প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

যখন আমি এক প্রাক্তন ভিকি এবং একজন মা

তাসমিয়া আহমেদ : ১৯৯৫ সালে আমি ভিকারুননিসা নুন স্কুল অ্যান্ড কলেজে প্রথম শ্রেণিতে ভর্তি হই। ভর্তির আগে আমাকে একটা ভর্তি পরীক্ষায় বসতে হয়েছিলো। যতদূর মনে পড়ে, সেখানে দশ হাজারের মত মেয়ে পরীক্ষায় অংশ নিয়েছিলো। তাদের মধ্যে থেকে মাত্র ৫০০ জন ভর্তির জন্য নির্বাচিত হয়েছিলো। এই প্রতিযোগিতাটি আসলে কেমন ছিলো, তা সাড়ে ছয় বছর বয়সের একজন মেয়ে হিসাবে আমার বোঝার কথা নয়। আমি বুঝিওনি। তবে ভর্তিযুদ্ধে ভালো করেছিলাম এবং ভিকারুননিসায় ভর্তি হতেও পেরেছিলাম। বাবা-মা আমাকে বলেছিলেন, যদি আমি এই স্কুলে ভর্তি হই তাহলে কিছু ভালো বন্ধু পাবো। এই বিষয়টি আমাকে বেশি টেনেছিলো। এছাড়া তারা বলেছিলেন এই স্কুলের শিক্ষকরা ভালো এবং এই স্কুলে ভর্তি হলে আমি এদেশের একজন সেরা ছাত্রী হতে পারবো। যদিও এসবের কিছুই আমি বুঝিনি। তারপরও ওই বয়সে আমি অনেক ভালো করে পড়াশুনা করেছিলাম। আর এর একমাত্র কারণ ছিলো ওই সময়ে আমি বাবা-মা ও পরিবারের অন্য সদস্যদের বিশেষ মনোযোগ পাচ্ছিলাম। ফলে বাবা-মা ওই ৫/৬ বছর বয়সেই আমার মনে ভালো করে পড়াশুনা করার একটা ইচ্ছে ঢুকিয়ে দিতে পেরেছিলেন।

আজ যে আমি এ পর্যন্ত আসতে পেরেছি, তার পিছনে আমার বাবা-মা শিক্ষক ও যারা আমাকে উৎসাহ দিয়েছেন তাদের অবদান সবচে’ বেশি। এজন্য তাদের কাছে আমি কৃতজ্ঞ। কিন্তু তারপরও আমার মনে একটা দুঃখবোধ রয়েই গেছে। আর তা হলো, পড়াশুনার চাপে আমি আমার শৈশব ও বাল্যকালকে উপভোগ করতে পারিনি। ঐ বয়সে যখন আমার খেলাধূলা করার কথা, যখন আমার ভাই ও চাচাতো-ফুফাতো ভাইবোনদের সাথে গান গেয়ে বেড়ানোর কথা, সেই সময়ে আমি আমার বাবা-মা ও শিক্ষকের সামনে নিজেকে ভালো ছাত্রী হিসেবে প্রমাণের চেষ্টা করে গেছি।

কেন এই পদ্ধতিকে এরকম হতে হবে? অরিত্রী যে কিনা ভিকারুননিসায় ভর্তিযুদ্ধে তৃতীয় স্থান অর্জন করেছিলো, যে কিনা সাতটি ভাষা জানে, সে কি পরীক্ষায় হলে নকল করার জন্য মোবাইল ফোন নিয়ে যাবে? ভিকারুননিসা আমাকে অনেক কিছু শিখিয়েছে ঠিকই, কিন্তু এই স্কুলে পড়ার কারণেই আমি আমার বাল্যকাল হারিয়েছি। আমি আরও অন্য ভাবে বড় হতে পারতাম। আমি স্কুলে আরো চাপমুক্ত থাকতে পারতাম। কিন্তু তা হয়নি।

আমি নিজেকে পাঁচ সন্তানের মা বলে দাবি করি। যদিও এর মধ্যে শুধু দু’জনকেই আমার গর্ভে ধারণ করেছি। এই প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে আমার সন্তানরাও তাদের বাল্যকাল ধ্বংস করুক, তা আমি চাই না। তাদেরকে স্বাধীনভাবে চিন্তা করতে দেয়া উচিত। এই অসুস্থ প্রতিযোগিতা থেকে দূরে রেখে, তাদের কাছে পড়াশুনাকে আরো আনন্দদায়ক করে তোলা উচিত। সত্যি, আমার এটাই ইচ্ছা। আমি জানি, আমি তা পারবো।

লেখক : দৈনিক আওয়ার টাইমের নির্বাহী সম্পাদক। সম্পাদনা : সালেহ্ বিপ্লব

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ