প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

পলিটিক্যাল চমক না ডিগবাজি ?

শাহীন কামাল: জাতীয় নির্বাচন এলেই আমরা অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করি চমক দেখব বলে। মূলত আদর্শহীন, স্বার্থপর, নিজ দল থেকে মনোনয়ন বঞ্চিত, ডিগবাজি খাওয়া নেতাদের রাতারাতি জার্সি বদলের মতো আদর্শ বদলে অন্যদলের সাথে মিলে যাওয়াকে ভদ্র ভাষায় চমক বলি আমরা। রাজনীতিবিদগণ ‘রাজনীতিতে শেষ বলে কিছু নেই’ মন্ত্রের মাধ্যমে নিজেরা এ কর্মটি বেশ সম্মানের সাথেই করেন। এতে কোন ব্যক্তিবিশেষ কিংবা দলের স্বার্থ রক্ষা হলেও সামগ্রিকভাবে রাজনীতি কলষিত হয়ে দিনে দিনে আদর্শহীন পর্যায়ে পৌঁছেছে।

স্বাধীনতার অব্যবহিত পরে জাতির জনককে হত্যার পর খন্দকার মোশতাকের মন্ত্রী সভায় যোগদানের মাধ্যমে আদর্শহীন, ক্ষমতা লোভী যে রাজনৈতিক সুবিধাবাদের ধারার সূচনা হয় কালে কালে তা বেড়েছে বৈকি। সামরিক শাসক জিয়াউর রহমান ও পরবর্তীকালে এরশাদের প্রায় সকল সহযোগীরাই ডিগবাজী খেয়ে খেয়ে রাজনৈতিক ফায়দা লুটেছেন। কেউ কেউ আজো রাজনীতিতে সুবিধাজনক অবস্থায় থেকে ঝোপ বুঝে কোপ মেরে নিজের ও পরিবারের জন্য ভেজালমুক্ত ভবিষ্যৎ রচনা করছেন।

৯০ পরবর্তী সময়ে এ দেশের রাজনীতিতে স্পষ্টতই আদর্শিক বিভাজন পরিলক্ষিত হলেও পরবর্তীতে শুধুমাত্র ক্ষমতার মোহে আদর্শের সাথে আপোষ করেছে বড় বড় রাজনৈতিক দলগুলো। এরশাদ সরকারের পতনের পরে ভোট কিংবা রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার লোভে পতিত স্বৈরশাসককে রাজনৈতিক কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ামক ভূমিকা পালন করতে দেখা যাচ্ছে বছরের পর বছর। নূর হোসেন আর ডাঃ মিলনের হত্যাকারী সেই স্বৈরাচার আজও রাজনৈতিক মাঠে দুর্দান্ত দাপুটে খেলোয়াড়। শুধুমাত্র রাজনৈতিক ফায়দার জন্য মীর শওকত, অলি আহমদ, মেজর হাফিজদের সাথে মেজর জিয়ার দলে স্বাধীনতাবিরোধী দল জামাত হয়েছিল রাজনৈতিক অংশীদার। স্বাধীনতার অব্যবহিত পরে ইনু আর মতিয়া চোধুরীর ভুমিকা আর বর্তমানে তাদের রাজনৈতিক অবস্থান অনেকের কাছে শুধু প্রশ্নই নয়, কৌতুহলও বটে।

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে রাজনৈতিক দলগুলো দৃশ্যমান দুই জোটে বিভক্ত হলেও দলগত ফরম বিক্রির উৎসব করেছে। জোটগত নির্বাচনে কেন্দ্র দলগুলো পূর্বনির্ধারিত বিভিন্ন জরিপে মনোনয়ন তালিকা করে এ আয়োজন কতটুকু ফলপ্রসূ তা বিবেচনার দাবী রাখে। মনোনয়ন জমাদান প্রক্রিয়া শেষ হলেও ভোট আর জোটের ফয়সালা হয়নি এখনো। আর তাতে বেশ কয়েকদিন ধরেই ডিগবাজি খেলা চলছে। শুধু ব্যক্তি নয়, দলীয় ডিগবাজিও আলোচনায় এসেছে। যেহেতু এখন পর্যন্ত প্রতীক বরাদ্দ হয়নি, জোট প্রধান দলগুলোকে ঘর ও সহযোগী দলগুলোর দিকে নজর রাখতে হচ্ছে।

পটুয়াখালী-৩ এর আওয়ামী লীগের সাবেক এমপি গোলাম মাওলা রনির বিএনপি থেকে মনোনয়ন নেয়াকে বড় চমক হিসেবে বিএনপি দেখলেও, অনেকের কাছে তা পলিটিক্যাল ডিগবাজি। জনাব রনির সাথে আওয়ামী লীগের দূরত্ব বেশ কয়েক বছরের। সাম্প্রতিককালে বিভিন্ন টকশোতে বিএনপি বিরোধী তার নানাবিধ কথা ও পত্রিকায় আদর্শিক কথা পরবর্তীতে হঠাৎ করে জার্সি বদলে সমালোচনায় পরেছেন তিনি। জনাব রনি অবশ্য রাজনৈতিক জীবনের শুরুতেই আলোচনায় আছেন, বিশেষ করে আওয়ামী লীগের পরীক্ষিত নেতা, সাবেক প্রতিমন্ত্রী এবং ছাত্রলীগের সাবেক সফল সাধারণ সম্পাদক আ খ ম জাহাঙ্গীরকে পরাজিত করে কিভাবে ২০০৮ সালে নৌকার মাঝি হয়েছেন তা আজো অনেকের কাছে কৌতূহলের বিষয়। এমপি নির্বাচিত হয়ে সরকারি জমি দখল ও সাংবাদিক নির্যাতন বিষয়ে ব্যাপক আলোচিত সমালোচিত হয়েছিলেন তিনি।

নিকট অতীতে বেশ কয়েকটি পলিটিক্যাল ডিগবাজী আমাদের রাজনীতিবিদদের চরিত্র উম্মোচন করেছে। নাছির উদ্দিন পিন্টু বিএনপি মনোনয়ন পাওয়ায় তৎকালীন বিএনপি নেতা মনোনয়ন বঞ্চিত হাজী সেলিম রাতারাতি নৌকার টিকেট পান। ধীরেন্দ্রনাথ সাহা তো নৌকা না পেয়ে সোজা বিএনপি অফিসে। এমপিও হয়েছিলেন। ১৯৯৬ এর সংসদে বিএনপি দলীয় এমপি জনাব স্বপন ও জনাব আলাউদ্দিন ফ্লোর ক্রস করে এমপি পদ হারান। উপনির্বাচনে নৌকায় চড়ে পরে মন্ত্রীও হয়েছিলেন।

ডিগবাজীর অতীত সকল রেকর্ড ভঙ্গ হয়েছে এবার। শুধু ব্যক্তি নয়, দলও নিজেদের মত, দীর্ঘদিনের লালিত আদর্শ বিসর্জন দিয়ে ক্ষমতার লালসায় বিপরীত মেরুর আদর্শের সাথে ঐক্য করেছে। দীর্ঘকাল আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে বেড়ে উঠা ডঃ কামাল হোসেনের নেতৃত্বে গড়া ঐক্যফ্রন্ট বিএনপি- জামাতের সাথে কিভাবে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়ন করবেন, তা বোধগম্য নয়। আওয়ামী চেতনায় রাজনৈতিক জীবন গড়া মান্না, সুলতান মনসুর, অধ্যাপক আবু সাঈদ জামাত বিএনপির সাথে বঙ্গবন্ধুর চেতনার কথা বললে কতটুকু বিশ্বাসযোগ্যতা পাবে? আজীবন আওয়ামী লীগের আদর্শের ফেরিওয়ালারা কিভাবে জনগণের কাছে আওয়ামী বিরোধী ভোট চাইবেন? আ স ম আব্দুর রব কী সত্যিকার অর্থেই জামাতের সাথে এক চেতনায় আসতে পারবেন? বীর মুক্তিযোদ্ধা কাদের সিদ্দিকীর আওয়ামী বিরোধী জোটে অংশগ্রহণ আলোচনার দাবী রাখে, যদিও ইতোমধ্যে তার মনোনয়ন বাতিল হয়েছে। আজীবন বঙ্গবন্ধুর চেতনা লালন করা জনাব সিদ্দিকী কি ১৫ আগষ্ট জোট প্রধানের জম্মদিন উৎযাপন করবেন নাকি পিতা হারানোর শোকে বিহ্বল হবেন! বিএনপি থেকে সকল সুযোগ সুবিধা নিয়ে সর্বোচ্চ লাভবান ডাঃ বি চৌধুরী সাহেবের সাথে মহাজোটের এই ঐক্য ক্ষমতার ভাগ ছাড়া আর কি? যে কিনা ঐক্যফ্রন্টে থাকার শেষ চেষ্টা করেছিলেন। জাতীয় পার্টি সংশ্লিষ্ট কয়েকটি ইসলামী দলের সাথে ইনু-মেনন সাহেবের একত্রিত হওয়া শুধুই ক্ষমতার অংশিদার ছাড়া ভিন্ন কী! বিএনপিতে জীবন কাটিয়ে শমসের মবিন চৌধুরীর বিকল্প রাজনৈতিক পথে হাঁটা ডিগবাজী ছাড়া অন্য কিছু নয়।

জনসেবা তথা দেশ সেবার মহান ব্রত নিয়ে যে রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গ আদর্শিক বার্তা বহন করেন, শুধুমাত্র মনোনয়ন প্রত্যাশায় তা যদি হাওয়ায় মিশে যায়, তবে তা জাতির জন্য অশনিসংকেত। যারা দেশের নীতিনির্ধারক, তারাই যদি নীতি আদর্শের কাছে হেরে যান, তবে তার পরিণাম জাতিকে বহন করতে হবে সূদীর্ঘকাল। দল ও আদর্শ পরিবর্তনের অধিকার সংবিধান সকল নাগরিকের জন্যই সংরক্ষণ করে। রাজনীতিবিদদের জন্য এর ব্যত্যয় নয়। কিন্তু তা যদি শুধুমাত্র মনোনয়ন কেন্দ্রিক হয়, তবে কথা তো উঠবেই।

লেখক : প্রভাষক, ইংরেজি বিভাগ, নাজিউর রহমান কলেজ, ভোলা।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ