প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

অরিত্রীর আত্মহত্যা ও ভিকারুননিসার ভিখারিরা!

অসীম সাহা : অরিত্রী অধিকারী ভিখারুননিসা নুন স্কুলের নবম শ্রেণির ছাত্রী। ‘সামান্য কারণে’ আত্মহত্যা করেছে। কারণ কী? অরিত্রীর বার্ষিক পরীক্ষা চলছিলো। সে পরীক্ষা দিতে গিয়ে সঙ্গে মোবাইল ফোন নিয়ে গিয়েছিলো। নকল থাকার অভিযোগে শিক্ষক তার মোবাইল জব্দ করেন এবং অভিভাবককে নিয়ে পরের দিন স্কুলে যেতে বলেন। যথারীতি পরের দিন অরিত্রীর অভিভাবক গিয়ে মেয়ের মোবাইল নেয়ার জন্য প্রিন্সিপ্যালের কাছে ক্ষমা চান। কিন্তু তাতেও হয়নি। তাদের পাঠানো হয় প্রিন্সিপ্যালের কাছে। সেখানেও অরিত্রীর বাবা-মা গিয়ে ক্ষমা চান। অরিত্রী প্রিন্সিপ্যালের পা জড়িয়ে ধরে ক্ষমা চায়।

কিন্তু ভাইস প্রিন্সিপ্যাল ও প্রিন্সিপ্যালের তাতে মন টলেনি। তারা অরিত্রীর বাবা-মাকে অপমান করেন এবং পরের দিন এসে অরিত্রীর টিসি নিয়ে যেতে বলেন। বাবা-মাকে এই অপমান সহ্য করতে পারেনি অরিত্রী। তাই বাসায় গিয়ে ফ্যানের সঙ্গে ওড়না পেচিয়ে সে আত্মহত্যা করে। একটি স্কুলের শৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্ব অবশ্যই স্কুল-কর্তৃপক্ষের। অরিত্রী স্কুলে মোবাইল নিয়ে যাওয়াতে সে ‘নকল করবে’ এই সন্দেহ থেকে তার মোবাইল জব্দ করা হয়েছে। ব্যাস হয়ে গেলো।

এখানেই তো ব্যাপারটা শেষ হয়ে যাওয়া উচিত ছিলো। কিন্তু না শেষ হয়নি। ভিকারুননিসা এমন একটি স্কুল, যেখানে শৃঙ্খলা ও আদর্শের চাষ হয়। তাই প্রতিবছর ভর্তির সময় এই স্কুলকে কেন্দ্র করে হাজারো অভিযোগের পাহাড় এসে জমা হয়। এই স্কুলের ভর্তিবাণিজ্যের কথা তো এখন আকাশে-বাতাসে ওড়ে। অনেক টাকাওয়ালা ও সুবিধাভোগী এই স্কুলের ভাইস-প্রিন্সিপ্যাল ও প্রিন্সিপ্যালরা দামি ভিখিরিরও অধম হয়ে যান! ভর্তিবাণিজ্যের সিংহভাগ টাকা তাদের পকেটে যায় বলে অনেক অভিযোগ আছে। আর এই সাধু স্কুলের ম্যানেজিং কমিটির ততোধিক সাধু কর্মকর্তা, প্রিন্সিপ্যাল ও ভাইস-প্রিন্সিপ্যালের সহযোগিতায় ভর্তিবাণিজ্যের ইতিহাস এমনকি খোদ শিক্ষামন্ত্রীরও জানার কথা। সম্ভবত জানেন সাবেক বিমান ও পর্যটনমন্ত্রীও। তারপরও নীতিবাক্য আর তথাকথিত সুনামের তরীতে পাল টাঙিয়ে নিয়মিত বৈতরণী পার হওয়ার সুযোগ তাদের কী করে মেলে, সেটি একটি অন্তহীন জিজ্ঞাসা।

এ-ধরনের ঘটনা যে শুধু ভিকারুননিসা স্কুলেই ঘটছে তা নয়। বিভিন্ন সময় বিভিন্ন স্কুলে নানা রকম অনিয়ম এবং ছাত্র-ছাত্রীদের ওপর শিক্ষক-শিক্ষিকার অমানবিক অত্যাচারের ছবি আমরা মুখগ্রন্থে ভাইরাল হতে দেখি। পত্রপত্রিকাতেও তার সচিত্র সংবাদ ছাপা হয়। কিছুদিন এ-নিয়ে হৈচৈ হয়, তারপর সব ঠা-া, মৃতদেহের চেয়েও নিথর। কিন্তু যার ক্ষতি হয়, তার বিদীর্ণ শীতল হৃদয়ের সারা জীবনের কান্না থেকেই যায়। এই কান্না ও হাহাকারের দায় নেবে কে?

অরিত্রী আর ফিরে আসবে না। অরিত্রী আত্মহত্যা করেছে। কিন্তু যারা তাকে আত্মহত্যায় প্ররোচিত করেছে, তারা কেন শাস্তি পাবে না? নাকি এই ঘটনাকে ধামাচাপা দেয়ার জন্য সমাজের মহারথিরা পেশীশক্তি, পশুশক্তি ও টাকার জোরে বরং অরিত্রী ও তার বাবা-মাকেই অভিযুক্তের কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে না আবার ফাঁসিয়ে দেন! অতীতে বারবার এমনটা ঘটেছে। এবারও সে-ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটলে বিস্মিত হওয়ার কিছু থাকবে না। তবে বিশেষত শিক্ষমন্ত্রী, আমাদের প্রিয় নাহিদ ভাই, আপনার দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলবো, আপনি নিজে ব্যাপারটাতে হস্তক্ষেপ করে যে ভাইস প্রিন্সিপ্যাল, প্রিন্সিপ্যাল ও গভর্নিং বোর্ডের মেম্বার এর সঙ্গে জড়িত, তাদের শাস্তির আওতায় নিয়ে আসুন। অন্যথায় এর দায়দায়িত্ব বর্তমান সরকারকেই বহন করতে হবে। আপনাদের মনে রাখতে হবে, একটার পর একটা অপরাধ ঢাকা দিতে দিতে গিয়ে আপনারা অপরাধকে গগনচুম্বী করে ফেলেছেন। অরিত্রীকে আত্মহত্যায় প্ররোচিত করার এই অপরাধ যেন অকাশ ভেদ করে অন্য কোথাও গিয়ে আঘাত না হানে, সেটা আপনাদের দেখতে হবে। কারণ, আপনাদের মনে রাখতে হবে নাহিদ ভাই, এর পরিণাম আপনাদের ও দেশের জন্য কিছুতেই শুভ হবে না।

লেখক : কবি ও সংযুক্ত সম্পাদক, আমাদের নতুন সময়

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ