Skip to main content

ভারতের মিডিয়া পাকিস্তানি নিপীড়নের বিরুদ্ধে সরব হয়ে উঠে

প্রিয়াংকা আচার্য্য : বাংলা আবৃত্তিজগতের নক্ষত্রজুটি গৌরি ঘোষ ও পার্থ ঘোষ। ২০১৩ সালে এ দম্পতিকে মুক্তিযুদ্ধে অবদানের জন্য ‘মুক্তিযুদ্ধ মৈত্রী সম্মাননা’ প্রদান করা হয়। ২০১৬ সালের ১২ জুন পশ্চিমবঙ্গে তাদের দমদমের বাসায় গেলে গৌরি ঘোষ অসুস্থ থাকায় শুধু পার্থ ঘোষের সঙ্গে কথা হয়। মুক্তিযুদ্ধের সময় আকাশবাণী কলকাতা রেডিওতে ছিলেন ব্রডকাস্টার হিসেবে। ৭১ সালের বাংলাকে দেখলাম তার চোখ দিয়েই। সত্তরের দশকটা এপাড়-ওপাড় দুই বাংলার জন্যই বেশ তাৎপর্যপূর্ণ। দুদিকেই খুব উত্তাল সময় গেছে। দেশ বিভাগের পর থেকেই পূর্ব-পশ্চিম পাকিস্তানের আন্তঃবৈষম্য তীব্র আকার ধারণ করে। প্রখ্যাত চিত্রশিল্পী জয়নাল আবেদীনের আঁকা একটা ছবি এখনও আমার চোখে ভাসে। একটা গরু খড়-বিচুলী খাচ্ছে আর তার দুধ দোয়ানো হচ্ছে। মুখটা পূর্ব পাকিস্তানে আর দুধ দোয়ানো হচ্ছে পশ্চিম পাকিস্তানে। অর্থাৎ পূর্ব পাকিস্তান খাদ্য সংগ্রহ করছে আর পশ্চিম পাকিস্তান তা বসে বসে খাচ্ছে। শুধু তাই নয় পশ্চিম পাকিস্তান বাঙালিদের ভাষা কেড়ে নিতে চেয়েছে। রবীন্দ্রনাথ, অতুলপ্রসাদ, নজরুলের গান বন্ধ করে উর্দুভাষার গান বাঙালির উপর চাপিয়ে দিতে চেয়েছে। সেইসব অন্যায়ের চরম মুহূর্তে পূর্ব পাকিস্তানের মাথা ফুড়ে একটা পাহাড় উঠলো, তার নাম শেখ মুজিবুর রহমান। তিনি প্রতিবাদের স্বর শোনালেন। রুখে দাঁড়ানোর জন্য গোটা জাতিকে একত্রিত করলেন। বাঙালিকে মানতে হবে, বাঙলা ভাষাকে মানতে হবে। কারণ বাংলা ভাষাতেই আমাদের ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও গর্ব লুকিয়ে আছে। ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানী সেনাবাহিনী পরিকল্পিতভাবে বাঙালি নিধন শুরু করে। হিন্দু বা মুসলিম নয়, ধনী বা গরীব নয় পূর্ব পাকিস্তান জুড়ে বাংলা ভাষায় কথা বলা নিরীহ সাধারণ মানুষদের নির্বিচারে হত্যা করা হয়। প্রতিবাদে বাঙালিরাও লড়াইয়ে নামলো। শুরু হলো মুক্তিযুদ্ধ। ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী যুদ্ধে সর্বাত্ত সহায়তা করেন। তিনি বলিষ্ঠভাবে শেখ মুজিবুর রহমানের সরকারের পাশে ছিলেন গোটা সময়। এদিকে আমাদের পশ্চিমবঙ্গেও একটা রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক পরির্তন চলছে। বামপন্থী আন্দোলন শুরু হয়েছে। বামপন্থী আন্দোলনকারীরা সমর্থন করে মুক্তিযুদ্ধে। ভারতের সকল মিডিয়াগুলো পশ্চিম পাকিস্তানীদের নিপীড়নের বিরুদ্ধে সরব হয়ে উঠে। এরইমধ্যে পার্কস্ট্রিটের একটা বাড়িতে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র গড়ে উঠে। আমাদের শপথ করানো হয়েছিল যে বাইরের কাউকে স্বাধীন বাংলা বেতারের বিষয়ে কোনো তথ্য দিবো না। স্বাধীন বাংলা বেতারের অন্যতম পুরোধা ছিলেন বেলাল মোহাম্মদ। পূর্ব পাকিস্তানে তাকে ৩ বার হত্যার চেষ্টা করা হয়। তার বাড়িতে বোম ফেলা হয়েছিল। সেখান থেকে পালিয়ে তিনি পশ্চিমবঙ্গে আসেন। দীর্ঘদিন ছিলেন আমার বাড়িতে। তার মতো উদারপন্থী ব্যক্তি আমি কম দেখেছি। বাসার প্রত্যেকে তাকে দেবতার মতো শ্রদ্ধা করতো। আমরা রাতে পাশাপাশি ঘুমাতাম। গল্প করতাম। পূর্ব পাকিস্তানে হওয়া অত্যাচার-নির্যাতন নিয়ে বেলাল ভাই আমাকে বুঝিয়ে বলতেন। এক রাতে আকাশবাণী স্টুডিওর ভেতর কন্টিনিউটি বুথে ডিউটি করছি। আনুমানিক দেড়টা একটু আগে খেয়াল করলাম ভারতীয় মিলিটারিরা সেটি দখল করেছে। কিছু বুঝে ওঠার আগেই নির্দেশ এলো যা বলছি করে যান। আমাকে বলা হলো, সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়ের একটা গান কোনো ঘোষণা ছাড়া তারা ইশারা করা মাত্র প্লে করতে। তখন রেডিওতে গান পরিবেশনের আগে শিল্পী ও গানের পরিচয় দেয়া হতো। আমরা হতভম্ব হয়ে কিউ রেডি করে বসে আছি, আমাদের চারপাশে মিলিটারি অফিসাররা। একজন ঘড়ি হাতে দাঁড়িয়ে ইশারা করা মাত্র আমরা সেই গানটি প্লে করলাম। সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়ের দুটো গান পর পর প্লে করার পর বন্ধ করতে বলা হলো। আমরা স্টুডিও থেকে বেড়িয়ে সেখানে দায়িত্বরত মিলিটারি অফিসার ইন্দ্রজিৎ সিংকে ভেতরের ঘটনাটি বুঝিয়ে দিতে অনুরোধ করলাম। তিনি বললেন, ‘ভারতীয় মিলিটারীরা বাংলাদেশের আনাচে কানাচে ছড়িয়ে গেছে। তারা রেডিও মনিটর করছে। সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়ের এ গান শোনামাত্র তারা আক্রমণ শুরু করবে’। আমরা যুদ্ধের এমন কৌশল শুনে রীতিমতো স্তম্ভিত হয়ে গেলাম। এরপর থেকে প্রতিদিন খবর আসতে লাগলো পাকিস্তান মিলিটারি ও তাদের স্থানীয় দোসররা দিন দিন পিছু হটছে। একদিন আমার বন্ধু উপেন তরফদারসহ দুজনে রেডিওর জন্য সাক্ষাৎকার নিতে সীমান্তে গেলাম। ওপার থেকে অবিরাম গুলিবর্ষণ হওয়ায় আমরা বেশিদূর এগুতে পারিনি। আমরা সাধারণ মানুষের প্রতিক্রিয়া সংগ্রহ করলাম। দেখলাম একটা আদর্শের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ গড়ে উঠছে। সকলের উদ্দীপনা-উন্মাদনার বিরাট শপথে বাঙালিরা প্রচ- শক্তিতে এক হয়ে গর্র্জে উঠেছিল। তারপর সেই কাক্সিক্ষত দিন এলো। পশ্চিম পাকিস্তান মাথা নত করে বাংলার ভূমি ছেড়ে যেতে বাধ্য হলো। ১৬ ডিসেম্বর বিজয়ের দিন এলো। আজ বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের গভীর ভালো সম্পর্ক। শেখ হাসিনার সঙ্গে তীব্র ভালোবাসার সম্পর্ক।