাড়া, বৈঠকে আগামী ২০ ডিসেম্বরের পর নির্বাচনকেন্দ্রিক সহিংসতা বৃদ্ধি, জঙ্গি তৎপরতা ও নির্বাচনে রোহিঙ্গাদের ব্যবহার, ভোটকেন্দ্র থেকে সরাসরি সম্প্রচার, গণমাধ্যম নিয়ন্ত্রণ এবং দেশি-বিদেশি পর্যবেক্ষকদের নজরদারি নিয়েও বৈঠকে আলোচনা হয়।

জানা গেছে, নির্বাচনে টাকার লেনদেনের দিকে ইঙ্গিত করে বৈঠকে পুলিশের আইজি ড. মোহাম্মদ জাবেদ পাটোয়ারী বলেন, ব্যাংক থেকে প্রচুর টাকা তোলা হচ্ছে। এগুলো কোথায় যাচ্ছে, কীভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। বিভিন্ন কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে টাকা লেনদেন হচ্ছে কিনা তাও দেখতে হবে। দেখতে হবে, পরিকল্পিতভাবে গার্মেন্টস সেক্টরকে উত্তপ্ত করে দেওয়া হচ্ছে কিনা।

শঙ্কা প্রকাশ করে তিনি বলেন, নির্বাচনে কিছু জঙ্গি সংগঠন রোহিঙ্গাদের ব্যবহার করতে পারে। ভোটের মাঠেও রোহিঙ্গাদের ব্যবহার হতে পারে। এ বিষয়ে চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারের এসপিকে সতর্ক থাকার পরামর্শ দেন তিনি।

পুলিশ প্রধান বলেন, নির্বাচন বানচাল করার জন্য কয়েক হাজার ক্যাডার ঢাকায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে মুক্তিযুদ্ধবিরোধীদের। এসব সংগঠন যেন কোনও ধরনের অপতৎপরতা চালাতে না পারে, সেজন্য সতর্ক থাকতে হবে। তিনি প্রস্তাব করেন, নির্বাচনের সময় ফোরজি মোবাইল প্রযুক্তি টুজি করা যেতে পারে। এ ছাড়া, টেলিভিশনগুলো যেন সরাসরি (লাইভ) সম্প্রচার না করে, সে বিষয়েও দৃষ্টি আকর্ষণ করেন তিনি।

সশস্ত্র বাহিনীর বিভাগের প্রিন্সিপাল স্টাফ অফিসার বলেন, নির্বাচন কমিশন যে নিদের্শনা দেবে, সেই অনুযায়ী আমরা কাজ করবো। পাবর্ত্য এলাকায় ঝামেলা বিদ্যমান; সেখানকার রিটার্নিং কর্মকর্তাকে সর্তক থাকতে হবে। নির্বাচনের পরিবেশ স্বাভাবিক রাখতে ওই এলাকার জন্য হেলিকপ্টার প্রস্তুত রাখতে হবে।

বৈঠকে র‌্যাবের মহাপরিচালক বেনজির আহমেদ বলেন, ২০১৪ সালের মতো কোনও ঘটনার যাতে পুনরাবৃত্তি না হয়, সেদিকে খেয়াল রাখা হচ্ছে। তিনি বলেন, সাইবার ওয়ার্ল্ড উত্তপ্ত করে গুজব ছড়িয়ে যাতে নির্বাচনি পরিবেশ বানচাল করতে না পারে, সেদিকেও সতর্ক দৃষ্টি রাখা হচ্ছে। বিটিআরসির সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করছি। বৈঠকে তিনি ভোটের সময়ে তিন দিনের জন্য মোবাইল প্রযুক্তি ফোরজি থেকে নামিয়ে টুজিতে আনার প্রস্তাব করেন। পাশাপাশি নির্বাচনে র‌্যাব সদস্যদের ১০ দিন মাঠে রাখার প্রস্তাব দেন তিনি। আনসার মহাপরিচালকও নির্বাচনে মোবাইল নেটওয়ার্ক ফোরজি থেকে টুজিতে নামিয়ে আনার প্রস্তাব করেন। ভোটের সময়ে মিডিয়া কীভাবে নিয়ন্ত্রণ করার নীতিমালা গ্রহণ করা যায় তা ভেবে দেখা দরকার বলেও তিনি উল্লেখ করেন। তিনি জানান, ভোটের নিরাপত্তায় আনসার সদস্যদের হাতে যথেষ্ট অস্ত্র সরবরাহ করা হবে। সব সদস্যের পোশাক দেওয়া হবে।

একটি গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিনিধি বলেন, নির্বাচন সামনে রেখে মধ্যপ্রাচ্য থেকে প্রচুর টাকা আসছে। নির্বাচনে টাকার লেনদেন বন্ধে ভোটের দুই দিন আগে মোবাইল ব্যাংকিং বন্ধ রাখা দরকার।

অপর এক গোয়েন্দা সংস্থার কর্মকর্তা বলেন, ‘পরিকল্পতভাবে গার্মেন্টস সেক্টরে অস্থিতিশীলতা শুরু হয়েছে, তা যেন নির্বাচনে প্রভাব ফেলতে না পারে, সে পদক্ষেপ নিতে হবে। পাশাপাশি জঙ্গিরা যাতে মাথাচাড়া দিতে না পারে, সে বিষয়েও সতর্ক দৃষ্টি রাখতে হবে।

বৈঠকে ঢাকা রেঞ্জের একজন পুলিশ কর্মকর্তা অনেক প্রার্থীর বিরুদ্ধে মামলা ও ওয়ারেন্ট রয়েছে উল্লেখ করে তাদের বিষয়ে ইসির নির্দেশনা চান।

আরেক কর্মকর্তা ভোটকেন্দ্র থেকে সরাসরি সম্প্রচার বন্ধের প্রস্তাব দেন। একটি কেন্দ্রে কত জন সাংবাদিক একইসঙ্গে ঢুকতে পারবেন তা নির্দিষ্ট করে দিতেও ইসিকে অনুরোধ জানান।

এর পরিপ্রেক্ষিতে নির্বাচন কমিশনার রফিকুল ইসলাম বলেন, সাংবাদিকদের জন্য একটি নীতিমালা রয়েছে। ওই নীতিমালা অনুযায়ী তারা চলবেন।

বৈঠকে একটি গোয়েন্দা সংস্থার কর্মকর্তা বলেন, নির্বাচন ঘিরে সহিংসতা বাড়তে পারে। বিশেষ করে ২০ ডিসেম্বরের পর সহিংসতা আরও বাড়তে পারে। ভোটকেন্দ্রে পাহারার নামে সহিংসতা হতে পারে।

বৈঠকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, একটি রাজনৈতিক দল ও জোট পুলিশকে ব্যস্ত রেখে রাজনৈতিক ফায়দা হাসিল করতে চায়। তারা পুলিশকে ফোনে মিথ্যা ও বিভ্রান্তিকর তথ্য দিয়ে তাদের অসৎ উদ্দেশকে কাজে লাগাতে চাচ্ছে। পুলিশের কাছে ওই গোষ্ঠীর একটি ষড়যন্ত্র ও কৌশলের পরিকল্পনা হাতে এসে পৌঁছেছে; সেখানে বার বার ফোন দিয়ে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীকে ব্যস্ত রাখার কৌশলের কথা বলা আছে। তাই আমরা এখন নির্বাচনের দিকে মনোযোগ দিতে অনেকের ফোন ধরা থেকে বিরত আছি।

বৈঠকে একটি গোয়েন্দা সংস্থার কর্মকর্তা বলেন, বিভিন্ন রাজনৈতিক দল নানা সুযোগ নিয়ে নির্বাচনে বিশৃঙ্খলা তৈরি করতে পারে। এ সুযোগে জঙ্গিরা মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে পারে। ওই গোষ্ঠীটি নির্বাচনের প্রচারণা শুরুর পর তৎপর হয়ে উঠেছে। পুলিশকে ব্যস্ত রাখার কৌশলে নেমেছে। এমনকি, দফায় দফায় ফোন দিয়ে মিথ্যা ও বিভ্রান্তিমূলক তথ্য ছড়িয়ে কাজে বিঘ্ন তৈরির চক্রান্তে নেমেছে। ইতোমধ্যে তাদের ওই পরিকল্পনা ফাঁস হয়েছে; তাদের নথি আমাদের কাছে এসে পৌঁছেছে।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বাধিক পঠিত