প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

আচাঁর আর জাল মুড়ি বিক্রি করেন মুক্তিযোদ্ধা
স্বীকৃতি আছে তবুও সহায় সম্বলহীন রবীন্দ্র চন্দ্র সাহা

খন্দকার শাহিন : নরসিংদীতে আচাঁর আর জাল মুড়ি বিক্রি করে সংসার চলে মুক্তিযুদ্ধা রবীন্দ্র চন্দ্র সাহার। মাধবদীর গরুর হাটে প্রতি সোমবার আচাঁর আর জাল মুড়ি বিক্রির পসরা সাজিয়ে বসেন তিনি। এছাড়া হাটের দিন ব্যাতিত আচাঁর আর মুড়ি বিক্রি করে মেলা কিংবা মাহফিলে। রবীন্দ্র চন্দ্র সাহা (৭০) স্বর্গীয় যোগেশ চন্দ্র সাহা ছেলে। তিনি মাধবদী পৌরসভার ফুলতলা মহল্লার স্থায়ী বাসিন্দা। দুই ছেলে এক মেয়ে ও নায় নাতিসহ ১০ সদস্যের পরিবার নিয়ে সহায় সম্বলহীন ভাবে জীবনযাপন করছেন তিনি। এই কনকনে শীতের রাতে মাধবদীতে গনেরগাঁও নামকস্থানে এক ওয়াজ মাহফিলে আমাদের প্রতিনিধি খন্দকার শাহিন এর আলাপ হয় ১৯৭১ এর এই মুক্তিযোদ্ধার সাথে।

জানতে চাওয়া হয় আপনি মুক্তিযুদ্ধে অংশে নেন কি ভাবে?
তিনি বলেন, ১৯৭১ সালে হঠাৎ জানতে পারলাম দেশের যুদ্ধ শুরু হয়েছে। বাঙ্গালীদের হত্যার জন্য পাক বাহিনী মরিয়া হয়ে উঠেছে। প্রিয় মাতভূমিকে পাক হানাদার মুক্ত করার জন্য মায়ের কোল ছেয়ে সহপাঠীদের সাথে যুদ্ধে যাওয়ার জন্য বাড়ী থেকে পালিয়ে যান তিনি। পরে পায়ে হেটে কুমিল্লার সালদা নদী বয়ে ভারতের আগরতলা গিয়ে প্রশিক্ষণ নেন। ২০/২৫ দিন প্রশিক্ষণ শেষে আগরতলায় আটকা পরেন মুক্তিযুদ্ধা রবীন্দ্র চন্দ্র সাহাসহ অনেক মুক্তিবাহিনী। প্রায় দের মাস জীবনের সাথে পাঞ্জা লড়ে সহপাঠীদের সাথে নরসিংদীতে আসেন তিনি। পরে ৭০/৮০ জনের মুক্তিবাহিনীর সাথে নরসিংদীতে পাকবাহিনীর ক্যাম্প ধ্বংস করার জন্য পাঁচদোনায় গোপন আস্তানা তেরী করেন মুক্তিবাহিনীর। এ আস্তানায় ১৭ জন করে চারটি গ্রুপ করা হয়। তার মাঝে রবীন্দ্র চন্দ্র সাহার গ্রুপের নেতৃত্ব দেন মাধবদীর মনির হোসেন ও মোতালিব পাঠান। তাদের গ্রুপ প্রতিদিনই পাঁচদোনা এলাকায় মহাসড়কে ওৎ পেথে থাকেন পাকবাহিনীর ধ্বংস করার জন্য।

১৯৭১ যুদ্ধ সম্পর্কে কিছু বলেন?
তিনি বলেন, ভারত থেকে প্রশিক্ষণ শেষে নিজের এলাকায় আশা হয় আর নরসিংদীকে ৩ নম্বর সেক্টরের অধীন করা হয়, তার কমান্ডার ছিলেন ব্রিগেডিয়ার মোঃ নূরুজ্জামান। সারাদেশে যোদ্ধ চলাকালিন নরসিংদীতে ১৯৭১ সালের এপ্রিল মাসে পাক হানাদার বাহিনী বিমান থেকে বোমা বর্ষণ করে। তাতে নরসিংদীর বিভিন্ন গ্রাম পুড়ে যায়। এ সময়ে পাক বিমান বাহিনীর গোলা বর্ষণে শহীদ হন আবদুল হক, নারায়ণ চন্দ্র সাহা, আব্দুল্লাহসহ ১২/১৩জন।

কোন যোদ্ধা অপরাধী সম্পর্কে বলেন?
তিনি আরো জানান, মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে কুখ্যাত রাজাকার আব্দুর রশীদের সহযোগিতায় ১৬ অক্টোবর পাক হানাদার বাহিনী মাধবদীর আলগী গ্রামে তারিনী বাবুর ভূইয়া বাড়িতে অতর্কিত হামলা চালিয়ে সেখানে অবস্থানরত ৬ মুক্তিযোদ্ধাকে গুলি করে ও বেয়নেটের আঘাতে নৃশংসভাবে হত্যা করে। এখানে শহীদ হন মুক্তিযোদ্ধা তাইজ উদ্দিন পাঠান, আনোয়ার হোসেন, সিরাজ মিয়া, আওলাদ হোসেন, মোহাম্মদ আলী ও আঃ সালাম।

আপনি মুক্তিযোদ্ধা হয়েও আচাঁর আর জাল মুড়ি বিক্রি করেন কেন?
তিনি বলেন, মুক্তিযুদ্ধে শহীদ হলে আজ আমার এতো কষ্ট করতে হতো না। অভাবের সংসারে ভাতার টাকায় চলে না, ছেলে পোলাদের মানুষ করতে আজ ২০ বছর ধরে এ পেশায় জড়িত। সত্তুর বছরে পা দিয়েছি তবুও দিনেও রাতে ঠুকনি কাদে নিয়ে পায়ে হেটে আচাঁর আর জাল মুড়ি বিক্রি করতে হচ্ছে। বড় ছেলেকে প্রাইমারী পর্যন্ত লেখা পড়া করাতে পারছি। মেয়েকে অষ্টম শ্রেণী ও ছোট ছেলে রতন এসএসসি পরিক্ষা দিয়েছে। বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা সরকার মুক্তিযোদ্ধাদের বিশেষ সহযোগিতার করছে। আজ আমার মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি আছে নাই সহায় সম্বল। অর্থের অভাবে সন্তানদের লাইনে নিতে পারছি না।

নরসিংদী কিভাবে হানাদার মুক্তহলো?
স্বাধীনতা যুদ্ধের দীর্ঘ ৯ মাসে নরসিংদী জেলার বিভিন্ন স্থানে শতাধিক খন্ডযুদ্ধ সংঘটিত হয়। পরে মুক্তিযোদ্ধা নেভাল সিরাজ, মনির হোসেন, আব্দুল মোতালিব পাঠানসহ অন্য মুক্তিযোদ্ধারা মাধবদীর থানার বালাপুর, আলগী ও ধর্মপুরের ক্যাম্প থেকে একযোগে পাক হানাদার বাহিনীর অবস্থান লক্ষ্য করে সাঁড়াশি অভিযান শুরু করলে তাদের সাথে ভারতীয় মিত্র বাহিনীর সৈন্যরাও যোগ দেন। ভারতীয় সেনাবাহিনীর কমান্ডার জেনারেল নাগরার নেতৃত্বে হেলিকপ্টারে মাধবদী থানার বালুশাইর এলাকায় ভারতীয় সৈন্যরা এসে অবস্থান নেন। এতে মুক্তিযোদ্ধাদের মনোবল ব্যাপক বৃদ্ধি পায়। এ অবস্থায় পাকবাহিনী বিনা যুদ্ধেই পালিয়ে যায়। মুক্তিযোদ্ধাদের তীবৃ আক্রমণের মুখে এভাবেই হানাদার বাহিনী পিছু হটতে থাকে। চুড়ান্ত পর্যায়ে ১২ ডিসেম্বর নরসিংদী পাক হানাদার মুক্ত হয়।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত