প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

সন্দেহজনক জিজ্ঞাসা : ‘নির্বাচন হবে তো?’

দীপক চৌধুরী : নির্বাচন হবে তো? আমার দিকে এই প্রশ্নটি এমনভাবে করা হয় যেন আমি সব কিছু জানি। আমি সর্বজান্তা। ইদানীং এমন ধরনের প্রশ্ন প্রতিনিয়ত করা হয়ে থাকে। এটি কাচাবাজার থেকে শুরু করে সচিবালয়ের উচ্চপদস্থ আমলার কক্ষেও। আমি অবাক হয়ে যাই, গুছিয়ে উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করি। অনেকের মুখ দেখে বুঝতে পারি উত্তর মনের মতো হয়নি। আবার কেউ কেউ খুশি হন, আমার জবাব শুনে। যারা রাজনীতির অন্দরমহলের খবর রাখেন তাদের প্রতি আগ্রহ বেশি প্রশ্নকর্তাদের। পছন্দ মতো না হলেই হতাশার কণ্ঠ। নেতিবাচক জবাব এলেই প্রশ্নকর্তাদের মুখ বেজার।

সবকিছুই তো স্বাভাবিক। যথারীতি আমরা ভোট দেবো। নির্ধারিত সময়ে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন না হওয়ার কারণ কি? কিন্তু কেন এই সন্দেহমূলক প্রশ্ন, উত্তর জানা নেই আমার বা আমাদের অনেকেরও। আমরা জানি, বাংলাদেশের ইতিহাসে কোনো সংসদ নির্বাচন টানা ১০ বছর ক্ষমতায় থাকার পর দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়নি। চমকপ্রদ মন্ত্রিপরিষদ এবং ৩৫০ জন সংসদ সদস্য বহাল থাকা অবস্থায় অতীতে বাংলাদেশে অনুষ্ঠিত হয়নি। কিন্তু এটাও সত্য, জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর সুযোগ্য কন্যা শেখ হাসিনার মতো কঠিন ও দূরদর্শী প্রধানমন্ত্রী আমরা দীর্ঘদিন পাইনি। তার নেতৃত্বে অভূতপূর্ব সাফল্য ও উন্নয়ন এসেছে। তিনি এনে দিয়েছেন এই সাফল্য।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাই এদেশের জনগণকে আত্মবিশ্বাসী করে তুলেছেন। আর কেউ পারেনি। কেরানীগঞ্জের ঝিলমিল প্রকল্পে পাসপোর্ট নিয়ে ফেরার পথে অটোরিকশা চালক লতিফ মিয়া জানালেন, ‘খুব ভালো আছেন তিনি। ছিনতাইকারী-চাঁদাবাজের যন্ত্রণা নেই।’ তিনি একথা সেকথা গল্প করছিলেন, বলছিলেন জীবনের কথা। অটোরিকশা চালানোর চল্লিশ বছরের অভিজ্ঞতা, রাজনীতি, স্বৈরশাসন কতো কথা। ‘স্যার, মেয়ে পড়তাছে ঢাকা ইউনিভার্সিটিতে, ছেলেটা ব্যাংকে জব করে। দোয়া করবেন স্যার। ছোট ছেলেটারে মাদ্রাসায় দিয়া দিছি।’ তৃপ্তি তার চোখমুখে। শফি হুজুর (আহমদ শফি) প্রধানমন্ত্রীকে টাইটেল দিয়েছেন ‘কওমী জননী।’ স্যার ভালো হয়েছে। এতো সুন্দর কথা তার মুখে। কিন্তু সেই অটোরিকশা ড্রাইভারের কণ্ঠেও সেই উদ্বেগ মেশানো প্রশ্ন, ‘স্যার নির্বাচন হবে তো?’ জানতে চাই, ‘কেন, আপনার সন্দেহ কেন, নির্বাচন অনুষ্ঠান না হওয়ার কী কোনো কারণ আছে! কথাটা শুনলেন কোথায়?’ অটোরিকশা চালকের জবাব, ‘অটোরিকশার গ্যারেজের মাইনষে কয়, নির্বাচন হবে না। বিরাট ঝামেলা হবে।’

এরকম কথা প্রায়ই শুনে থাকে আমি। আসলে এক ধরনের গুজব ছড়ানো হচ্ছে এখন থেকেই। সর্বত্র তাদের এই অপচেষ্টা। এটা সত্য যে, বাংলাদেশের নির্বাচনী ইতিহাসে এযাবৎ সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন হতে যাচ্ছে ৩০ ডিসেম্বর। যদিও জটিল করার চেষ্টা করা হলেও এটি অসম্ভব হবে। এ পর্যন্ত অনুষ্ঠিত নির্বাচনে রাজনৈতিক দলের প্রাকনির্বাচনী এমন জটিল এবং চমকপ্রদ জোটের (সম্ভাব্য) নির্বাচন হয়নি স্বীকার করতেই হবে। বিএনপিকে ঘিরে যে জোট গড়ে উঠেছে, তার গঠনপ্রক্রিয়া নিয়ে নানা প্রশ্ন রয়েছে। এখনো তাদের জোটের প্রধানমন্ত্রী কে হবেন তা নিশ্চিত নয়। আরো স্বীকার করতেই হবে; ঐক্যফ্রন্টের জোটের মনোনয়ন দেওয়া নিয়েও ভয়ঙ্কর জটিলতা দেখা দিয়েছে।

একাদশ সংসদ নির্বাচন অতীত নির্বাচনের মতো ভালো বা খারাপ হবে বা কেমন হবে বলা যাচ্ছে না। তবে এটা বলা যাচ্ছে এখন পর্যন্ত সম্পূর্ণ নির্বাচনপ্রক্রিয়া নির্বাচন কমিশনের আওতায় আছে। সুতরাং গুজব যারা ছড়াচ্ছে, যারা নির্বাচন নিয়ে সন্দেহ ছড়াচ্ছে তাদের চিহ্নিত করা ও আইনি ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। নির্বাচন কমিশন জটিল পরিস্থিতিতে নির্বাচন অনুষ্ঠান করতে যাচ্ছে; সুতরাং চোখ বন্ধ করে আইনি পদক্ষেপ নিতে হবে। কারণ, বেলা শেষে সব দায়দায়িত্বও নির্বাচন কমিশনের ওপরই বর্তাবে।

গণতান্ত্রিক ধারাবাহিকতার পথে বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে সামনের দিকে। বাস্তব এবং সত্য যে, অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের মাঠে আমরা। কিন্তু আমরা কী ভয়ঙ্কর অতীত অতিক্রম করে আসিনি? অনেকের হয়তো মনে আছে, ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের পর বিএনপি জোটের কড়া হুঁশিয়ারি, ‘নির্বাচন বাতিল করতে হবে।’ এর কিছুদিন পর তারা জোরালো কণ্ঠে দাবি তুলে বললেন, ‘মধ্যবর্তী নির্বাচন ছাড়া কোনো উপায় নেই। জনগণ মধ্যবর্তী নির্বাচন চায়।’ এর কিছুদিন পর অর্থাৎ ২০১৬ সালে ২০-দলীয় জোট থেকে দাবি উঠলো, ‘তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনেই নির্বাচন দিতে বাধ্য করা হবে সরকারকে। মধ্যবর্তী নির্বাচন ছাড়া সরকারের সামনে কোনো পথ খোলা নেই।’

২০১৭ সালে এসে বিএনপিজোটের একমাত্র দাবি তীব্র আকার ধারণ করে উঠলো, ‘অবৈধ সরকারকে হটাতে হলে অবাধ নির্বাচন দরকার। এটা করতে হলে, তত্ত্বাবধায়ক ছাড়া বিকল্প কিছুই নেই।’ ২০১৮ সালের মার্চে এসে বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০-দলীয় জোটের একমাত্র দাবি, ‘খালেদা জিয়ার মুক্তি ছাড়া কোনো নির্বাচন নয়।’ কিন্তু এই ডিসেম্বরে? খালেদা জিয়া কী মুক্ত? না, তিনি কারান্তরে? একারণেই সম্ভবত মাঝেমধ্যে প্রশ্ন ওঠে, ‘রাজনীতির শেষ কথা বলতে কী কিছু আছে ?’

লেখক : উপ-সম্পাদক, আমাদের অর্থনীতি, কলামিস্ট ও ঔপন্যাসিক

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ