প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

দুই জোটে আসন ভাগাভাগি
শরিকদের আসন কমাচ্ছে আওয়ামী লীগ

সমকাল : আওয়ামী লীগ শুরুতে বলেছিল, মহাজোটের শরিকদের জন্য ৬৫ থেকে ৭০টি আসন ছাড়বে। কিন্তু জয়ী হওয়ার মতো প্রার্থী না পাওয়ায় শরিকদের ৫০ থেকে ৫৫টির বেশি আসন ছাড়তে এখন আর রাজি নয় আওয়ামী লীগ।

ক্ষমতাসীন দল বলছে, সব দল অংশ নেওয়ায় এবারের নির্বাচন হবে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ। ফলে শরিকদের অপেক্ষাকৃত দুর্বল প্রার্থীকে মহাজোটের মনোনয়ন দিয়ে আসন হারাতে চায় না আওয়ামী লীগ। দলটির নেতারা জানিয়েছেন, আপিল শুনানির ফয়সালার মধ্য দিয়ে ৮ ডিসেম্বর প্রার্থী তালিকা চূড়ান্ত হওয়ার পর মহাজোটের প্রার্থী নির্ধারণ করা হবে।

দশম সংসদ নির্বাচনে মহাজোটের শরিকরা ৪৯ আসনে জয়ী হয়। পরে তাদের আসন সংখ্যা হয় ৫১। এর মধ্যে এবার ২০টিতেই প্রার্থী দিয়েছে আওয়ামী লীগ। মহাজোট শরিক জাতীয় পার্টির জন্য ২৫, ওয়ার্কার্স পার্টির জন্য ৪, জাসদের জন্য ৩, জেপি ও তরীকতের জন্য একটি করে আসন ফাঁকা রেখে সেখানে প্রার্থী দেয়নি আওয়ামী লীগ।

মহাজোটের নতুন শরিক বিকল্পধারার জন্য ফাঁকা রাখা হয়েছে দুটি আসন। সব মিলিয়ে ৩৬টি আসনে প্রার্থী দেয়নি আওয়ামী লীগ।

২০০৮ সালে সব দলের অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত নবম সংসদ নির্বাচনে শরিকদের জন্য ৩৬টি আসন ছেড়েছিল আওয়ামী লীগ। জাতীয় পার্টিকে ২৯টি, ওয়ার্কার্স পার্টিকে চারটি ও জাসদকে তিনটি আসন ছেড়েছিল তারা।

২০১৪ সালে বিএনপিবিহীন নির্বাচনে শরিকদের আসন ছাড়ার ক্ষেত্রে উদার মনোভাব ছিল তাদের। ৬০টি আসন ছেড়ে দেওয়া হয় শরিকদের। এবার তা হচ্ছে না। মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের সময় পার হওয়ার অপেক্ষায় রয়েছে আওয়ামী লীগ। মনোনয়নপত্র বাতিল হওয়া মহাজোটের প্রার্থীদের আপিল প্রক্রিয়ার ওপরও নজর রাখছে।

আওয়ামী লীগ শরিকরাও রয়েছে দুশ্চিন্তায়। যেসব আসনে গত নির্বাচনে তারা জয়ী হয়েছিল, সেখানেও প্রার্থী দিয়েছে আওয়ামী লীগ। যেগুলোতে ছাড় দিয়েছে, সেখানে রয়েছে আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী। আওয়ামী লীগ অবশ্য শরিকদের ছাড় দেওয়া আসনে প্রার্থী প্রত্যাহার এবং বিদ্রোহী প্রার্থীদের বসিয়ে দেওয়া হবে বলে কথা দিয়েছে।

আওয়ামী লীগ ও মহাজোটের আসন সমঝোতার সঙ্গে সংশ্নিষ্ট নেতাদের সূত্রে জানা গেছে, ২৮ নভেম্বর মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার সময়সীমা পার হওয়ার আগেই আসন বণ্টন প্রক্রিয়া শেষ করার সিদ্ধান্ত ছিল। পরে সিদ্ধান্ত বদল হয়। তা হওয়ায় বাছাইয়ের পরপরই প্রার্থী তালিকা চূড়ান্ত করার সিদ্ধান্ত হয়। কিন্তু আওয়ামী লীগ ও শরিকদের কয়েকজন প্রার্থী বাছাইয়ে বাদ পড়ায় নতুন পরিস্থিতির উদ্ভব ঘটেছে। আপিল প্রক্রিয়া শেষে প্রার্থিতা চূড়ান্ত হওয়ার পরই আসন বণ্টন সুরাহা করতে চায় আওয়ামী লীগ।

অন্যদিকে, নানা হুঁশিয়ারি সত্ত্বেও আওয়ামী লীগ থেকে ‘বিদ্রোহী প্রার্থী’ হওয়ার প্রবণতা এবারও কমানো যায়নি। দেশের প্রায় ৭৩টি আসনে কমপক্ষে ৯৫ জন মনোনয়নবঞ্চিত আওয়ামী লীগ নেতা স্বতন্ত্র প্রার্থিতার আড়ালে বিদ্রোহী প্রার্থী হয়েছেন। যদিও ২ ডিসেম্বর যাচাই-বাছাইকালে প্রায় ৫০ জনের মতো বিদ্রোহী প্রার্থীর মনোনয়ন বাতিল হয়েছে। এরপরও অনেক আসনে শক্তিশালী বিদ্রোহ প্রার্থী রয়ে গেছেন। আওয়ামী লীগের নির্বাচন পরিচালনার গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থাকা পাঁচ শীর্ষ নেতা তাদের ঢাকায় ডেকে এনে অথবা টেলিফোনে কথা বলে মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারে সম্মত করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।

মহাজোটের দ্বিতীয় বৃহত্তম দল জাতীয় পার্টি (জাপা)। হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের নেতৃত্বাধীন দলটিকে এখন পর্যন্ত ২৫ আসন ছেড়েছে আওয়ামী লীগ। জাপার দখলে থাকা ৩৬ আসনের ১৪টিতেই প্রার্থী দিয়েছে আওয়ামী লীগ। জাপা চায় অন্তত ৪৭ আসন। ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে দলটিকে ৪৮ আসন ছেড়েছিল আওয়ামী লীগ। ২০০৮ সালে নির্বাচনে ছেড়েছিল ২৯ আসন। বিএনপিবিহীন নির্বাচনে ‘ঝুঁকি’ নিয়ে অংশ নেওয়ার ‘পুরস্কার’ হিসেবে ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে পাওয়া আসনগুলো আবারও চায় জাপা।

জাপার নয় নেতা আসন বণ্টনে দরকষাকষির দায়িত্বে রয়েছেন। তারা গত দু’দফা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে সাক্ষাৎ করে আসন বণ্টন নিয়ে আলোচনা করেছেন। তারা জানিয়েছেন, জাপাকে এবার ৩০ থেকে ৩২টির বেশি আসন দিতে রাজি হচ্ছে না আওয়ামী লীগ।

জাপাকে ছাড়া আসনগুলো হলো- নীলফামারী-৩, নীলফামারী-৪, লালমনিরহাট-৩, রংপুর-১, রংপুর-৩, কুড়িগ্রাম-২, গাইবান্ধা-১, বগুড়া-২, বগুড়া-৩, বগুড়া-৬, বগুড়া-৭, বরিশাল-৬, পিরোজপুর-৩, ময়মনসিংহ-৪, ময়মনসিংহ-৮, কিশোরগঞ্জ-৩, ঢাকা-৪, ঢাকা-৬, নারায়ণগঞ্জ-৫, সুনামগঞ্জ-৪, সিলেট-২, ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২, ফেনী-৩, লক্ষ্মীপুর-২ ও চট্টগ্রাম-৫। এর মধ্যে ২২টি আসনে জাপার দলীয় এমপি রয়েছেন।

জাপার এমপি নেই এমন তিনটি আসনও ছেড়েছে আওয়ামী লীগ। এগুলো হলো নীলফামারী-৩, লালমনিরহাট-৩ ও ফেনী-৩ আসন। এই ২৫ আসনের বেশিরভাগকে বিএনপি অধ্যুষিত বলছেন জাপার নেতারা।

জাপার দখলে থাকা ১৪টি আসনে প্রার্থী দিয়েছে আওয়ামী লীগ। আসনগুলো হলো- কুড়িগ্রাম-১, কুড়িগ্রাম-৩, পটুয়াখালী-১, জামালপুর-৪, ময়মনসিংহ-৫, ময়মনসিংহ-৭, ঢাকা-১, নারায়ণগঞ্জ-৩, সিলেট-৫, হবিগঞ্জ-১, কুমিল্লা-২, কুমিল্লা-৮, চট্টগ্রাম-৯ ও কক্সবাজার-১। এ আসনগুলোর মধ্যে শুধু কুড়িগ্রাম-১, কুড়িগ্রাম-৩ আসনে মহাজোটের মনোনয়নের আশ্বাস পেয়েছে জাপা। এরশাদের জন্য ঢাকা-১৭ আসনে মহাজোটের মনোনয়নের নিশ্চয়তা মিলেছে।

বিরোধীদলীয় নেতা রওশন এরশাদ ময়মনসিংহ-৪ ও ৭ আসনে প্রার্থী। তার সমর্থনে ময়মনসিংহ-৪ আসনে প্রার্থী দেয়নি আওয়ামী লীগ। রওশনের জন্য ময়মনসিংহ-৭ আসনটি আদায়ের চেষ্টা করলেও নিশ্চয়তা পায়নি জাপা। দলটির সদ্য সাবেক মহাসচিব এ বি এম রুহুল আমিন হাওলাদার পটুয়াখালী-১ আসনে প্রার্থী হয়েছিলেন। তার মনোনয়নপত্র বাতিল হয়েছে। আপিলে যদি প্রার্থিতা ফিরেও পান, তবুও তার মনোনয়ন নিশ্চিত নয়।

বরিশাল-২ আসনে জাপার প্রার্থী চিত্রনায়ক সোহেল রানার মনোনয়নপত্র বাতিল হয়েছে। তিনি আপিল করেছেন। প্রার্থিতা ফিরে পেল তিনি মহাজোটের মনোনয়ন পেতে পারেন। এই ৩১ আসন ছাড়াও রংপুর-২ ও রংপুর-৪ আসনে মহাজোটের মনোনয়ন নিশ্চিত করার চেষ্টা চালাচ্ছে জাপা।

জাপার নবনিযুক্ত মহাসচিব মসিউর রহমান রাঙ্গাঁ গত সোমবার বলেছিলেন, কয়টি আসনে মহাজোটের মনোনয়ন পওায়া যাবে, তা দু-একদিনের মধ্যে জানা যাবে। তিনি গতকাল বুধবার কে একই কথা বলেন। তিনি বলেন, আলোচনা চলছে। তারা আশা করছেন, ৫৪ থেকে ৫৫টি আসন পাওয়া যাবে।

১৪ দল শরিক ওয়ার্কার্স পার্টি, জাসদের দুই অংশ, জেপি ও তরীকতের দখলে রয়েছে ১৫টি আসন। তবে এ পাঁচটি দল এখন পর্যন্ত নয়টি আসনের নিশ্চয়তা পেয়েছে। ওয়ার্কার্স পার্টি চারটি, জাসদ তিনটি, বাংলাদেশ জাসদ দুটি, তরীকত ও জেপি একটি আসনে ছাড় পেয়েছে। তাদের দখলে থাকা ছয়টি আসনে প্রার্থী দিয়েছে আওয়ামী লীগ। তবে কুড়িগ্রাম-৪ আসনে আওয়ামী লীগ প্রার্থীর মনোনয়নপত্র বাতিল হওয়ায় সেখানকার জেপির এমপির মহাজোটের মনোনয়ন পাওয়ার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে।

ওয়ার্কার্স পার্টি থেকে দলীয় সভাপতি রাশেদ খান মেননের ঢাকা-৮, সাধারণ সম্পাদক ফজলে হোসেন বাদশার রাজশাহী-২, ইয়াসিন আলীর ঠাকুরগাঁও-৩ ও টিপু সুলতানের বরিশাল-৩ আসনে মহাজোটের মনোনয়ন নিশ্চিত হয়েছে। এসব আসনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী নেই। গত নির্বাচনে দলটির জয়ী হওয়া সাতক্ষীরা-১ ও নড়াইল-২ আসনে প্রার্থী দিয়েছে আওয়ামী লীগ।

জাসদ গত নির্বাচনে জিতেছিল পাঁচটি আসনে। জাসদের হাসানুল হক ইনুর নেতৃত্বাধীন অংশে এমপি তিনজন। তাদের সবারই মহাজোটের মনোনয়ন নিশ্চিত। হাসানুল হক ইনুর কুষ্টিয়া-২, সাধারণ সম্পাদক শিরীন আখতারের ফেনী-১ এবং স্থায়ী কমিটির সদস্য এ কে এম রেজাউল করিম তানসেনের বগুড়া-৪ আসনে ছাড় পেয়েছে দলটি।

জাসদ ভেঙে গঠিত বাংলাদেশ জাসদের বর্তমান দুই এমপির মধ্যে দলের কার্যকরী সভাপতি মইনউদ্দীন খান বাদলের চট্টগ্রাম-৮ আসনের আশ্বাস দেওয়া হলেও সেখানে প্রার্থী দিয়েছে আওয়ামী লীগ। দলটির সাধারণ সম্পাদক নাজমুল হক প্রধানের পঞ্চগড়-১ আসনে আওয়ামী লীগ প্রার্থী দিয়েছে। নাজমুল হক প্রধান সেখানে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছেন। এ ছাড়া শরিফ নূরুল আম্বিয়াকে নড়াইল-১ আসনটি ছেড়ে দেওয়া হলেও আওয়ামী লীগ থেকে প্রার্থী দেওয়া হয়েছে।

গত নির্বাচনে জেপি ও তরীকত ফেডারেশন দুটি করে আসন পেয়েছিল। এবার পিরোজপুর-২ আসনে জেপি চেয়ারম্যান আনোয়ার হোসেন মঞ্জুর মনোনয়ন নিশ্চিত। চট্টগ্রাম-২ আসনে মনোনয়ন নিশ্চিত তরীকতের চেয়ারম্যান নজিবুল বশর মাইজভাণ্ডারীর। লক্ষ্মীপুর-১ আসনের এমপি এম আউয়াল এবার তরীকতের মনোনয়ন পাননি, স্বতন্ত্র প্রার্থী হলেও বাছাইয়ে মনোনয়নপত্র বাতিল হয়েছে। আওয়ামী লীগ থেকে তরীকতে যোগ দিয়ে আনোয়ার খান মনোনয়ন পেয়েছেন। এ আসনেও আওয়ামী লীগের প্রার্থী রয়েছে।

বিকল্পধারার জন্য মুন্সীগঞ্জ-১ ও মৌলভীবাজার-২ আসন ফাঁকা রাখা হয়েছে। মুন্সীগঞ্জে প্রার্থী মাহী বি. চৌধুরী, মৌলভীবাজারে বিএনপি ছেড়ে আসা এম এম শাহীন। লক্ষ্মীপুর-৪ আসনে প্রার্থী বিকল্পধারার মহাসচিব মেজর (অব.) আবদুল মান্নান। এ আসনে আওয়ামী লীগ প্রার্থী দিলেও আবদুল মান্নানের মনোনয়ন নিশ্চিত বলে জানিয়েছে সূত্র।

আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের গতকাল এক সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন, ৯ ডিসেম্বর মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের শেষ দিনের আগেই আসন বণ্টন প্রক্রিয়া শেষ করা হবে। কয়েকটি আসনে মহাজোটের শরিক এবং আওয়ামী লীগ উভয়ের প্রার্থী থাকা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের শেষ দিনের পর কোথাও এ ধরনের প্রার্থী থাকলে আওয়ামী লীগ থেকে তাদের বহিস্কার করা হবে।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ