প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

অরিত্রীর আত্মহনন কি মুছে দেবে ভিকারুননিসার নাম?

মোহাম্মদ আলী বোখারী, টরন্টো থেকে : ‘লেডি নূন’ হিসেবে সমধিক পরিচিত বেগম ভিকারুননিসা নূনের আসল নাম ভিক্টোরিয়া রিখি। তিনি ছিলেন তদানীন্তন পাকিস্তানের সপ্তম প্রধানমন্ত্রী ফিরোজ খান নূনের স্ত্রী। পেশায় ছিলেন সমাজসেবী, জন্ম তার অষ্ট্রিয়ায়, ১৯২০ সালের জুলাইয়ে। ১৯৪৫ সালে বৈবাহিকসূত্রে ইসলাম ধর্মগ্রহণ করে ওই নামের পরিবর্তনটি ঘটান। একই বছর ভারতীয় ভাইসরয়ের মন্ত্রিপরিষদ থেকে স্যার ফিরোজ ইস্তফা দিয়ে দিল্লি ত্যাগ করে বর্তমান পাকিস্তানের লাহোরে চলে যান। লেডি নূন পাকিস্তানের গোড়াপত্তনের সঙ্গে সম্পৃক্ত থেকে পাঞ্জাব প্রাদেশিক মহিলা উপকমিটির সদস্য হন এবং মুসলিম লীগের পক্ষে র‌্যালির আয়োজন করেন। এমনকি ব্রিটিশ মদদপুষ্ট ‘খিজার’ মন্ত্রিপরিষদের বিরুদ্ধে অসহযোগ আন্দোলন করে তিনবার গ্রেফতার হন।

১৯৪৭ সালের দেশবিভক্তির পর শরণার্থী পুনর্বাসনে তার ভূমিকা ছিল অপরিসীম। রেডক্রসের সঙ্গে যুক্ত থেকে ওই সামাজিক সেবার পাশাপাশি তিনি পাকিস্তানের রাওয়ালপিন্ডিতে ভিকারুননিসা মহিলা কলেজ ও বাংলাদেশের ঢাকায় বালিকাদের জন্য জনপ্রিয় ভিকারুননিসা নূন স্কুলটি প্রতিষ্ঠা করেন। তাঁর স্বামী পূর্ব পাকিস্তানের প্রথম গর্ভনর নিযুক্ত হন এবং পরবর্তীতে ১৯৫৭ সালে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হন। স্বামীর মৃত্যুর পর তিনি বিপুল উদ্যমে উল্লেখযোগ্য নারী সমাজসেবী বেগম মাহমুদা সেলিম খান, আতিয়া এনায়েতুল্লাহ ও জারি সরফরাজের সঙ্গে পাকিস্তান পরিবার পরিকল্পনা সমিতি, পাকিস্তান রেডক্রিসেন্ট সোসাইটি ও ন্যাশনাল ক্রাফ্ট কাউন্সিলসহ বহুবিধ প্রতিষ্ঠানের উন্নয়নে সবিশেষ ভূমিকা রাখেন। এছাড়াও পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট জিয়াউল হকের সময় পর্যটন ও সংস্কৃতি মন্ত্রী হন। সায়াহ্নবেলার বেশির ভাগ অসুস্থ সময়টি তার অ্যাবোটাবাদের পাহাড়ী কটেজ ‘আল-ফিরোজ’ ও ইসলামাবাদে পেইন্টিং ও লেখালেখিতে যুক্ত থেকে ২০০০ সালের ১৬ জানুয়ারি তিনি শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।

অথচ এই মহিয়সীর প্রতিষ্ঠিত ঢাকার ভিকারুননিসা স্কুলটির নাম পরিবর্তনে শিক্ষা মন্ত্রণালয় উদ্যোগী হয়েছে বলে গণমাধ্যমে প্রকাশ। ওই স্কুলের শিক্ষার্থী অরিত্রী অধিকারীর আত্মহত্যার পর গত ৯ ডিসেম্বর এক উপবৃত্তির টাকা বিতরণ অনুষ্ঠানে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের সচিব মো. সোহরাব হোসাইন সে কথা জানান। তিনি জানান, ‘আমরা অনেক অ্যাটেম্পট (পদক্ষেপ) নিয়েছি, আরও নেবো। স্কুলটির পাকিস্তান আমলের নাম পরিবর্তন নিয়েও পদক্ষেপ নেয়া হবে।’

সত্যি কি তা পাকিস্তান আমলের নাম, নাকি স্কুলটির প্রতিষ্ঠার সঙ্গে একটি ঐতিহ্যবাহী অধ্যায়েরও যুগপৎ সুনাম ও প্রসার ঘটেছে? জানা যায়, ১৯৪৭ সালে স্কুলটি রমনা প্রিপারেটরি হিসেবে গড়ে ওঠে। ১৯৫০ সালে ভিকারুননিসা নূন পরিদর্শনে এসে অভিভূত হন। ফলে তার পৃষ্টপোষকতা ও সমর্থনে সেটি বর্তমানের বেইলি রোডে স্থানান্তরিত হয় এবং নামকরণটি সেভাবেই ঘটে। দ্রুতই তা ১৯৫৬ সালে ‘হাই স্কুলে’ সম্প্রসারিত হয়। একই সঙ্গে শিক্ষার্থীদের ‘সিনিয়র ক্যামব্রিজ’ পরীক্ষার জন্য প্রস্তুত করা হয়। ১৯৭৮ সালে তা উচ্চ মাধ্যমিক পাঠ্যক্রমের ভিত্তিতে কলেজে রূপান্তরিত হয়। ২০১৬ সালের তথ্যের ভিত্তিতে প্রকাশ, বেইলি রোডের মূল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি ধানমন্ডি, আজিমপুর ও বসুন্ধরার মোট চারটি ক্যাম্পাসে মানবিক, বিজ্ঞান ও বাণিজ্য শাখায় বাংলা ও ইংরেজি মাধ্যমে প্রায় ২৪,০০০ শিক্ষার্থী সেখানে অধ্যয়নরত এবং সেজন্য ৬৫০ জন শিক্ষক নিয়োজিত। ১৯৯৪ থেকে ২০০৬ সাল অবধি পর্যায়ক্রমিক ৭ বছর ওই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটি উচ্চ মাধ্যমিকে সম্মিলিত মেধা তালিকায় প্রথম স্থান দখলের গৌরব অর্জন করেছে। এছাড়াও নেতৃত্বগুণ উন্নয়ন ও মানসম্মত শিক্ষা প্রদানের ক্ষেত্রে পেয়েছে ‘ইন্টারন্যাশনাল স্টার ফর কোয়ালিটি কনভেনশন’, সংক্ষেপে ‘আইএসএকিউ’। তবে কেন এতোটা পথপরিক্রমার পর শিক্ষা মন্ত্রণালয় প্রতিষ্ঠানটির নাম পরিবর্তন করতে চাইছে? সেটাও কী শিক্ষার মানের পর্যায়ে পড়ে, নাকি কথিত ‘পাকিস্তান আমলের নামটাই’ সর্বনাশা? সম্পাদনা : রেজাউল আহসান

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত