Skip to main content

হত্যার প্ররোচনা দেওয়ার অপরাধ লঘু করে দেখা হবে চরম অন্যায়

বিভুরঞ্জন সরকার : দেশের নামকরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজের নবম শ্রেণির ছাত্রী অরিত্রী অধিকারী ৩ ডিসেম্বর আত্মহত্যা করেছে। আমি যখন আমার চিকিৎসক কন্যা অদিতির জন্মদিন উপলক্ষ্যে বাসায় একটি ঘরোয়া অনুষ্ঠানে ছিলাম তখনই খবর পাই অরিত্রীর আত্মহত্যার। মুহূর্তে আমার চোখ ভিজে যায়, গড়িয়ে পড়ে কয়েক ফোঁটা জল। মেয়ের জন্মদিনে আমার চোখে জল দেখে সবাই অবাক! কিন্তু আমি কাউকে কিছু বলতে পারি না। ঘটনাটি তখনই বললে আমার মেয়ের জন্মদিনের আনন্দ মাটি হতো। কারণ ওর সঙ্গে ভিকারুননিসার অন্যরকম আবেগ জড়িয়ে আছে। আমার মেয়েও ছিলো ভিকারুননিসার ছাত্রী। আমার মেয়ে এমনিতেই অত্যন্ত সংবেদনশীল। মানুষের দুঃখ-ব্যথা ওকে কাতর করে। আত্মীয়ের দরদে রোগীদের সেবা দেয়। এখনই ওকে রোগীরা ‘অন্য রকম ডাক্তার আপা’ বলে। ওর স্কুলেরই একজন ছাত্রীকে আত্মহত্যায় প্ররোচিত করেছেন প্রতিষ্ঠানটির প্রধান এবং তার সহকারী। এই খবর ওর জন্য মর্মপীড়ার কারণ হবে বুঝে স্বার্থপরের মতো ঘটনাটি চেপে গেলাম। কিন্তু আমার ভেতরে বাজতে থাকলো চাপা কান্নার ধ্বনি। সকালে মেয়েকে পুরো ঘটনা বললাম। ও বিষণ্ণ হলো। তারপর বললো, তোমার কিছু লেখা উচিত। কী লিখবো আমি? কীহবে লিখে? অরিত্রী আর ফিরে আসবে না। আমৃত্যু শোকযন্ত্রণা বয়ে জীবনপাত করতে হবে ওর বাবা-মাকে! আমার মেয়ে বললো, অরিত্রী কি খারাপ ছাত্রী ছিলো? ও কি এর আগেও পরীক্ষায় অসদোপায় অবলম্বন করেছে? ওকে কি আগেও অসদাচরণের জন্য শিক্ষকরা শাসিয়েছেন? ওর বিরুদ্ধে ওর অভিভাবকদের কাছে কি একাধিকবার অভিযোগ করা হয়েছিলো? যদি এসব প্রশ্নের জবাব ‘না’ হয়ে থাকে তাহলে প্রথমবার ‘নকল’ করার কথিত অভিযোগে বাড়াবাড়ি প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছেন স্কুল কর্তৃপক্ষ। পরীক্ষাকক্ষে মোবাইল নেওয়া, নকল করা নিশ্চয়ই অপরাধ। কিন্তু এই অপরাধের শাস্তি কি? অরিত্রী এমন ‘অবাধ্য’ হওয়ার শিক্ষা কোথায় পেলো? এতো যশখ্যাতির শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এতো বছর পড়ে ও কী শিখলো তাহলে? এটা ওর একার ব্যর্থতা ? প্রতিষ্ঠান, শিক্ষকদের কোনো ব্যর্থতা নেই? তার বাবাকে ডেকে নেওয়া, তিনি ক্ষমা প্রার্থনা করা সত্ত্বেও তাকে রুম থেকে বেরিয়ে যেতে বলা, অরিত্রী পা ধরে মাফ চাওয়ার পরও তাকে টিসি দেওয়ার হুমকি দিয়ে অধ্যক্ষ ক্ষমতার অপব্যহার করেছেন। অরিত্রীর বাবার কান্না মেয়েটির কাছে অসহ্য লেগেছে। এটাই স্বাভাবিক। মেয়েরা সাধারণত পিতার দুর্বলতা মেনে নিতে পারে না। অরিত্রী ভেবেছে, তার জন্যই বাবার ওই অপমান। নবম শ্রেণির একজন শিক্ষার্থীর যে হৃদয়বৃত্তি তা একটি প্রতিষ্ঠান প্রধানের নেই – এটা ভাবতেও কষ্ট হয়। এক বুক কষ্ট নিয়েই আমার মেয়ে কথাগুলো বললো। আমারও মনে হয়েছে, আমার মেয়ের মনে যেসব প্রশ্ন তৈরি হয়েছে তার জবাব আদায় করতে হবে ভিকারুননিসার কর্তৃৃপক্ষের কাছে কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে। একজনকে হত্যার প্ররোচনা দেওয়ার অপরাধ লঘু করে দেখাও হবে চরম অন্যায়। আর কবির ভাষায় বলতে হয় : অন্যায় যে করে আর অন্যায় যে সহে/তব ঘৃণা তারে যেন তৃণ সম দহে। লেখক : গ্রুপ যুগ্ম সম্পাদক, আমাদের নতুন সময়

অন্যান্য সংবাদ