প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

টার্গেট করে বিএনপির জনপ্রিয় নেতাদের মনোনয়ন বাতিল করা হয়েছে?

বিভুরঞ্জন সরকার : একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিন হাজারের বেশি প্রার্থী মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছিলেন। বিএনপিই তিনশ আসনে মনোনয়ন দিয়েছিলো আটশজনকে। যাচাইবাছাইয়ে বাদ পড়েছেন সাতশ ছিয়াশিজন প্রার্থী। এর মধ্যে স্বাভাবিকভাবেই ধানের শীষের প্রার্থীর সংখ্যা বেশি। বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া তিনটি আসনে মনোনয়পত্র জমা দিয়েছিলেন, তিনটিতেই তার মনোনয়ন বাতিল হয়েছে। এটাও অপ্রত্যাশিত ছিলো না। সেজন্য বিকল্প প্রার্থী রাখা হয়েছিলো। তারপরও মোট ছয়টি আসনে বিএনপির কোনো প্রার্থী নেই। একাধিক প্রার্থী দিয়েও তাদের শেষ রক্ষা হয়নি। বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী অভিযোগ করেছেন, টার্গেট করে বিএনপির জনপ্রিয় ৫০জন সাবেক এমপির মনোনয়ন বাতিল করা হয়েছে। রিজভীর বক্তব্য সত্য বলে ধরে নিলে প্রশ্ন আসে, বিএনপির বাকি প্রার্থীরা কি তাহলে অজনপ্রিয়?

যাদের মনোনয়ন বাতিল হয়েছে, তাদের সবারই মনোনয়ন বাতিলযোগ্য কিনা সে প্রশ্ন উঠতে পারে। কারণ দুয়েকটি ক্ষেত্রে দেখা গেছে, খুব তুচ্ছ কারণেই প্রার্থিতা বাতিল হয়েছে। তাছাড়া বাতিলের তালিকায় বিএনপি, ২০-দলীয় জোট, ঐক্যফ্রন্ট এবং আওয়ামী লীগের ‘বিদ্রোহী’ প্রার্থীদের নাম থাকলেও আওয়ামী লীগের একজন অফিসয়াল প্রার্থীরও নাম নেই। এটা বিস্ময়কর এবং সন্দেহজনক।

বিএনপি চেয়ারপারসনের প্রার্থিতা বাতিল সম্পর্কে রিজভী বলেছেন, বেগম জিয়ার ব্যাপক জনপ্রিয়তা দেখে বিচলিত হয়েই তাকে নির্বাচন থেকে দূরে সরানোর মাস্টারপ্ল্যান করেছে সরকার।

দ-িতরা নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে পারবেন না এটা আদালতের নির্দেশ। এতে সরকারের কোনো হাত থাকার কথা নয়। সরকার আদালত নিয়ন্ত্রণ করছে, এটা যদি মেনে নিতে হয় তাহলে প্রশ্ন আসে বিএনপি নেতারা কেন আদালতের বারান্দায় সময় ব্যয় করছেন? আদালতকে অভিযুক্ত করে বিএনপি খুব সুবিবেচনার পরিচয় দিচ্ছে বলে মনে হয় না। কোনো রায় বিরুদ্ধে গেলেই তার পেছনে সরকারের হাত খোঁজা একটি খারাপ প্রবণতা। বিচার ব্যবস্থার প্রতি মানুষকে আস্থাহীন করে তোলার পরিণাম কারও জন্যই ভালো হতে পারে না।

নির্বাচনী প্রতিযোগিতায় বিএনপি এবং তাদের জোট-ফ্রন্ট সুবিধাজনক অবস্থায় নেই এটা নতুন কথা নয়। তারপরও তারা নিজেদের মধ্যে কলহ-বিরোধ মিটিয়ে নির্বাচনের মাঠে ঐক্যবদ্ধভাবে নামতে পারছে না। জোট-ফ্রন্টের সঙ্গে আসন ভাগাভাগির ফয়সালা এখনো বিএনপি করতে পারেনি। বলা হচ্ছে, মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের শেষ দিন অর্থাৎ নয় ডিসেম্বর পর্যন্ত এজন্য অপেক্ষা করতে হবে। কিন্তু অনেকেরই আশঙ্কা বিএনপি যাদের হাতে মনোনয়নপত্র তুলে দিয়েছে তাদের সবাইকে প্রত্যাহারে বাধ্য করতে পারবে না। ফলে জটিলতা থেকেই যাবে। ড. কামাল হোসেন যে উৎসাহ-উদ্দীপনা নিয়ে ঐক্যফ্রন্টকে বিএনপির সঙ্গে সামিল করেছিলেন, তাতেও কিছুটা যেন ভাটার টান লক্ষ করা যাচ্ছে। বিএনপির জামায়াত-নির্ভরতা সম্ভবত ড. কামালকে হতাশ করেছে।

২০-দলীয় জোটের সমন্বয়ক এলডিপি প্রধান কর্নেল (অব.) ড. অলি আহমদ বলেছেন, যেভাবে অত্যাচার-নির্যাতন হচ্ছে তাতে শেষ পর্যন্ত নির্বাচনে টিকে থাকা সম্ভব না-ও হতে পারে। এ ধরনের বক্তব্য ভোটের মাঠে কর্মী-সমর্থকদের উৎসাহিত করবে বলে মনে হয় না। বিএনপি নেতারা একদিকে বলছেন, পরিস্থিতি যা-ই হোক না কেন, তারা শেষ পর্যন্ত ভোটযুদ্ধে থাকবেন। আবার তারা বা তাদের সঙ্গী-সাথীরাই নানা ধরনের শঙ্কার কথাও প্রচার করছেন। একদিকে বলছেন, সরকারের পায়ের নিচে মাটি না থাকায় নির্বাচন বন্ধের পাঁয়তারা করছে, অন্যদিকে তারাই নির্বাচনে থাকা যাবে কিনা তা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করছেন। এ ধরনের দোদুল্যমানতা সরকাররের অবস্থানকেই শক্তি যোগাবে।

জোট-মহাজোটের প্রার্থিতা নিয়ে আওয়ামী লীগও যে কিছুটা অস্বস্তিতে নেই, তা নয়। বিশেষ করে জাতীয় পার্টিকে নিয়ে আওয়ামী লীগের সমস্যা আছে। আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেছেন, জরিপ অনুযায়ী জনপ্রিয়তার বিচারে যারা বিজয়ী হওয়ার যোগ্য তাদেরই দল বা জোটের মনোনয়ন দেয়া হবে। দুর্বল প্রার্থীকে মনোনয়ন দিয়ে পরাজয়ের ঝুঁকি নিতে আমরা রাজি নই।

তার এই বক্তব্য নিয়ে দ্বিমত, বিতর্ক করার সুযোগ আছে। আওয়ামী লীগ দলীয়ভাবে যাদের মনোনয়ন দিয়েছে তারা সবাই ‘জনপ্রিয়’ নন। জাতীয় পার্টির বর্তমান সংসদ সদস্যদের কয়েকজনের মনোনয়ন না পাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। জাতীয় পাটির্ যদি হতাশ হয়ে জোটের সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে তাহলে ভোটারদের মধ্যে বিরূপ বার্তা যাবে। এদিকে, জাতীয় পার্টির মধ্যে সংকট বেড়েছে বলে মনে হচ্ছে। ঋণ খেলাপির অভিযোগে দলের মহাসচিব রুহুল আমিন হাওলাদারের প্রার্থিতা বাতিল হওয়ায় তিনি নির্বাচন থেকে ছিটকে পড়েছেন। একইসঙ্গে মনোনয়ন বাণিজ্যের অভিযোগে তিনি দলের মহাসচিব পদও হারিয়েছেন। জাতীয় পার্টির নতুন মহাসচিব হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন রংপুরের মশিউর রহমান রাঙা। দলের চেয়ারম্যান, মহাসচিব দুজনই এখন রংপুরের। এটা নিয়েও রাজনীতিতে মুখরোচক কথা হবে।

নির্বাচনে যারা প্রতিন্দ্বন্দ্বিতা করছেন, তারা হলফনামায় যেসব তথ্য দিয়েছেন তাও কম কৌতূহলোদ্দীপক নয়। অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যাচ্ছে প্রার্থীর চেয়ে তাদের স্ত্রীরা বেশি সম্পদশালী। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কেউ কেউ রসিকতা করে প্রশ্ন করছেন, এই সব সম্পদশালী নারীরা কেন সম্পদহীন রাজনীতিবিদদের বিয়ে করেছেন! আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের থাকেন স্ত্রীর বাড়িতে, আর বিএনপি মহাসচিব স্ত্রীর দেওয়া গাড়িতে চড়ে বেড়ান। দেশের অন্যতম ধনাঢ্য ব্যক্তি বলে পরিচিত, ব্যবসায়ী-শিল্পউদ্যোক্তা সালমান এফ রহমানের বাড়ি-গাড়ি-আসবাবপত্র কিছুই নেই! আবার এটাও দেখা যাচ্ছে যে, সরকারি দলে থেকে আওয়ামী লীগের অনেকেরই যেমন অর্থ-সম্পদ বেড়েছে, তেমনই যে কারণেই হোক না কেন, বিএনপি প্রার্থীদেরও সম্পদ কমেনি।

নির্বাচনী প্রচারণা জমে উঠলে আরও নানান রসাত্মক ও ব্যাঙ্গাত্মক তথ্যাদি ভোটারদের কাছে পৌঁছবে। সবকিছু বিচার-বিবেচনা করেই ভোটাররা ভোট দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেবেন। ভোটের ফলাফলই প্রমাণ করবে কে বা কারা সত্যিকার অর্থে জনপ্রিয়। ৩০ ডিসেম্বর পর্যন্ত অপেক্ষার পালা।

লেখক : গ্রুপ যুগ্ম সম্পাদক, আমাদরে নতুন সময়

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ