প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

কে দেখবে আলোকচিত্রীর ‘বিপুল সম্পদ’?

প্রথম আলো : টাকা-কড়ি ধনসম্পত্তি বা বাড়ি-গাড়ি রেখে যাননি সদ্যপ্রয়াত খ্যাতিমান আলোকচিত্রী আনোয়ার হোসেন। কিন্তু তাঁর মেধাসম্পদের পরিমাণ বিপুল। মানুষ দেখার সুযোগ পেয়েছে তাঁর তোলা মাত্র ১০ শতাংশ ছবি। বিচ্ছিন্নভাবে অনেকের কাছে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে তাঁর তোলা ছবির হাজার হাজার নেগেটিভ।

আলোকচিত্রশিল্পী আনোয়ার হোসেনের ধারণকৃত আলোকচিত্র, রচনা, সাক্ষাৎকারসহ যাবতীয় বুদ্ধিবৃত্তিক সম্পদ সংগ্রহ, সংরক্ষণ, প্রকাশ ও আইনগত রক্ষণাবেক্ষণে ‘আনোয়ার হোসেন ফাউন্ডেশন’ গঠনের উদ্যোগ নিয়েছে শিল্পীর পরিবার।

আজ শনিবার দুপুরে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির জাতীয় চিত্রশালা ভবনের সেমিনার কক্ষে এক সংবাদ সম্মেলনে এ-সংক্রান্ত সব তথ্য জানান আনোয়ার হোসেনের পরিবার। পরিবারের পক্ষে এ সময় উপস্থিত ছিলেন প্রয়াত আনোয়ার হোসেনের দুই ছেলে আকাশ হোসেন ও মেঘদূত হোসেন এবং ছোট ভাই আলি হোসেন বাবু। বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক লিয়াকত আলী লাকীর সভাপতিত্বে সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য দেন আনোয়ার হোসেনের বাল্যবন্ধু চলচ্চিত্র সংসদকর্মী হাশেম সূফী, ফেডারেশন অব ফিল্ম সোসাইটিজ অব বাংলাদেশের সাধারণ সম্পাদক বেলায়াত হোসেন মামুন, চলচ্চিত্রকার রাজিবুল হোসেন, আইনজীবী সুরাইয়া সুমি প্রমুখ।

শিগগির ঢাকায় আসবেন আনোয়ার হোসেনের স্ত্রী মিরিয়াম হোসেন। এদিকে আজ সন্ধ্যায় তাঁর দুই ছেলে আকাশ হোসেন ও মেঘদূত হোসেনের ঢাকা ছাড়ার কথা। একাডেমিক পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার জন্য মা আসার আগেই ঢাকা ছাড়ছেন তাঁরা। সংবাদ সম্মেলনে আকাশ জানান, বিভিন্ন মানুষের কাছে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা তাঁর বাবার কাজগুলো ফাউন্ডেশনের হাতে তুলে দিলে কৃতজ্ঞ থাকবে তাঁর পরিবার। তিনি বলেন, ‘বাবার ফিল্ম নেগেটিভ, লেখা বই বা রচনা, ডিজিটাল আলোকচিত্র যা-ই সংরক্ষিত থাকুক, তা আমাদের ফাউন্ডেশনের কাছে হস্তান্তর করুন। আপনারা জানেন বাবা একজন শিল্পী ছিলেন, তিনি খুব গোছানো মানুষ ছিলেন না। ফলে তাঁর সৃষ্টিকর্মগুলো ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে। সেগুলো একত্র করা এবং সুষ্ঠুভাবে সংরক্ষণের জন্য আপনাদের সবার সহযোগিতা চাই। আপনারা আমাদের আনোয়ার হোসেন ফাউন্ডেশনকে সহযোগিতা করুন। আনোয়ার হোসেনের সৃষ্টিকর্মগুলো রক্ষার এই কাজে আমাদের পাশে থাকুন।’
আনোয়ার হোসেন, আকাশ হোসেন ও মেঘদূত হোসেন
আনোয়ার হোসেন, আকাশ হোসেন ও মেঘদূত হোসেন
হাশেম সূফী বলেন, ‘আনোয়ার হোসেন বাংলাদেশের একজন মহান শিল্পী ছিলেন। তাঁর সব কাজ আমাদের রক্ষা করতে হবে। এটা আমাদের নৈতিক ও জাতীয় দায়িত্ব। যে ফাউন্ডেশনটি আজ গঠিত হতে যাচ্ছে, তা অবশ্যই খুব জরুরি উদ্যোগ। এই ফাউন্ডেশনের আপাতত প্রধান কাজ হবে আনোয়ার হোসেনের বিগত ৫০ বছরের আলোকচিত্র, লেখা, তাঁর প্রকাশিত বই, তাঁর সাক্ষাৎকার উদ্ধার ও সংরক্ষণ করা। এসব খুব দ্রুত করতে হবে। কেবল শৈল্পিক কারণেই এসব সংরক্ষণ করতে হবে, তা নয়। আনোয়ার হোসেন আমাদের জাতির ইতিহাসের উপাদান রেখে গেছেন তাঁর আলোকচিত্রে। এসব যদি হারিয়ে যায়, তাহলে আমাদের জাতির ইতিহাস হারিয়ে যাবে। তাই অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে অতি দ্রুত রাষ্ট্রীয়ভাবে এসব উদ্ধার করা উচিত বলে আমি মনে করি।’

আনোয়ার হোসেন ফাউন্ডেশনের ট্রাস্টি ও প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন শিল্পীর ছোট ভাই আলি হোসেন বাবু। তিনি বলেন, আগামী প্রজন্ম যাতে আনোয়ার হোসেনকে মনে রাখে সেই লক্ষ্যে কাজ করে যাবে আনোয়ার হোসেন ফাউন্ডেশন। সভাপতির বক্তব্যে লিয়াকত আলী লাকী বলেন, ‘আমরা অনেককেই হারাই, কিন্তু আনোয়ার হোসেনকে হারানোটা অন্য রকম। আর কদিন পরই তাঁর ৫০ বছরের আলোকচিত্র ও ৪০ বছরের চলচ্চিত্র জীবনের পৃথক প্রদর্শনী ও চলচ্চিত্র উৎসব করার কথা। প্রায় দেড় বছর ধরে এই পরিকল্পনা এগিয়েছে। এখন যখন এই উৎসব আয়োজনের সময় হয়েছে, তখন তাঁকে আমরা এভাবে হারাব তা আমাদের কল্পনাতেও ছিল না। তিনি আমাদের মধ্যে থাকলে কাজটি আরও গুছিয়ে করা যেত। তিনি বাংলাদেশের আলোকচিত্রকে বিশ্বমানে পৌঁছে দিতে জীবন উৎসর্গ করেছেন, নানা ভাবে মহিমান্বিত করেছেন আমাদের দেশকে। তাঁর নামে ফাউন্ডেশন গঠনে দেশ ও জাতির সহযোগিতা চাই।’

সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, এখন থেকে আনোয়ার হোসেনের কোনো ছবি ব্যবহারের ক্ষেত্রে ফাউন্ডেশনের অনুমতি নিতে হবে। ক্ষেত্রবিশেষে তাঁর ছবি ব্যবহারের জন্য রয়্যালটি দিতে হবে। বেলায়াত হোসেন জানান, আলোকচিত্রী আনোয়ার হোসেন পরিবারের জন্য তেমন কিছুই রেখে যেতে পারেননি। তাঁর সন্তানেরা পড়ালেখা করছেন। তাঁর আলোক চিত্রকর্ম থেকে রয়্যালটি পেলে তাঁর পরিবার বিশেষভাবে উপকৃত হবে। আর এ ব্যবস্থার মাধ্যমে বাংলাদেশে কারও আলোকচিত্র ব্যবহারের জন্য রয়্যালটির চর্চা শুরু হওয়া দরকার। আনোয়ার হোসেন ফাউন্ডেশনের ট্রাস্টি হিসেবে থাকবেন আনোয়ার হোসেনের স্ত্রী মিরিয়াম হোসেন, ছেলে আকাশ হোসেন ও মেঘদূত হোসেন, ভাই আলি হোসেন বাবু, চলচ্চিত্রকার মোরশেদুল ইসলাম, নাট্যজন লিয়াকত আলী লাকী, চলচ্চিত্রকার বেলায়াত হোসেন মামুন, রাশেদ জামান, রাজিবুল হোসেন প্রমুখ।

গত শনিবার রাজধানীর শেরেবাংলা নগর থানাধীন হোটেল ওলিও ইন্টারন্যাশনাল থেকে আলোকচিত্রী আনোয়ার হোসেনের লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। বাংলাদেশে একটি আলোকচিত্রী প্রতিযোগিতার বিচারক হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে ফ্রান্স থেকে এসে ২৮ নভেম্বর তিনি ওই হোটেলে উঠেছিলেন।

আনোয়ার হোসেনের জন্ম বাংলাদেশে। তিনি ফ্রান্সের নাগরিক ছিলেন এবং পরিবার নিয়ে প্যারিসে স্থায়ীভাবে বসবাস করতেন। তাঁর জন্ম ১৯৪৮ সালের ৬ অক্টোবর, পুরান ঢাকার আগা নবাব দেউড়িতে। তিনি বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক মানের একজন আলোকচিত্রী ও সিনেমাটোগ্রাফার। বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে অবদানের জন্য বেশ কয়েকবার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার লাভ করেন আনোয়ার হোসেন।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বাধিক পঠিত