প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

ড. কামালের ঐক্যের ডাক : ‘হয় মেরুন, নয় মরুন’

মোহাম্মদ আলী বোখারী, টরন্টো থেকে: বাংলাদেশের রাজনীতির অঙ্গণে ড. কামাল হোসেনের পরিচিতিটি নিশ্চয়ই নতুন করে বলার অপেক্ষা রাখে না। তারপরও অনলাইন গুগলে অনুসন্ধান করলে উইকিপিডিয়ায় তার আন্তর্জাতিক পরিম-লে অর্জিত অতুৎজ্জ্বল কৃতিত্বগুলো জানা যাবে। কেননা নির্বাচনমুখী বাংলাদেশে তিনিই বহুল আলোচিত ব্যক্তিত্ব। তিনি গত ২৮ অক্টোবর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে সংলাপ বিষয়ক একটি চিঠি পাঠান। গণফোরামের সাধারণ সম্পাদক মোস্তফা মহসিন মন্টু ও জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়ার সুলতান মোহাম্মদ মনসুর আহমেদ তা পৌঁছে দেন আওয়ামী লীগের দফতর সম্পাদক আব্দুস সোবহান গোলাপের হাতে। এর সামগ্রিক ফলাফল জাতি নির্ধারণ করবে আগামী ৩০ ডিসেম্বর অনুষ্ঠেয় জাতীয় সংসদ নির্বাচনে।

ওই চিঠিতে তিনি লিখেন- ‘মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার ও সভাপতি, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ, গণভবন, ঢাকা। বাংলাদেশ। প্রিয় মহোদয়, শুভেচ্ছা নেবেন। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে এক দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রাম এবং মহান মুক্তিযুদ্ধে ত্রিশ লাখ শহীদের আত্মত্যাগ ও দুই লক্ষ মা-বোনের সম্ভ্রমের বিনিময়ে আমাদের স্বাধীনতা। যে সকল মহান আদর্শ ও মূল্যবোধ আমাদের জনগণকে জাতীয় মুক্তি সংগ্রামে উজ্জীবিত ও আত্মত্যাগের উদ্বুদ্ধ করেছিল – তার অন্যতম হচ্ছে ‘গণতন্ত্র।’ গণতন্ত্রের প্রথম শর্তই হচ্ছে অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠান। জনগণের ভোটে নির্বাচিত প্রতিনিধিগণ জনগণের পক্ষে জনগণের ক্ষমতা প্রয়োগ করবে এবং জনগণকে শোষণ থেকে মুক্তির লক্ষ্যে রাষ্ট্রের আইন প্রণয়ন ও শাসনকার্য পরিচালনা করবে – এটাই আমাদের সাংবিধানিক অঙ্গীকার। আপনি নিশ্চয়ই একমত হবেন যে, বাংলাদেশের জনগণ নির্বাচনকে একটি মহোৎসব মনে করে। ‘ব্যক্তির এক ভোট’ এর বিধান জনগণের জন্য বঙ্গবন্ধুই নিশ্চিত করেছেন- যা রক্ষা করা আমাদের সকলের সাংবিধানিক দায়িত্ব। ইতিবাচক রাজনীতি একটা জাতিকে কীভাবে ঐক্যবদ্ধ করে জনগণের ন্যায়সংগত অধিকারগুলো আদায়ের মূলশক্তিতে পরিণত করে- তা বঙ্গবন্ধু আমাদের শিখিয়েছেন। নেতিবাচক রুগ্ন-রাজনীতি কীভাবে আমাদের জাতিকে বিভক্ত ও মহাসংকটের মধ্যে ফেলে দিয়েছে, তাও আমাদের অজানা নয়। এ সংকট থেকে উত্তরণ ঘটানো আজ আমাদের জাতীয় চ্যালেঞ্জ। এ চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট ৭ দফা দাবি ও ১১ দফার লক্ষ ঘোষণা করেছে। একটি শান্তিপূর্ণ ও সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশে সবার অংশগ্রহণ ও প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক নির্বাচন অনুষ্ঠানের লক্ষে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সঙ্গে একটি অর্থবহ সংলাপের তাগিদ অনুভব করছে এবং সে লক্ষে কার্যকর উদ্যোগ প্রত্যাশা করছি। আপনার সুস্বাস্থ্য ও দীর্ঘায়ু কামনা করছি। ধন্যবাদান্তে ড. কামাল হোসেন।’

নিঃসন্দেহে ওই চিঠির প্রতিটি প্রতিপাদ্যই আমাদের সকলের মর্ম-উপলব্ধি ও আত্ম-সমালোচনার অনুষঙ্গ। বঙ্গবন্ধুসংশ্লিষ্ট শেষ দুটো বাক্যে ‘জাতিকে ঐক্যবদ্ধ’ করার যে প্রসঙ্গটি উত্থাপিত, তাতে প্রকারান্তরে ‘রাজনীতির মেরুকরণ’ সবিশেষ মহিমায় উদ্ভাসিত। যেন তার সায়াহ্ন বেলার ‘অরোরা পোলারিস’ বা রাজনীতির জ্যোতিতে ‘মেরুকরণ’ সংক্ষেপিত হয়ে দাঁড়িয়েছে ‘মেরুণ’ এবং তাতে ‘হয় মেরুন, নয় মরুন’ পর্যায়ের অবস্থানটি একচ্ছত্রভাবে পরিস্ফুট!

সেই অর্থে, পশ্চিমা বিশ্বের রাষ্ট্রবিজ্ঞানেও ‘রাজনীতির মেরুকরণ’ হচ্ছে একটি ভাবিত ও বিতর্কিত অধ্যায়। দেখা যাচ্ছে, উইকিপিডিয়ায় ‘পলিটিক্যাল পোলারাইজেশন’ বা ‘রাজনীতির মেরুকরণ’ হচ্ছে- ‘টু দ্য ডাইভারজেন্স অব পলিটিক্যাল অ্যাটিচিউডস টু আইডোলজিক্যাল এক্সট্রিমস।’ অর্থাৎ একদিকে দ্বিধাবিভক্ত রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গী এবং অন্যদিকে আদর্শিক পরিসীমা। এতে যুক্তরাষ্ট্রের মতো গণতান্ত্রিক দেশে দুটি রাজনৈতিক দলের মেরুকরণে প্রায়শই উদারপন্থীরা তাদের ক্ষমতা ও প্রভাব বিসর্জন দেন। রাষ্ট্রবিজ্ঞানীদের দৃষ্টিতে এই ‘মেরুকরণ’ আবার দুইভাগে বিভক্ত, যেমন- ‘এলিট পোলারাইজেশন’ বা ‘ক্ষমতাধরদের মেরুকরণ’ এবং ‘পপুলার পোলারাইজেশন’ বা ‘জনতা বা ভোটারদের মেরুকরণ’। কিন্তু বিগত অর্ধশতাব্দীতে এই প্রক্রিয়ায় ‘মিডিয়া’ বা গণমাধ্যম হয়েছে অতি পরাক্রমশীল। রাষ্ট্রবিজ্ঞানীদের ধারণা তাতে গণমাধ্যম সুনির্দিষ্টভাবে ভোটারদের প্রভাবান্বিত করে থাকে; এমনকী বিচার ব্যবস্থা ও পররাষ্ট্রনীতিও হয় আক্রান্ত। সে জন্য প্রতিষ্ঠিত গণতন্ত্রে গণমাধ্যমের ভূমিকা হওয়া চাই ক্ষমতাসীনদের জবাবদিহি করা। এই সকল দিক বিবেচনায় রাজনীতির মেরুকরণে চার ধরনের বৈধতা অঙ্গীভূত, যেমন- দ্বিদলীয় রাজনীতির সীমাবদ্ধতা, রাজনীতিমুখিতা, সাংস্কৃতিক বৈসাদৃশ্যতা ও পশ্চিমা দৃষ্টিভঙ্গী। ফলে সাধারণের মাঝে ‘রাজনীতির মেরুকরণ’ বিষয়টি সুস্পষ্ট কোনো ধারণা সঞ্চার করতে না পারলেও তার পরিণতিটি হয় অবশ্যম্ভাবী। কেন না তা রাজনৈতিক গতিধারাকে বদলে দেয়, অর্থাৎ বাঁক-পরিবর্তনমুখী করে তোলে।

ওই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের রাজনীতিতে ড. কামাল হোসেনের দাবি ও ডাক তেমনই গতিধারাকে আপাতদৃষ্টিতে আলোড়িত করেছে। একই সঙ্গে প্রধান শরিক বিএনপি নিজ দলীয় প্রতীক ‘ধানের শীষ’কে তার সামগ্রিক ঐক্যজোটের প্রতীক হিসেবে রূপায়নেও সম্মত। এখন দেখার অপেক্ষা সেই ‘হয় মেরুন, নয় মরুন’ প্রয়াসটি জনতার রায়ে কতোটা সফল ও অভীষ্টমুখী হয়?

ই-মেইল: [email protected]

সম্পাদনা : সালেহ্ বিপ্লব

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ