Skip to main content

প্রাচ্য-প্রতীচীর পথে প্রান্থরে: কৈনোবুরী আর উষ্ণ প্রসবন

ডঃ শোয়েব সাঈদ : ঘন বসতিপূর্ণ টোকিও থেকে গহীন গ্রামাঞ্চল, সর্বত্রই জাপানের ট্র্যাডিশনাল বাড়িগুলোর দিকে যদি তাকান দেখতে পাবেন তিনটি জিনিস; গাছ, পাথর আর বাড়ীর আঙ্গিনায় পানির ছোট প্রবাহ। আর এই তিনটি জিনিস হচ্ছে জাপানি সমাজ আর সংস্কৃতির গভীরে প্রোথিত এবং বিকশিত একটি প্রতীক যা দীর্ঘায়ু আর প্রকৃতির সাথে সম্প্রীতির সেতুবন্ধনকে নির্দেশ করে। বাড়ির ছোট পানির প্রবাহে এরা জাপানিতে কৈ হিসেবে পরিচিত (আমাদের কৈ মাছ নয় বরং রুইয়ের মত) কার্প জাতীয় মাছ পালন করে। এই কৈ মাছের বৈশিষ্ট্য হচ্ছে এরা স্রোতের বিপরীতে সাঁতরিয়ে এগিয়ে যায় অর্থাৎ প্রতিকূলতাকে জয় করেই অগ্রসর হয়। কোন বাড়িতে ছেলে সন্তান হলে কাপড়ের তৈরি কৈ মাছের আকৃতির বিশাল বাতাস মোজা বা উইন্ড সোক উড়তে দেখা যায় প্রতিকূলতাকে জয় করবার প্রত্যাশার প্রতীক হিসেবে। এটিকে বলে কৈ নোবুরি। জাপানের গ্রামাঞ্চলে শীতের জড়তা কেটে যাবার পর কৈ নোবুরি প্রদর্শনী একটি দৈনন্দিন দৃশ্য। কোন বাড়িতে মেয়ে হলে হীনা নিঙ্গিউ বা হীনা পুতুলের সমারোহে বাড়ীকে সাজানো হয়। জাপানিদের বাড়ীতে হীনা পুতুলের জন্যে বিশেষ কর্নার থাকে। হীনা পুতুল জাপানি উপহার সংস্কৃতিরও প্রতীক। প্রেসিডেন্ট জন এফ কেনেডির কন্যা ক্যারোলিন কেনেডির জন্যে উপহার হিসেবে হীনা পুতুল পাঠানো হয়েছিল। ক্যারোলিন কেনেডি জাপানে যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত থাকার সময় ছোট বেলার পুতুলগুলো সঙ্গে নিয়ে যান এবং কোন এক মার্চ মাসে জাপানে হীনা পুতুলের উৎসবে পুতুলগুলো প্রদর্শন করেন। প্রাযুক্তিক উৎকর্ষতার সাথে ট্র্যাডিশন আর প্রকৃতির এই সেতুবন্ধন জাপানকে নিঃসন্দেহে অন্যান্য উন্নত দেশগুলো চেয়ে ভিন্নতর বিশেষত্ব দিয়েছে। নদী মাতৃক বাংলাদেশের মতই নদী সংস্কৃতি জাপানি সভ্যতায় গুরুত্বপূর্ণ এক উপাদান। জাপানের প্রায় প্রতিটি শহরেই নদী পাবেন। আমার বিশ্ববিদ্যালয়টি যে শহরে ছিল তার মাঝখান দিয়ে বয়ে গেছে জাপানের ষষ্টতম দীর্ঘ নদী তেনরিওগাওয়া। এই নদীটির জন্যেই ইনা শহরটিকে বলা হয় মাহোরা ইনা বা রূপসী ইনা। তেনরিওগাওয়া ইনার পাশের সুয়া শহরের সুয়া লেক থেকে উৎপত্তি হয়ে ভারত মহাসাগরের ফিলিপাইন সী তে পতিত হয়েছে। ইনা শহরটি মূলত একটি ভ্যালি অর্থাৎ পাহাড় ঘেরা। লোকজ বিশ্বাসে জাপানে পাহাড়কে মনে করা হয় স্বর্গে যাবার সিঁড়ি। প্রায় পঞ্চাশ হাজার জনসংখ্যার ইনা শহরটির গোড়াপত্তন হয়েছে ১৯৫৪ সালে যা শিনশু বলে পরিচিত জাপানের নাগানো জেলা বা প্রিফেকচারে অবস্থিত। শীতকালীন অলিম্পিকখ্যাত জাপানের নাগানো প্রিফেকচারকে বলা যায় প্রকৃতির নন্দনকানন। মাউন্ট ফুজি (৩৭৭৬ মিটার) বাদে জাপানের ১০টি বড় পাহাড়ের অধিকাংশই এই নাগানো বা নাগানো সংলগ্ন এলাকায় অবস্থিত যাদের উচ্চতা ৯০০০ ফুটের বেশী। সাতটি বছর কাটিয়েছি মায়াবী প্রকৃতির দৃষ্টিনন্দ এই দৃশ্যপটে। নাগানোতে ঘরের জানালা খুললে প্রথম দৃষ্টিটা যেন জাতীয় কবি নজরুলের গানের অনুরণন “আকাশে হেলান দিয়ে পাহাড় ঘুমায় ওই”। জাপানের দ্বিতীয় উঁচু পাহাড় হচ্ছে মাউন্ট কিতাডাকে (৩১৯৩ মিটার) আর তৃতীয়টি হচ্ছে মাউন্ট হোতাকা (৩১৯০ মিটার)। জাপানি সংস্কৃতির একটি প্রচলিত খারাপ প্রবণতা হচ্ছে সংখ্যা দিয়ে অর্থাৎ এক নম্বর, দুই নম্বর (ইচিবান, নিবান) এভাবে মূল্যায়ন করা বা প্রতিযোগিতা করা। কথিত আছে মাউন্ট হোতাকা এলাকার বাসিন্দারা মাটি দিয়ে ৪ মিটার উঁচু করে এটিকে দ্বিতীয় স্থানে নিয়ে যাবার বিফল প্রচেষ্টা চালিয়েছিল। জাপান সার্ভে বিভাগ এই ধরণের অসুস্থ প্রতিযোগিতায় সায় দেয়নি। জাপানি সংস্কৃতির আরেক অবিচ্ছেদ্য অংশ হচ্ছে ওনসেন বাংলায় যাকে বলে উষ্ণ প্রসবন বা ইংরেজিতে হটস্প্রিং। জাপানের মোট ভূখণ্ডের ৭০ শতাংশ হচ্ছে পাহাড় আর পর্বত যা থেকে জন্ম হয়েছে অসংখ্য উষ্ণ প্রসবনের। নাগানো উষ্ণ প্রসবন সমৃদ্ধ একটি জেলা যার আনাচে কানাচে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে পর্যটকবান্ধব অনেক ওনসেন টাউন। ওনসেন বা উষ্ণ প্রসবনের জন্যে বিখ্যাত শিবু, হাকুবা, শিগা, নোজাওয়া, কারুইজাওয়া হচ্ছে নাগানোর অন্যতম টুরিস্ট আকর্ষণ। উষ্ণ প্রসবন হচ্ছে মাটির গভীর থেকে প্রাকৃতিকভাবে তৈরি হওয়া গরম পানির প্রবাহ। তপ্ত আগ্নেয় শীলা, ম্যাগমা ইত্যাদির সংস্পর্শে বা এগুলির আশপাশ দিয়ে প্রবাহিত পানি উত্তপ্ত হয়ে উষ্ণ প্রসবন সৃষ্টি করে। জাপানের পাশাপাশি নিউজিল্যান্ড, ইটালি, আইসল্যান্ড আর যুক্তরাষ্ট্রের ইয়েলোস্টোন পার্ক উষ্ণ প্রসবনের জন্যে বিখ্যাত। ব্লু লেগুন আইসল্যান্ডের বিখ্যাত একটি উষ্ণ প্রসবন। ইয়েলোস্টোন পার্কের গাইযার বা উৎক্ষেপিত উষ্ণ প্রস্রবণ বিশ্বখ্যাত। উষ্ণ প্রস্রবণে ধারণকৃত ভূ-তাপীয় শক্তি আইসল্যান্ডের অন্যতম এনার্জি উৎস। উষ্ণ প্রস্রবণের পানি ইনডোরে আটকিয়ে গোসল করার ব্যবস্থাকে জাপানে বলে ওনসেন বাথ। আউটডোরের উষ্ণ প্রস্রবণকে জাপানে বলা হয় রতেনবুরো। অর্থাৎ রতেনবুরো হচ্ছে ওনসেনের আরেকরূপ যার অবস্থান উন্মুক্ত আকাশের নীচে মূলত পাহাড়ের চুড়ার দিকে প্রাকৃতিক পরিবেশে। শীতকালে তুষারপাতের সময় রতেনবুরোর সচরাচর দৃশ্যটি হচ্ছে গরম পানিতে শরীরটি ডুবিয়ে একদিকে রিলাক্স করছেন অপরদিকে মাথায় তুষার জমা হচ্ছে। রতেনবুরোর আসল মজাটাই হচ্ছে শীতকালে। তুষার আর বরফ পিচ্ছিল রাস্তা ঠেলে পাহাড়ি নির্জনতায় মন মাতানো কাষ্ঠশৈলীর কোন পেনশন বা ছোট মোটেলে রাত্রিযাপন জাপানিদের খুব পছন্দের। এমন জাপানি খোঁজে পাওয়া মুস্কিল যার ওনসেন বাথের অভিজ্ঞতা নেই। ওনসেনে কাপড় পরে নামা চরম অভদ্রতা। নগ্ন হয়ে নামাটাই সংস্কৃতি। এই নগ্নতা নিয়ে কারো মাথাব্যাথা নেই এবং এই অবস্থায় একে অপরের দিকে তাকানো অভদ্রতা হিসেবেই বিবেচিত হয় এবং জাপানিরা তাকানো কথা ভাবতেও পারেনা। জাপানিরা ইউরোপীয়দের মত এতটা খোলামেলা নয়, ফলে ছেলে এবং মেয়ের ওনসেন আলাদা আলাদা। তবে প্রাইভেট ওনসেনে একই পরিবারের সদস্য হলে ছেলেমেয়ে একসাথে নামা যায়। নগ্নতার এই দ্বিধার সাথে অনেক নন-জাপানীদের বিশেষ করে আমাদের সংস্কৃতির লোকজনকে বড় ধরণের আপোষ করতে হয়। ছোট টাওয়েল কোমরে জড়িয়ে পানিতে নেমে টাওয়েলটি তৎক্ষণাৎ মাথায় উঠিয়ে রেখে একই কায়দায় উঠার সময় আবার কোমরে জড়িয়ে নিয়ে সবদিক রক্ষা করতে হয়। বাচ্চাদের নিয়ে নামলে চুপিচুপি বলে দিতে হয় বাবা কাউকে বিশেষ করে দেশে গেলে কাউকে বলো না। ভূ-তাপীয় শক্তির প্রভাবে কোন কোন উষ্ণ প্রসবনের পানির তাপমাত্রা ফুটনাংকের কাছাকাছি পৌঁছে যেতে পারে, তখন ঠাণ্ডা পানির প্রবাহে সহনশীল মাত্রায় আনতে হয়। সাধারণত ওনসেনের পানির তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রী সেন্টিগ্রেড থাকে। নাগানোর দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর মাতসুমোতোর নিকটবর্তী নির্জন পাহাড়ের চূড়ায় শিরাহোনে(সাদা হাড্ডির উষ্ণ প্রসবন) ওনসেনের রিওকান/মোটেলে জাপানী ফ্যামিলি ফ্রেন্ড ডাঃ ইয়োকোহামার পরিবারের সাথে সপরিবারে রাত্রি যাপনের সুযোগ হয়েছিল। ডাঃ ইয়োকোহামার সাথে আমার পরিচয় ইনা হাসপাতালে আলসারের এন্ডোস্কপি করতে গিয়ে। শিনশুতে অধ্যয়নকালীন সময়ে একাধিক বার হেলিকোব্যাকটার পাইলোরির কারণে আলসারে আক্রান্ত হই। এসিডিটি নয়, আলসারের মূল কারণ পাকস্থলীর ইনার লাইনিং এর নীচে সচরাচর নীরবে নির্দোষভাবে বসে থাকা ব্যাকটেরিয়া হেলিকোব্যাকটার পাইলোরির হঠাৎ আগ্রাসনে সৃষ্ট ইনফেকশন এবং অস্ট্রেলিয়ার এক বিজ্ঞানীর এই আবিষ্কার অবশেষে নোবেল প্রাইজে স্বীকৃত। দূষিত পানি পান হেলিকোব্যাকটার পাইলোরির মূল উৎস। যাক প্রসঙ্গে ফিরে আসি, ডাঃ ইয়োকোহামা শুধু ডাক্তার নন, সমসাময়িক বিশ্ব পরিস্থিতি, ইতিহাস নিয়ে অগাধ জ্ঞান রাখেন ফলে ধীরে ধীরে সখ্যতা থেকে পারিবারিক বন্ধুত্ব। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী জাপানি অর্থনীতির কঠিন সময়ে ইয়োকোহামার বেঁড়ে উঠা। চা পান করে ক্ষুধা নিবারণ কিংবা একটি আপেল দিয়ে দিন পার করার কঠিন সময়ে উনারা ছাত্রজীবন পার করেছেন, ডাক্তারি পড়েছেন। ওনসেনে যাওয়া হয়েছে অনেকবার তবে ডাঃ ইয়োকোহামার বন্ধু বাৎসল্যে আর সান্নিধ্যে তুষারাবৃত পাহাড়ের চূড়ায় নির্জন পরিবেশে তুষার, ওনসেন/রতেনবুরো আর জাপানি খাদ্য ঐতিহ্য সহযোগে প্রচণ্ড শীতের নির্জনতা আর নিস্তব্ধতাকে প্রকৃতির কোলে প্রাণভরে উপভোগ করাটা একেবারেই অন্যরকম এক ভাললাগার অনুভূতি। খনিজ দ্রব্যের তারতম্যের কারণে একেক ওনসেনের পানির রং আর স্বাদ একেকরকম। জাপানের উত্তর আল্পসের দুধ বর্ণের পানির শিরাহোনে ওনসেনের ঐতিহ্য প্রায় ৬০০ বছরের। দুগ্ধ বর্ণের পানির মেকানিজমটি হচ্ছে অক্সিজেনের সংস্পর্শে হাইড্রোজেন সালফাইড আর ক্যালসিয়ামের দ্রবণের মিশ্রনজনিত বিক্রিয়া। ক্রনিক ফেটিগ, স্ট্রেস, পেটের পীড়া, গাইনী সমস্যার জন্যে এই পানির ফলদায়ক ইমেজ রয়েছে। নাগানোর অন্যতম আরেকটি বিখ্যাত ওনসেন হছে “শিবু ওনসেন” যার খ্যাতি বানরের উষ্ণ প্রসবনরূপে। মানুষের উষ্ণ প্রস্রবণের পাশাপাশি বানরের উষ্ণ প্রস্রবণে অসংখ্য বানরের গোসল করার দৃশ্যটি সম্ভবত পৃথিবীর অন্য কোথাও দেখা যায় না। মা বানর পরম মমতায় বাচ্চাদের নিয়ে ওনসেনের গরম পানিতে চুপচাপ রিল্যাক্স করার দৃশ্যটি মানবকূলের আরামপ্রিয়টাকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ করার মতই। তবে এই চ্যালেঞ্জ শান্তিপ্রিয় সহবস্থানের। বানরের সাথে বাঁদরামি না করলে ওরাও মানুষকে জ্বালায় না বরং নিজের মত করেই থাকতে পছন্দ করে, নিজেদের রতেনবুরোতেই রিল্যাক্স করে, লাফালাফি করে, মানুষের উষ্ণ প্রসবন থেকে দূরে থাকে। সিলিকন, আয়রন, ক্যালসিয়াম, সালফার বিবিধ খনিজের আধিক্যে বা মিশ্রণে বিভিন্ন বর্ণের আর স্বাদের অসংখ্য উষ্ণ প্রসবন ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে জাপানের উত্তরের হোক্কাইডো থেকে দক্ষিণের কাগোশীমা পর্যন্ত। উষ্ণ প্রসবন বা ওনসেন প্রিয় এই জাতির মধ্যে ওনসেন পাগল এমন মানুষও পাবেন যারা পানির গন্ধ দিয়ে বলে দিতে পারে পানিটি কোন অঞ্চলের বা কোন ওনসেন/উষ্ণ প্রস্রবণের। জাপানের শীর্ষস্থানীয় পর্যটন সিটি পশ্চিম জাপান/কিয়শুর বিশ্বখ্যাত ওনসেন শহর বেপ্পুতে স্যান্ড বাথ বা সুনামুসি অর্থাৎ বালির নীচে শরীর ডুবিয়ে উষ্ণতাকে উপভোগ করা নিয়ে আরেকটি এপিসোডে বিস্তারিত থাকবে।

অন্যান্য সংবাদ