Skip to main content

`রোহিঙ্গা দুর্ভোগের অবসানে মিয়ানমারে বৌদ্ধদেরই শোধরানো জরুরি’: ড. এস জাভেদ মাজলুমি

\"\"রাশিদ রিয়াজ : সবাই বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের ‘শান্তিপ্রিয়’ মানুষ হিসেবে জানলেও মিয়ানমারে তাদের নতুন এক সংজ্ঞা লক্ষ করা যাচ্ছে বলে জানিয়েছেন ইরানি পণ্ডিত ড. এস জাভেদ মাজলুমি। তিনি বলেন, রাখাইনে রোহিঙ্গারা যেসব কারণে ভোগান্তির শিকার হচ্ছে তারমধ্যে অন্যতম কারণ এটি। রোহিঙ্গা ভোগান্তির অবসানে বৌদ্ধদের নতুন এই সংজ্ঞা সংশোধন জরুরি বলে মন্তব্য করেছেন তিনি।\\ রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে বার্তা সংস্থা ইউএনবিকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি সব কথা বলেন। মাজলুমি বলেন, ‘‘প্রত্যেকে তাদের (বৌদ্ধ) শান্তিপূর্ণ ও শান্তিপ্রিয় মানুষ হিসেবে জানে। কিন্তু আমরা মিয়ানমারে কী দেখছি, সেখানে বৌদ্ধধর্মের নতুন এক সংজ্ঞা দেখা গেল।’’ মিয়ানমারের কিছু বৌদ্ধ নেতা মুসলিমদের সম্বোধন করে যেসব শব্দ ব্যবহার করে থাকে সে বিষয়ে তিনি অসন্তোষ প্রকাশ করেন।\ \ ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের সুপ্রীম হজ্ব মিশনের সাংস্কৃতিক বিষয়ক উপপ্রধান ড. মাজলুমি জানান, ‘‘ বৌদ্ধ ভিক্ষু ও বিভিন্ন দেশের বড় বড় বুদ্ধপণ্ডিতদের সঙ্গে তিনি বহু বৈঠক করেছেন। ‘‘তাদের অধিকাংশই বিশ্বাস করেন, তাদের উচিৎ এই সমস্যা শোধরানোর।’’\ \ মিয়ানমারে চরমপন্থী মতাদর্শের বিষয়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বৌদ্ধ পণ্ডিতদের সঙ্গে মাজলুমির যেসব আলোচনা হয়েছে তা তুলে ধরে ইরানি এই পণ্ডিত বলেন, ‘‘ ঐসব বৌদ্ধ পণ্ডিতদের বিশ্বাস হল এখানে একটি গোষ্ঠী বৌদ্ধধর্মকে ভিন্নভাবে রুপান্তরিত করার চেষ্টা করছেন যা অন্যান্য দেশের সাথে মেলে না।’’\ \ কক্সবাজারে রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবির চতুর্থ বারের মতো পরিদর্শন করেছেন ড. মাজলুমি। তিনি বলেন, ‘‘আপনি যদি তাদের (রোহিঙ্গা) জিজ্ঞেস করেন, তাদের মিয়ানমারের পরিচিতি নেই কেন? তারা উত্তর দেবে, তাদের এটা ছিল কিন্তু তা কেড়ে নেয়া হয়েছে।’’\ \ আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের সংবাদ অনুযায়ী, সম্প্রতি মিয়ানমারের ধর্ম বিষয়ক ও সংস্কৃতি মন্ত্রী থুরা অং কো বলেছেন, বাংলাদেশে বসবাসরত রোহিঙ্গাদের ‘মোগজধোলাই’ করা হচ্ছে এবং বাংলাদেশ তাদের ফেরত পাঠানোর সুযোগ করে দিচ্ছে না।\ ২৭ নভেম্বর মিয়ানমারের এই মন্ত্রী নাম উল্লেখ না করে একটি ধর্মীয় গোষ্ঠীর জন্মহার সম্পর্কে কথা বলেন। দৃশ্যত তিনি মুসলিমদের ইঙ্গিত করেই কথা বলেন। তিনি বলেন, বৌদ্ধরা একবিবাহের অনুশীলন করে এবং তারা কেবল একটি অথবা দুটি সন্তান নিয়ে থাকে। কিন্তু একটি ‘চরমপন্থী ধর্ম’ তিন অথবা চারটি স্ত্রী রাখতে উৎসাহিত করে, যারা ১৫ থেকে ২০টা করে সন্তান জন্ম দেয়। রেডিও ফ্রি এশিয়াতে প্রকাশিত মন্ত্রীর এই ভিডিওটি উদ্ধৃত করে আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় সংবাদ প্রকাশিত হয়।\ মিয়ানমার বরাবরই রোহিঙ্গাদের ‘বাঙালি’ বলে সম্বোধন করে আসছে। এর দ্বারা তারা দৃশ্যত বোঝাতে চায়, তারা বাংলাদেশ থেকে এসেছে। কিন্তু রোহিঙ্গারা বলছেন, তারা মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের অধিবাসী।\ \ \"\"মুসলিম বিশ্ব রোহিঙ্গাদের জন্য যথেষ্ট করছে কিনা জানতে চাইলে ইরানি পণ্ডিত বলেন, ‘‘নিশ্চত ভাবেই নয়’’।\ \ তিনি বলেন, নিপীড়িত এসব রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর সাহায্যে এখানে কিছু বাস্তবিক কর্মসূচি হাতে নেয়া উচিত। তিনি বলেন, ‘‘বক্তব্য/বিবৃতি দেয়ায় যথেষ্ট নয়। আমরা তো কেবল কথাই বলছি।’’\ \ ড. মাজলুমি বাংলাদেশে পালিয়ে এসে আশ্রয় নেয়া ১০ লক্ষাধিক রোহিঙ্গার সহায়তায় বাংলাদেশের ভূমিকার ভূঁয়সী প্রশংসা করেন। পাশাপাশি এই বিপুল জনগোষ্ঠীর সহায়তায় বাংলাদেশের অব্যাহত উত্তম প্রচেষ্টারও তারিফ করে তিনি।\ \ রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন নিয়েও কথা বলেন ইরানের সর্বোচ্চ হজ কমিটির এই সদস্য। তিনি বলেন, রোহিঙ্গারা মনে করে দূর্ভাগ্যজনক ভাবে তাদের নিরাপদ জীবনের জন্য পরিবেশ তৈরি করা হয়নি। তাই তাদের ভালো ভাবে বুদ্ধি পরামর্শ দিতে হবে।\ ড. মাজলুমি বলেন, রোহিঙ্গারা যখন ভীতি অনুভব করে যে দেশে ফেরা মাত্রই আবারও তাদের ওপর হত্যাকাণ্ড চলতে পারে, তখন কেন তারা মিয়ানমারে ফিরে যাবে। তিনি বলেন, ‘মিয়ানমারকে রোহিঙ্গাদের নিশ্চয়তা দিতে হবে যে দেশে ফেরার পর তারা সেখানে শান্তিতে বসবাস করতে পারবে, নিরাপত্তা ও মৌলিক অধিকার ভোগ করতে পারবে।’’ড. মাজলুমি বলেন, ‘‘তারা মনে করেন এখনও পরিস্থিতি নিরাপদ হয়নি।’’\ \ মুসলমানদের ঐক্যের অভাব প্রসঙ্গে ইরানি পণ্ডিত বলেন, মুসলমানরা ভিন্ন ভিন্ন নাম ও শিরোনামে বিভক্ত। যা প্রকৃতপক্ষে গোটা বিশ্বের মুসলমানদের ভোগান্তি বৃদ্ধিতে অবদান রাখছে।‘‘আমরা বিভিন্ন গোষ্ঠী, বিভিন্ন শিরোনামে বিভক্ত। আমরা একে অপরকে সাহায্য করতে পারছি না। অধিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো- যখন আমরা একটি চ্যালেঞ্জিং পরিস্থিতিতে পড়ছি তখন প্রকৃত শত্রুদের সম্পর্কে আমরা আলোচনা করছি না। ফলে আমরা সবাই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছি’’ বলেন ড. মাজলুমি।\ \ আরেক প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, ইসলামের অনুসারীদের মাঝে ভিন্নতা থাকতেই পারে। তবে এখানে বিভাজনের কোনো স্থান নেই। এসব ভিন্নতা আমাদের বিভক্ত করতে পারে না। বিভাজন অন্যায়।’’\ \ তিনি বলেন, শত্রুরা চায় মুসলিম বিশ্ব দুর্বল হয়ে পড়ুক। তারা তাদের সর্বোচ্চ চেষ্টা চালাচ্ছে। দুর্ভাগ্যবশত মুসলিম বিশ্ব ঘুমিয়ে আছে। ‘‘আমরা তাদের (শত্রু) কর্মকাণ্ডকে অবহেলা করছি এবং একটা সময় পর আমরা দুর্বল হয়ে পড়ছি। কিন্তু ইতোমধ্যে আমাদের বিরাট ক্ষয়ক্ষতি সংঘটিত হয়েছে।’’\ \ ড. মাজলুমি জানান, কিছু মানুষ তাদের ভুল তথ্য দেয়ায় তারা ভুল নির্দেশনায় চলছে। ‘‘কিছু মানুষ আমাদের ভুল তথ্য দিয়েছে। আর আমরা এই ভুল নির্দেশনা মতোই চলছি, আমরা হীনবল হয়ে যাচ্ছি।কিন্তু ঐক্যই সবকিছুর সমাধান।’’\ \ বিগত বিভিন্ন সময় রোহিঙ্গা শিবির পরিদর্শনে গিয়ে সেখানকার যেসব পরিস্থিতি তিনি পর্যবেক্ষণ করেছেন তার তুলনা করে বলেন, ২০১৭ সালের আগস্টে সর্বশেষ রোহিঙ্গা ঢলের আগে রোহিঙ্গা শিবিরে যখন তিনি প্রথম সফরে গিয়েছিলেন তখন তাদের সংখ্যাটা মোটামুটি কম ছিল কিন্তু বর্তমানে শিবিরগুলোতে স্পষ্টতই বিপুল রোহিঙ্গার উপস্থিতি লক্ষ করা যাচ্ছে। অনেক নতুন ক্যাম্প গড়ে উঠেছে। এই বিপুল রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর জীবন-যাপনের জন্য অনেক কিছু প্রয়োজন। সঙ্গত কারণেই তারা কিছু সমস্যা তৈরি করতে পারে।\ \ তিনি বলেন, বাংলাদেশ এখন পর্যন্ত এই জনগোষ্ঠীর রক্ষণাবেক্ষণে সফল। কেননা এত বিপুল সংখ্যাক জনগোষ্ঠীর মাঝে ত্রাণ বিতরণ এতটা সহজ নয়।\ \ ইরানি এই পণ্ডিত বলেন, এই সীমিত পরিমাণ ত্রাণ সহায়তা দিয়ে রোহিঙ্গাদের সমস্যা এখন পর্যন্ত সমাধান করা সম্ভব হয়নি। যদিও আগের চেয়ে পরিস্থিতি এখন অনেক ভালো। সূত্র: ইউএনবি।