প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

হুমায়ূন আহমেদের অসমাপ্ত রচনা ‘নবীজি’ (পর্ব-৩)

হুমায়ূন আহমেদ : (পূর্বে প্রকাশের পর) ‘তোরা দেখে যা আমিনা মায়ের কোলে’ বিখ্যাত এই গানের কলি শুনলেই অতি আনন্দময় একটি ছবি ভেসে ওঠে। মা মুগ্ধ চোখে নবজাতক শিশুর মুখের দিকে তাকিয়ে আছেন। উনার কোলে পূর্ণিমার স্নিগ্ধ চাঁদ। উনার চোখ-মুখ আনন্দে ঝলমল করছে।

ঘটনা কি সে রকম?
সে রকম হওয়ার কথা না। শিশুটির বাবা নেই। বাবা আবদুল্লাহ সন্তানের মুখ দেখে যেতে পারেননি। মা আমিনার হৃদয় সেই দুঃখেই কাতর হয়ে থাকার কথা।
আরবের শুষ্ক কঠিন ভূমিতে পিতৃহীন একটি ছেলের বড় হয়ে ওঠার কঠিন সময়ের কথা মনে করে উনার শঙ্কিত থাকার কথা। শিশুর জন্মলগ্নে মা আমিনার দুঃখ-কষ্ট যে মানুষটি হঠাৎ দূর করে দিলেন, তিনি ছেলের দাদাজান।

আবদুল মোতালেব। তিনি ছেলেকে দু’হাতে তুলে নিলেন। ছুটে গেলেন কা’বা শরিফের দিকে। কা’বার সামনে শিশুটিকে দু’হাতে উপরে তুলে উচ্চকণ্ঠে বললেন, আমি এই নবজাতক শিশুর নাম রাখলাম, “মুহম্মদ!” সবাই মুখ চাওয়া-চাওয়ি করলেন। নতুন ধরনের নাম। আরবে এই নাম রাখা হয় না। একজন বলল, এই নাম কেন? উত্তরে আবদুল মোতালেব বললেন, মুহম্মদ শব্দের অর্থ প্রশংসিত। আমি মনের যে বাসনায় নাম রেখেছি তা হলো- একদিন এই সম্মানিত শিশু জান্নাত ও পৃথিবী দুই জায়গাতেই প্রশংসিত হবেন।

শিশুর জন্ম উপলক্ষে (জন্মের সপ্তম দিনে) দাদা আব্দুল মোতালেব বিশাল ভোজের আয়োজন করলেন। শিশুর চাচারাও আনন্দিত। এক চাচা আবু লাহাব তো আনন্দের আতিশয্যে একজন ক্রীতদাসীকে আজাদ করে দিলেন। ক্রীতদাসীর নাম সুয়াইবা।

সে-ই প্রথম আবু লাহাবের কাছে শিশু মুহম্মদ সা. খবর পৌঁছে দিয়েছিল। এই সুয়াইবাই এক সপ্তাহ উনার বুকের দুধ পান করিয়েছিলেন। নবীজি সা. উনার দ্বিতীয় ও তৃতীয় কন্যা রুকাইয়া ও কুলসুমকে বিয়ে দিয়েছিলেন আবু লাহাবের দুই পুত্রের সঙ্গে। একজনের নাম উৎবা, অন্যজনের নাম উতাইবা। দুই বোনকে একসঙ্গে না। রুকাইয়া প্রথমে। রুকাইয়ার মৃত্যুর পর কুলসুমকে।

যদিও পরবর্তী সময়ে আবু লাহাবের নামে পবিত্র কুরআন শরীফে আয়াত শরীফ নাজিল হয়েছেঃ-

(১) আবূ লাহাবের দু’ হাত ধ্বংস হলো এবং সে নিজেও ধ্বংস হলো।
(২) কোন কাজে আসবে না বা কোন ফায়দা দিবে না তার আল-আওলাদ, মাল-সম্পদ যা কিছু সে উপার্জন করেছে।
(৩) অচিরেই বা অতিশীঘ্রই সে শিখাবিশিষ্ট আগুনে প্রবেশ করবে।
(৪) এবং তার স্ত্রীও যে কাঠ বা লাকড়ি বহনকারিনী।
(৫) তার গলায় রশি থাকবে যা খেজুর গাছের ছাল বা বাকলের দ্বারা তৈরি। (সূরা লাহাব )

শিশু “মুহম্মদ” ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার জন্ম তারিখটা কী?
যাকেই জিজ্ঞেস করা হোক সে বলবে- ৫৭০ খ্রিষ্টাব্দ। বারোই রবিউল আওয়াল। দিনটা ছিল সোমবার। সারা পৃথিবী জুড়ে এই দিনটিই জন্মদিন হিসেবে পালন করা হয়। ঈদে মিলাদুন্নবীতে বাংলাদেশে সরকারি ছুটি পালন করা হয়।

নবীজির জন্মের সঠিক তারিখ নিয়ে কিন্তু ভালো জটিলতা আছে। ইতিহাসবিদরা মোটামুটি সবাই একমত যে উনার জন্ম হয়েছে হস্তিবর্ষে (Year of the Elephant, ৫৭০)। নবীজী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আদি জীবনীকারদের একজন ইবনে আব্বাস রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু তিনি বলছেন, উনার(ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) জন্ম হস্তি দিবসে (Day of the Elephant)।

একদল ইতিহাসবিদ বলছেন মোটেই এরকম না। নবীজি ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম জন্মেছেন এর পনেরো বছর আগে। আবার একদল বলেন, নবীজি ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম’র জন্ম হস্তি বছরের অনেক পরে, প্রায় সত্তুর বছর পরে।

জন্ম মাস নিয়েও সমস্যা। বেশির ভাগ ইতিহাসবিদ বলছেন চন্দ্রবৎসরের তৃতীয় মাসে উনার জন্ম। তারপরেও একদল বলছেন, উনার জন্ম মোহররম মাসে। আরেকদল বলছেন, মোটেই না। উনার জন্ম সাফার মাসে। জন্ম তারিখ নিয়েও সমস্যা। একদল বলছেন রবিউল আউয়ালের ৩ তারিখ, একদল বলছেন ৯ তারিখ, আবার আরেক দল ১২ তারিখ।

এখন বেশির ভাগ মানুষই নবীজীর আদি জীবনীকারের বক্তব্যকে সমর্থন করছেন। ১২ই রবিউল আউয়াল সোমবার জন্ম তারিখ ধরা হচ্ছে। তারপরও কথা থেকে যাচ্ছে- ১২ই রবিউল আউয়াল কিন্তু সোমবার না। এই হিসাব আধুনিক পঞ্জিকার। বিতর্ক বিতর্কের মতো থাকুক। একজন মহাপুরুষ জন্মেছেন, যাঁর পেছনে একদিন পৃথিবীর বিরাট এক জনগোষ্ঠী দাঁড়াবে- এটাই মূল কথা।

চলবে…

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত