প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

শিক্ষা বাণিজ্যের বলি অরিত্রিরা

মঞ্জুরুল আলম পান্না : দেশের কথিত নাম করা শিক্ষা-প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে শিক্ষাকে পুঁজি করে লাগামহীনভাবে অনৈতিক বাণিজ্য করে যাওয়ার অভিযোগ দীর্ঘদিনে, ভিকারুননিসা নূন স্কুল এর অন্যতম। ভর্তি বাণিজ্য থেকে শুরু করে কোচিং বাণিজ্য, পরীক্ষার ফিসসহ নানান খাতে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত অর্থ হাতিয়ে নেয়, পরীক্ষায় বেশি নম্বর পাইয়ে দিতে বিভিন্ন ধরনের অনৈতিক সুবিধা আদায় করা, শিক্ষক কর্তৃক ছাত্রীকে ধর্ষণ, শিক্ষার্থীদেরকে অস্বাভাবিক মানসিক এবং শারীরিক শাস্তি দেয়ার মতো কোনো অভিযোগ বাদ নেই প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে। এর সবশেষ বলি অরিত্রী অধিকারী নামের নাবম শ্রেণির ছাত্রী।

পরীক্ষার হলে মোবাইল ফোন নিয়ে যাওয়া এবং সেটির মাধ্যমে নকল করার অভিযোগ সত্য হয়ে থাকলেও অভিযুক্ত ছাত্রীকে সরাসরি ছাড়পত্র দিয়ে দেয়ার মতো গুরুতর শাস্তির কী যুক্তি থাকতে পারে? এই অপরাধের জন্য বিকল্প অন্য কোনো শাস্তির কি কোন পথ ছিলো না? অধ্যক্ষের পা ধরে ক্ষমা চেয়েও নিস্তার পেলো না মেয়েটি, উপরন্তু তার বাবা-মাকে করা হয় অপমান। আর এগুলো সইতে না পেরে অরিত্রী আত্মহত্যা করতে বাধ্য হয়েছে বলে অভিযোগ হতভাগা অভিভাবকদের। লঘু পাপে গুরুদ- দেয়া প্রতিষ্ঠানটির ঔদ্ধত্যেরই বহিঃপ্রকাশ বলে প্রথমত মনে করি। অথবা নকলের অভিযোগটির সদ্ব্যবহার করে মেয়েটিকে ছাড়পত্র দিয়ে তার শূন্য আসনে মোটা অঙ্কের ঘুষ নিয়ে অন্য কাউকে ভর্তি করানোর মতো হীন কোনো উদ্দেশ্য কিংবা বিশেষ কোনো শিক্ষকের কাছে কোচিং না করায় অরিত্রী আক্রোশের স্বীকার হয়েছে কি না, এমন বিষয়গুলো বিবেচনায় আনা প্রয়োজন।

দেশে শিক্ষার্থীদের মধ্যে আত্মহত্যার প্রবণতা বেড়েই চলেছে, যা রীতিমতো সবাইকে ভাবিয়ে তুলেছে। শিক্ষার্থীদের আত্মহত্যার এই প্রবণতা শুধু বাংলাদেশেই নয়, বিশ্বের অনেক দেশেই এমন উদ্বেগজনক অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। ভারতে প্রতি ৫৫ মিনিটে একজন শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করছে, ২০১৬-এর এক পরিসংখ্যান বলছে ব্রিটেনে ২০০৭ সালের পরবর্তী এক দশকে শিক্ষার্থীদের মধ্যে আত্মহত্যার প্রবণতা বেড়েছে ৫৬ শতাংশ। শিক্ষার্থীদের মধ্যে ভয়ঙ্কর এই মানসিকতার পেছনের কারণ হিসেবে গবেষকরা যে সব কারণ উল্লেখ করছেন তা হলো- পরীক্ষায় নম্বর কম পাওয়া, শিক্ষক কিংবা প্রতিষ্ঠান কর্তৃক ইচ্ছে করে পরীক্ষার ফলাফল খারাপ করিয়ে দেয়া, উচ্চশিক্ষার জন্য ভালো কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে সুযোগ না পাওয়া, জীবনে প্রতিষ্ঠিত হতে না পারার একধরনের ভয়, বন্ধুদের সঙ্গে সম্পর্ক টিকিয়ে রাখতে না পারা, আর্থিক সঙ্কট, শিক্ষকদের খারাপ আচরণ, গুরুতর শারীরিক এবং মানসিক শাস্তির মতো অপমান সইতে না পারা ইত্যাদি।

অরিত্রীর আত্মহত্যার কারণ খুঁজতে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। এ ধরনের তদন্ত কমিটির ওপর মানুষের এখন আর কোনো আস্থা নেই। ভিকারুননিসা স্কুলের বিরুদ্ধে এর আগের ওঠা শত শত অভিযোগের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। কারণ এ ধরনের প্রতিষ্ঠানের ম্যানেজিং কমিটিতে থাকেন রাঘব বোয়ালরা, যারা মোটা অঙ্কের টাকার ভাগ পেয়ে থাকেন নিয়মিত। যার ফলে নিজেদেরকে অসীম শক্তির অধিকারী মনে করে নীতি-আদর্শহীন কতিপয় অনিয়ন্ত্রিত শিক্ষক আর নীতি নির্ধারকদের ইচ্ছে-খুশির বলি হচ্ছে একের পর এক অরিত্রী, পুঁজির আড়ালে চলে শিক্ষার কেবলই আনুষ্ঠানিকতা।

লেখক : সাংবাদিক

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বাধিক পঠিত