প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

জিয়া পরিবার নেই বিএনপি থাকবে

বিভুরঞ্জন সরকার : আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির থাকা, না-থাকা নিয়ে যখন বিভিন্ন মহলে জল্পনা-কল্পনা চলছে, তখন দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, ‘শত বাধা-প্রতিকূলতা, গ্রেপ্তার-নির্যাতন উপেক্ষা করে আগামী নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে আমরা দৃঢ়প্রতিজ্ঞ’। তিনি আরও বলেছেন, ‘গণতান্ত্রিক সরকার প্রতিষ্ঠা করে আমরা বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া ও জনগণকে মুক্ত করতে চাই। এ দেশের মানুষ বারবার লড়াই করে তাদের অধিকার ফিরিয়ে এনেছে। এবারও তারা জয়ী হবেই’।

বিএনপি মহাসচিবের এই দৃঢ় উচ্চারণের পর বিএনপির নির্বাচনে থাকা নিয়ে সন্দেহ-সংশয়ের নিরসন হওয়ার কথা। কিন্তু এই সন্দেহ শেষ পর্যন্ত থাকবে বলেই মনে হয়। বিএনপি একদিকে বলছে, তারা শেষ পর্যন্ত নির্বাচনে থাকবে আবার অন্যদিকে নিজেরাই নির্বাচন নিয়ে নেতিবাচক কথাবার্তাও বলছে। নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী তালিকা চূড়ান্ত হয়নি। কয়টি আসন মিত্রদের মধ্য ছেড়ে দেওয়া হবে তা-ও ঠিক হয়নি। ফলে নির্বাচনের মাঠে এখন একতরফা প্রচারণা চালাচ্ছে আওয়ামী লীগ। বিএনপি কোথাও মাঠে নেই। জাতীয় ঐক্যফ্রন্টে বিএনপি ছাড়া আর যারা আছে, তাদের মাঠ খুব একটা নেই। বিএনপির পাকা ধানে মই দেওয়া কিংবা ভাগ বসানোর জন্য তারা তৎপর। তবে তাদের এই তৎপরতাও খুব দৃশ্যমান নয়।

আওয়ামী লীগ প্রার্থীরা নির্বাচনের মাঠে সক্রিয়। তারা এলাকায় গিয়ে জনসংযোগ করছেন। আনুষ্ঠানিকভাবে নির্বাচনী প্রচারণা শুরু না হলেও তারা অনানুষ্ঠানিকভাবে প্রচারণা চালাচ্ছেন। মানুষ জানে তার নির্বাচনী এলাকায় নৌকার প্রার্থীর নাম। কিন্তু জানে না ধানের শীষের প্রার্থী কে? বিএনপি নেতারা শুধু বিভিন্ন বিষয়ে অভিযোগ করছেন। অনেক অভিযোগই ঢালাও, সুনির্দিষ্ট তথ্য-প্রমাণহীন। মনোনয়নপত্র বাতিল হওয়ার বিষয় নিয়ে যেভাবে হৈচৈ করা হচ্ছে, তা কতোটুকু তথ্য নির্ভর, আর কতোটা অনুমান-নির্ভর সে প্রশ্ন আছে। মনোনয়নপত্র কি এবারই প্রথম বাতিল হলো ? ২০০৮ সালের নির্বাচন কমিশন তো সবার আস্থাভাজন ছিলো, তখন কি কয়েকশ প্রার্থীর মনোনয়ন বাতিল হয়নি? বলা হচ্ছে, বেছে বেছে বিএনপির জনপ্রিয় এবং জয়ী হওয়ার মতো প্রার্থীদের মনোনয়ন বাতিল করা হয়েছে।

সত্যি কি তাই? বিএনপির হেভিওয়েট অনেক প্রার্থী যেমন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, মওদুদ আহমেদ, ড. খোন্দকার মোশাররফ হোসেন, মির্জা আব্বাসসহ আরো অনেকের প্রার্থিতাই তো বহাল আছে। তারা কি জনপ্রিয়? ঋণ খেলাপি, বিল খেলাপি এবং দন্ডিতদের প্রার্থিতা বাতিল তো স্বাভাবিক। যারা ভুল তথ্য দিয়েছেন, মনোনয়নপত্রে স্বাক্ষর দিতে ভুলে গেছেন, তাদের মনোনয়নপত্র বাতিল হওয়া কি উচিত নয়? মনোনয়নপত্র পূরণ এবং জমাদানেই যারা উদাসীন তাদের নির্বাচনে যোগ্য বিবেচনা করতে হবে কেন? বলা হচ্ছে, যারা বড় বড় ঋণ খেলাপি তাদের মনোনয়ন বাতিল হয়নি। অথচ সাড়ে পাঁচ হাজার টাকার জন্য বাতিল হয়েছে। এখানে প্রশ্ন হলো, আইনে কি বলা আছে কতো টাকা খেলাপি হলে সেটা বড় ত্রুটি আর কতো হলে ছোট ত্রুটি? আওয়ামী লীগের কোনো খেলাপি এবং দন্ডিত ব্যক্তির মনোনয়ন যদি অন্যায় বা নিয়ম ভেঙ্গে বহাল রাখা হয়ে থাকে তাহলে তো প্রকৃত তথ্য দিয়ে উচ্চ আদালতেও যাওয়ার সুযোগ আছে। আদালত যে ‘অন্ধ’ নয়, তার প্রমাণ রংপুরে একজন জামায়াত নেতার মনোনয়নপত্র জমা নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট।

আমাদের দেশে সরকারের সমালোচনা করা কারো কারো কাছে একটি পছন্দের ফ্যাশন। নির্বাচন সামনে রেখে অনেকেই সেই ফ্যাশন চর্চায় নেমেছেন। দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন না করার জেদ ধরেও সেটা রাখতে পারেনি বিএনপি। বর্তমান নির্বাচন কমিশনের প্রতি আস্থা নেই বিএনপির। তারপরও তারা কেন নির্বাচনে এলো? বিএনপির সঙ্গে কেমন আচরণ করা হবে, তারা নির্বাচনী প্রচারে সমান সুযোগ পাবে কিনা এগুলো কি বিএনপি আগে বুঝতে পারেনি? পেরেছিলো। বিএনপিকে জেনেশুনেই বিষ পান করতে হয়েছে। অনেকের সঙ্গে ব্যক্তিগতভাবে আমিও মনে করি যে, বিএনপি এবার নির্বাচনে জেতার জন্য অংশ নিচ্ছে না। তাদের উদ্দেশ্য ত্রিবিধ। তারা দলীয় সরকারের অধীনে সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব নয়, সেটা প্রমাণ করতে চায়। নির্বাচন কমিশনকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে চায় এবং সর্বোপরি তারা পুরো নির্বাচনটিকেই বিতর্কিত করতে চায়।

সেজন্য ভোটের মাত্র তিন সপ্তাহ আগেও তারা নির্বাচনী প্রচারণায় নয়, সময় ব্যয় করছে সরকারের বিরুদ্ধে অভিযোগনামা তৈরিতে। বিএনপি জয় চায় না, চায় বিতর্ক। সেজন্যই তারা নামকাওয়াস্তে হলেও নির্বাচনে থাকবে। নির্বাচনের ফলাফল কী হবে সেটা বিএনপির নীতিনির্ধারকদের অজানা নয়।

বিএনপি নির্বাচন করছে, কিন্তু নির্বাচনে নেই জিয়া বা খালেদা জিয়ার পরিবারের কেউ। দীর্ঘদিন পরে জিয়া পরিবারহীন একটি সংসদ নির্বাচন হতে যাচ্ছে। এটা আমি মনে করি, একটি উল্লেখযোগ্য বিষয়। কিন্তু এটা তেমন আলোচনায় কেন নেই, সেটাও আমার কাছে একটি বড় প্রশ্ন। জিয়া পরিবারহীন নির্বাচনের মধ্য দিয়ে আমি অন্তত দেশের রাজনীতিতে একটি পরিবারতন্ত্রের বিদায় ঘন্টা বাজতে শুনছি। নির্বাচনে বিএনপি ক্ষমতায় যেতে না পারলেও, তারা যে একটি বড় শক্তি নিয়ে সংসদে বিরোধী দল হিসেবে আবির্ভূত হবে তাতে কোনো সন্দেহ নেই। সে ক্ষেত্রে বিএনপির সংসদীয় দলের নেতা হবেন বিএনপি পরিবারের বাইরের কেউ।

এরই ধারাবাহিকতায় বিএনপি নেতৃত্বও যদি জিয়া পরিবারমুক্ত হয় তাহলে রাজনীতিতে যে গুণগত পরিবর্তনের প্রত্যাশা আমাদের অনেকের, সেটা অর্জনের পথ কিছুটা উন্মুক্ত হতে পারে বলে আমার কেন যে মনে হচ্ছে। বিএনপিকে ক্ষমতায় আসতে হলে তাদের অতীত রাজনীতির অনেক গোঁজামিল দূর করতে হবে। বিএনপি নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সে দিকে যায় কিনা, দেখা যাক।

লেখক : গ্রুপ যুগ্ম সম্পাদক, আমাদের নতুন সময়

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ