প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

কী হবে এত আপিলের

ডেস্ক রিপোর্ট : একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রার্থিতা যাচাই-বাছাইয়ে রেকর্ডসংখ্যক মনোনয়নপত্র বাতিল হওয়ায় আপিলের হিড়িক পড়েছে নির্বাচন কমিশনে। প্রার্থিতা ফিরে পেতে মনোনয়নপত্র বাতিলের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে নির্বাচন কমিশনে গত দুই দিনে আপিল করেছেন ৩১৯ জন সংক্ষুব্ধ প্রার্থী। এর মধ্যে সোমবার প্রথম দিনে ৮৪ ও দ্বিতীয় দিনে ২৩৫ জন আপিল করেন। আজও আপিল করার সুযোগ রয়েছে। ৬, ৭ ও ৮ ডিসেম্বর আপিলের শুনানি করে নিষ্পত্তি করবে ইসি। এর পরও কেউ সংক্ষুব্ধ হলে তিনি আদালতে যেতে পারবেন।

এদিকে এত আপিলের কী হবে? এমন প্রশ্ন এখন ঘুরপাক খাচ্ছে রাজনৈতিক মহলে। আপিলকারীরা নির্বাচন কমিশনের কাছে সুবিচার পাবেন কিনা, তা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন নির্বাচন বিশ্লেষকরা। তারা বলেছেন, ঋণ-বিল খেলাপি হওয়া ছাড়াও এবারে ছোটখাটো ভুলত্রুটির কারণেই বেশি মনোনয়নপত্র বাতিল হয়েছে। বিএনপির প্রার্থী রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলু বলছেন, পূর্বপরিকল্পিতভাবে তার মনোনয়নপত্র বাতিল করা হয়েছে। নির্বাচন কমিশনার মাহবুব তালুকদার বলেছেন, ‘প্রার্থীদের আপিল নির্বাচন কমিশন নিরপেক্ষভাবে নিষ্পত্তি করবে। আমরা যা কিছু করব, তা আইনানুগভাবেই করতে হবে। কারও প্রতি পক্ষপাতিত্ব আমরা অবশ্যই দেখাব না। প্রতিটি কেসেরই (আপিল) মেরিট দেখব।’

আপিলকারীর মধ্যে রয়েছেন— নাটোর-২ আসনে বিএনপির প্রার্থী রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলু, পটুয়াখালী-১ আসনের জাতীয় পার্টির সদ্যবিদায়ী মহাসচিব এ বি এম রুহুল আমিন হাওলাদার, জাপার প্রেসিডিয়াম সদস্য বরিশাল-২ আসনের চিত্রনায়ক সোহেল রানা, বিএনপির ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন, কুড়িগ্রাম-৪ আসনের গণজাগরণ মঞ্চের মুখপাত্র ইমরান এইচ সরকার, নেত্রকোনা-১ আসনের সাবেক এমপি এম এ করিম আব্বাসী ও মেজর (অব.) মনজুর কাদেরসহ গতকাল দ্বিতীয় দিনে মোট ২৩৫ জন আপিল করেন। তিনটি আসনের সব কটিতে মনোনয়নপত্র বাতিল হওয়া কারাবন্দী বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার পক্ষে দ্বিতীয় দিনেও কোনো আপিল আবেদন হয়নি। দ্বিতীয় দিনে নির্বাচন কমিশন চত্বরে প্রতিটি বিভাগের জন্য আলাদা ৭টি বুথ স্থাপন করে নির্বাচন কমিশন। সিইসিসহ অন্য কমিশনাররাও আপিল বুথের কার্যক্রম পরিদর্শন করেন। এ ছাড়া দ্বিতীয় দিনে রংপুর বিভাগের ২৭, রাজশাহীর ২২, ঢাকার ৬৮, বরিশালের ১২, সিলেটের ১৫, ময়মনসিংহের ১৬, খুলনার ১৮ ও চট্টগ্রাম বিভাগের ৫৬টি আপিল জমা পড়েছে। এ ছাড়া বগুড়া-৪ আসনে বিএনপির প্রার্থী হাফিজুর রহমান দলটির আরেক প্রার্থী আক্তারুজ্জামানের মনোনয়নপত্র গ্রহণের বিরুদ্ধে আপিল করেছেন। ইসি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ৩০০ আসনে জমা পড়া ৩ হাজার ৬৫টি মনোনয়নপত্রের মধ্যে ৭৮৬টি বাতিল ঘোষণা করেন রিটার্নিং অফিসাররা। বাছাইয়ে উতরাতে পেরেছে ২ হাজার ২৭৯টি মনোনয়নপত্র। এর মধ্যে আওয়ামী লীগের ২৮১টির মধ্যে ৩টি, বিএনপির ৬৯৬টির মধ্যে ১৪১টি ও স্বতন্ত্র ৪৯৮টির মধ্যে ৩৮৪টি মনোনয়নপত্র বাতিল হয়েছে। আর জাতীয় পার্টির ৩৮টি মনোনয়নপত্র বাতিল হয়েছে। ৩০০ আসনের মনোনয়নপত্র বাছাই শেষে সোমবার দলভিত্তিক ও স্বতন্ত্র প্রার্থীদের এ তথ্য মিলেছে।
ইসি কর্মকর্তারা জানান, বাছাইয়ে বৈধভাবে মনোনীত প্রার্থীর মধ্যে আওয়ামী লীগের ২৭৮, বিএনপির ৫৫৫ ও জাতীয় পার্টির ১৯৫ জন রয়েছেন। মনোনয়নপত্র বাছাইয়ের পর ৩৯টি আসনে আওয়ামী লীগের ও ১০টি আসনে বিএনপির কোনো প্রার্থী নেই। বাছাইয়ে নতুন করে আওয়ামী লীগের ৩টি ও বিএনপির ৫টি আসন ফাঁকা হয়েছে।

নিরপেক্ষভাবে আপিল নিষ্পত্তি করবে ইসি : মাহবুব তালুকদার

গতকাল প্রার্থীদের আপিল গ্রহণ করা আট বিভাগের ডেস্কগুলো পরিদর্শন করেন নির্বাচন কমিশনার মাহবুব তালুকদার। পরে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ‘আপিলকারীদের প্রতি পক্ষপাতমূলক আচরণ করা হবে না। আমি মনে করি, ইসি সব ব্যাপারেই নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন করবে।’ মাহবুব তালুকদার বলেন, ‘কোনো কোনো ক্ষেত্রে একজন সাজাপ্রাপ্ত হন, পরে আবার তিনি খালাসও পান। সে ক্ষেত্রে ন্যায়বিচার বিষয়টি পুরোপুরি আপেক্ষিক। কোনটা ন্যায়বিচার আর কোনটা ন্যায়বিচার নয়, তার বিচারক তো আমি নই।’ উদ্দেশ্যমূলকভাবে মনোনয়নপত্র বাতিল করা হয়েছে কিনা এবং আপিলে কমিশন নিরপেক্ষতার পরিচয় দেবে কিনা— এ প্রশ্নে মাহবুব তালুকদার বলেন, ‘এ ব্যাপারে আমার এককভাবে কোনো বক্তব্য দেওয়ার কথা নয়। এভাবে বলে তো আর লাভ হবে না। যারা আপিল করেছেন বা করছেন, শুনানিতে তারা তাদের তথ্যগুলো উপস্থাপন করবেন।’ সাজাপ্রাপ্ত আওয়ামী লীগের প্রার্থী হাজী সেলিম ও পঙ্কজ দেবনাথ নির্বাচন করতে পারবেন কিনা— সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে এই কমিশনার বলেন, ‘এসব অভিযোগের প্রশ্নের উত্তর আমি এ মুহূর্তে দিতে পারি না।’ মনোনয়নপত্র অবৈধ ঘোষিত হওয়ার বিষয়ে এই কমিশনার বলেন, ‘যাদের যা কিছু অভিযোগ, লিপিবদ্ধ করে আমাদের এখানে দেবেন, তাদের প্রতিটি অভিযোগের বিষয়ে শুনানি করব। এরপর আমরা ব্যবস্থা নেব।’

দুলুর অভিযোগ : হাজী সেলিম, পঙ্কজ দেবনাথ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে পারলেও বিএনপি প্রার্থীরা কেন করতে পারবেন না— নির্বাচন কমিশনের (ইসি) কাছে এমন প্রশ্ন রেখেছেন বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলু। তিনি নাটোর-২ আসনে মনোনয়নপত্র জমা দিলে কনভিকশন আছে জানিয়ে রিটার্নিং কর্মকর্তা সেটি বাতিল করেন। গতকাল আগারগাঁওয়ের নির্বাচন ভবন চত্বরে মনোনয়ন ফিরে পেতে আপিল করতে এসে সাংবাদিকদের এসব কথা জানান তিনি। দুলু বলেন, ‘পূর্বপরিকল্পিতভাবে আমার মনোনয়নপত্র বাতিল করা হয়েছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘এবার বিএনপি নির্বাচনে যাওয়ার বিরাট অপরাধ করে ফেলেছে। আর এ কারণে যেসব প্রার্থী নিশ্চিত জয় লাভ করবেন পরিকল্পিতভাবে তাদের মনোনয়নপত্র বাতিল করা হয়েছে।’ তিনি বলেন, ‘আমার নাকি কনভিকশন আছে। এক বছর আগে আমি এটা সাসপেনশন করেছি। সাসপেনশন করলে নির্বাচন করতে কোনো সমস্যা নেই।’ গণমাধ্যমের মাধ্যমে আমি ইসিকে জিজ্ঞাসা করতে চাই উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘হাজী সেলিম সাহেব ১৩ বছরের জেল নিয়ে যদি নির্বাচন করতে পারেন, পঙ্কজ দেবনাথ আমার সঙ্গে দুই থেকে আড়াই বছর জেলে ছিলেন। দুদকের মামলায় তার ১২ বছরের জেল আছে। তাহলে পঙ্কজ দেবনাথ, হাজী সেলিম যদি নির্বাচন করতে পারেন। রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলু, ইকবাল হাসান টুকুসহ বিএনপি নেতারা কেন করতে পারবেন না?’

মুদ্রণ বিভ্রাট আওয়ামী লীগ প্রার্থীর : হলফনামায় মুদ্রণ বিভ্রাটের কারণে বাছাইয়ে বাদ পড়া কুড়িগ্রাম-৪ আসনের আওয়ামী লীগের মনোনয়নপ্রত্যাশী জাকির হোসেন তার প্রার্থিতা ফিরে পেতে আবেদন করেছেন। আপিল আবেদন জমা দিয়ে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমার কোনো খেলাপি ঋণ নেই, মামলা-মোকদ্দমা নেই। আয়কর দেখে হলফনামাটা করে দিতে বলেছিলাম উকিলকে। হলফনামায় প্রিন্টিং মিসটেক করেছেন। ৬, ৭ ও ৮ নম্বরে সিরিয়াল ভুল হয়েছে। আইনজীবী আর যে টাইপ করেছেন, তার ভুল। আমি নম্বরগুলো শুধু দেখেছিলাম, গ্রাউন্ডটা দেখিনি।’ এই ‘সামান্য ভুল’ নির্বাচন কমিশন বিবেচনা করবে বলে আশা প্রকাশ করেন জাকির। এ আসন থেকেই মনোনয়নপত্র বাতিল হয়েছে গণজাগরণ মঞ্চের মুখপাত্র ইমরান এইচ সরকারের। দুই প্রার্থীই একই সময়ে আপিল আবেদন করেন।

আদালতের আদলে শুনানি করবে ইসি : নির্বাচন কমিশনে আপিলের শুনানি শুরু হবে ৬ ডিসেম্বর বৃহস্পতিবার। চলবে ৮ ডিসেম্বর শনিবার পর্যন্ত। আগারগাঁওয়ের নির্বাচন ভবনের ১১ তলায় শুনানি হবে। ইতিমধ্যে শুনানির জন্য কক্ষ প্রস্তুত করা হয়েছে। সেখানে বিচারকের আসনসহ পক্ষ-বিপক্ষের আসনগুলোও প্রস্তুত করা হয়েছে। ইসি কর্মকর্তারা জানান, প্রার্থিতার বিষয়ে শুনানিতে আপিলকারীরা তাদের আইনজীবী নিয়ে আসতে পারবেন। সেখানে আদালতের বেঞ্চের মতো করেই তারা শুনানি করবেন।
সূত্র : বাংলাদেশ প্রতিদিন

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ