প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

স্যরি অরিত্রী, তোমাকে আমরা বাঁচাতে পারলাম না!

চিররঞ্জন সরকার : জীবন সুন্দর। জীবন ‘যাপনের’ জন্য, বেঁচে থাকার জন্য। শিক্ষা কিংবা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান জীবন-যাপনকে আরও সুন্দর করার পথ দেখায়, জীবনকে বিকশিত করার কৌশল শেখায়। কিন্তু আমাদের দুর্ভাগ্য, এদেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো এখনও সেই মানবিক শিক্ষাপ্রদান করতে পারছে না। শিক্ষকগণও নিজেদের পেশা ও দায়িত্বের ব্যাপারে যথাযথ ‘শিক্ষিত’ হয়ে ওঠেননি। তাই তো এখনও পান থেকে চুন খসলেই শিক্ষার্থীদের ওপর তারা চড়াও হন। বকাঝকা ও অপমান করেন। শাস্তি দেন। এর ফলে কতো কোমল প্রাণ অকালে ঝরে যায়, তার খবর আমরা রাখি না। শিক্ষকদের দায়িত্বহীন ও অমানবিক আচরণের কারণে সর্বশেষ রাজধানীর নামজাদা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ভিকারুননিসা স্কুলের অরিত্রী অধিকারী নামে নবম শ্রেণির এক শিক্ষার্থীর জীবন-প্রদীপ অকালে নিভে গেছে।

স্কুল কর্তৃপক্ষের অভিযোগ ছিলো সে মোবাইল ফোন নিয়ে পরীক্ষার হলে প্রবেশ করেছিলো। এ জন্য পরীক্ষা থেকে বহিষ্কার করে অভিভাবকদের ডেকে নিয়ে তাদের সামনেই ভর্ৎসনা করা হয়। অভিভাবকদের বলা হয়, পরীক্ষায় নকল করার জন্য মোবাইল ফোন নিয়ে পরীক্ষা দিতে গিয়েছিল সে। এ কারণে তাকে স্কুল থেকে বদলির সার্টিফিকেট (ট্রান্সফার সার্টিফিকেট) দেওয়া হবে। সেই সঙ্গে বাকি পরীক্ষাগুলোতেও সে আর বসতে পারবে না।

মেয়ের বিরুদ্ধে এমন কঠোর শাস্তির সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসার জন্য স্কুল কর্তৃপক্ষকে বোঝানোর চেষ্টা করেও ব্যর্থ হন অভিভাবকরা। এমন পরিস্থিতিতে অভিমানি কিশোরীটি আত্মহননের পথ বেছে নেন। ঘটনাটি আমাদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর অমানবিক বৈশিষ্ট্যকেই ফুটিয়ে তুলেছে। হয়তো মেয়েটি অপরাধ করেছিলো, কিন্তু তাকে ভালোবেসেও বোঝানো যেতো। ইতিবাচকভাবে পুরো ঘটনাটি সমাধান করা যেতো। কিন্তু কর্তৃপক্ষ সেই পথ অবলম্বন না করে যা করেছেন, তা অপরাধেরই নামান্তর।

কেননা, আপাতদৃষ্টিতে শিশু শিক্ষার্থী অরিত্রী হয়তো আত্মহত্যা করেছে। কিন্তু এমন পরিস্থিতির মুখে তাকে ঠেলে দিয়েছে স্কুল কর্তৃপক্ষ। তারাই এ হত্যাকা-টি ঘটিয়েছেন। এটা অপরাধ। জঘন্য অপরাধ। অরিত্রীকে এক রকম বাধ্য করা হয়েছে অকালে পৃথিবী ছাড়তে। এই কাজটি করেছে স্কুল কর্তৃপক্ষ, যা তাকে একটি সুস্থ, সুন্দর জীবন দেওয়ার জন্য দায়বদ্ধ। তথাকথিত নিয়মকানুনের কারণে কিংবা ‘পরিস্থিতির’ চাপে তারা সেই অঙ্গীকার পূরণে ব্যর্থ হতেই পারেন, কিন্তু সেই ব্যর্থতা একটি শিশু প্রাণকে হত্যার দোহাই কখনও হতে পারে না।

আমাদের দেশে শিক্ষার্থীদেরও যে একটি একক সত্তা আছে, স্বাধীন ভাবে বাঁচবার এবং জীবনকে উপভোগ করবার সমস্ত অধিকার আছে, এটা প্রায়শই অগ্রাহ্য করা হয়ে থাকে। অনেকে আবার সন্তানের ‘শিক্ষা’ ও ‘ভবিষ্যৎ’-এর প্রশ্নটি তোলেন। উদ্বিগ্ন হন, কঠোর ‘নিয়মনীতি’ না থাকলে শিশুর ভবিষ্যৎ কী হবে? কিন্তু জীবন অন্ধকার হতে পারে বলে তার গোটা জীবনটাই কেড়ে নেওয়া যায় না। এটাকে আত্মহত্যা না বলে হত্যাকা- বলাই ভালো। আর এ হত্যার দায় অবশ্যই স্কুল কর্তৃপক্ষকে নিতে হবে। বাবা-মাও দায় এড়াতে পারেন না। তারাও কী তাদের মেয়েটিকে প্রয়োজনীয় মানসিক সাহায্য দিতে পেরেছিলেন? সন্তানটির নির্ভরতা ও আস্থার স্থান হতে পেরেছিলেন? আসলে আমাদের পরিবার এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো এখনও শিশুবান্ধব হতে পারেনি। সে চেষ্টাও বড় বেশি আছে বলে মনে হয় না।

হ্যাঁ, অরিত্রীর আত্মহননের ঘটনাটিকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখলে চলবে না। বিষয়টি নিয়ে আমাদের গভীরভাবে ভাবতে হবে। অভিভাবক, শিক্ষক সবার আচরণই বিশ্লেষণ হওয়া দরকার। ‘আত্মসমীক্ষা’ প্রয়োজন। আর কথা বলতে হবে স্কুলের সঙ্গেও। যে সব স্কুল নিখুঁত শিক্ষার্থী বানাতে গিয়ে অতিরিক্ত চাপ দেয়, সেখানে প্রয়োজনে ‘পেরেন্ট টিচার মিটিং’-এ সরব হতে হবে। একটি শিক্ষার্থীকে হারিয়ে তার পর স্কুলের নীতি বদলানোর চেয়ে সম্ভাবনাকেই রোধ করা যে ভালো, এটা স্কুলেরও বোঝার দরকার।

আর অপমান-অপদস্থ-শাস্তি প্রদানের নীতি নয়, আমাদের ফিরে আসতে হবে ভালোবাসার নীতিতে। আমরা বেঁচে থাকি ভালোবাসার জন্যই। শরীরে বেঁচে থাকার জন্য খাদ্য দরকার, মনে বেঁচে থাকার জন্য দরকার ভালোবাসা। বাবা-মা-শিক্ষক-অভিভাবক হিসেবে আমাদের একটিই প্রার্থিত হোক আমার সন্তান যেন ভালোবাসা পায়, সেই ভালোবাসাকে গ্রহণ করে, আর অন্যকে ভালোবাসার ক্ষমতা রাখে। কোনো নিয়ম বা রেজাল্টের মূল্য এই চাওয়ার চেয়ে বেশি নয়।

স্যরি অরিত্রী, তোমাকে আমরা বাঁচাতে পারিনি! আর অরিত্রীর বাবা-মাকে সান্ত¡না দেওয়ার ভাষাও আামদের জানা নেই!

লেখক : কলামিস্ট

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ