Skip to main content

হারিয়ে গেলেন ধ্রুপদী ক্যামেরা-শিল্পী আনোয়ার হোসেন

শেখ মিরাজুল ইসলাম : ১ ডিসেম্বর নীরবে চলে গেলেন বাংলাদেশের অন্যতম যুগ সেরা আলোকচিত্রী ও সিনেমাটগ্রাফার আনোয়ার হোসেন। পুরানো ঢাকায় জন্ম নেয়া এই ক্যামেরা-শিল্পীর বয়স হয়েছিলো ৭০ বছর। ক্যামেরা হাতে ফটোগ্রাফি জগতে পঞ্চাশ ও চলচ্চিত্র জগতে কাটিয়েছিলেন চল্লিশটি বছর। মুক্তিযুদ্ধেও অংশ নিয়েছিলেন ক্যামেরা হাতে। কাকতালীয় ব্যাপার হলো, একই দিনে বিদায় নিয়েছেন আরেক বীর মুক্তিযোদ্ধা তারামন বিবি। চিত্রগ্রাহক হিসেবে আনোয়ার হোসেন কাজ করেছেন হাতে-গোনা পনেরোটি চলচ্চিত্রে। কিন্তু প্রতিটি কাজই নতুন প্রজন্মের জন্য শিক্ষণীয় হয়ে আছে। এর মধ্যে পাঁচবার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পেয়েছেন সূর্য দীঘল বাড়ি (১৯৭৯), এমিলের গোয়েন্দা বাহিনী (১৯৮০), পুরস্কার (১৯৮৩), অন্য জীবন (১৯৯৫) ও লালসালু (২০০১) ছবির জন্য। এছাড়াও ক্যামেরার পেছনে কাজ করেছেন হুলিয়া (১৯৮৪), দহন (১৯৮৫), মিস লঙ্কা (১৯৮৫), চাকা (১৯৯৩), নদীর নাম মধুমতি (১৯৯৪), চিত্রা নদীর পাড়ে (১৯৯৯), শ্যামল ছায়া (২০০৪), কাজলের দিনরাত্রি (২০১৩) ’র মতো ধ্রুপদী চলচ্চিত্রে। ২০০১ সাল থেকে আনোয়ার হোসেনের সাথে ব্যক্তিগত পর্যায়ে বন্ধুত্বের সম্পর্ক সূত্রে দেখেছি, অসংখ্য জাতীয় ও আন্তর্জাতিক মানের পুরস্কার পাবার পরও যতোটুকু উচ্চকিত অবস্থানে তার থাকার কথা ছিলো তা অর্জন করলেও এক গোপন বেদনা নিয়ে তিনি পথ চলতেন। কারণ শিল্পী হিসেবে ছিলেন কাজের ক্ষেত্রে উচ্চাভিলাষী। কোনো এক অবস্থানে তিনি থিতু হতে চাননি। কোনো কাজ তার মনের মতো না হলে বেঁকে বসেন। নিজস্ব ঘরাণার কাজের ব্যাপারে তার অভিযোগ, অসন্তুষ্টি, অভিমানের ভাষা বোঝা নতুন প্রজন্মের নির্মাতাদের জন্য ছিলো কঠিন বিষয়। সব সময় তার ভেতরে অনেক কিছু করতে না পারার এক অব্যক্ত যন্ত্রণা ছিলো। একই সাথে প্রাপ্তির বিপরীতে দেশ ও সমাজ নিয়ে হতাশা তাকে কুরে কুরে খেতো। চিত্রনির্মাতাদের প্রতি ছিলো বুক ভরা অভিমান কেন তারা একজন আনোয়ার হোসেনকে বাদ দিয়ে বাইরের দেশ থেকে এনে ক্যামেরাম্যানকে অনেক টাকায় কাজ করাচ্ছেন? কেন তার এক সময়ের পরিচিত নির্মাতারা অনেক টাকার অনুদান পেয়েও আনোয়ার হোসেনের মতো ক্যামেরাম্যানদের দূরে সরিয়ে রাখছেন? কেন অযোগ্য ব্যক্তিরা ফটোগ্রাফি বা চিত্রগ্রহণের উপর সার্টিফিকেট দিচ্ছেন কিন্তু আনোয়ার হোসেনকে কেউ স্মরণ করছে না? কেন মুক্তিযুদ্ধে জীবনবাজি রেখে ছবি তুললেও রাষ্ট্র তাকে প্রাপ্য সম্মান দিচ্ছে না? ইত্যাদি। দেশ ছেড়ে প্যারিসে পরবাসী হলেও আনোয়ার হোসেন দেশের মাটিতে সামান্যতম কাজ করার সুযোগ পেলেই ছুটে ছুটে এসেছেন সব সময়। প্রচুর ক্ষোভ-অনুযোগ, চাপা অভিমান শুনতে শুনতে আমি নিজেই কখন ক্লান্ত হয়ে নিজস্ব পেশাগত ব্যস্ততায় গত চার-পাঁচ বছর আনোয়ার হোসেনের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিলাম নিজেও বুঝিনি। তবে স্থাপত্যে বুয়েট থেকে পাস করে কিসের নেশায় তিনি পুনে ফিল্ম ইনস্টিটিউটে ভর্তি হয়েছিলেন তা এখনো আমার কাছে একটা মিথ। তিনি চেয়েছিলেন ক্যামেরার শাটার টিপে জীবনের দরিদ্রতা দূর করবেন। শিল্পের ফুল ফোটাবেন। চেষ্টার ত্রুটি করেননি। যশ, সম্মান ও খ্যাতি পেয়েছেন জীবনের একটা পর্ব পর্যন্ত। যুগের সাথে তাল মিলিয়ে ডিজিটাল যুগেও সফল হয়েছিলেন। কিন্তু ব্যক্তিজীবনের গরিবিপনা হটাতে পারেননি। হয়তো এই গোপন অতৃপ্তি বুকে নিয়ে আনোয়ার হোসেন চলে গেলেন। তার মতো আত্মসম্মানবোধসম্পন্ন শিল্পীদের জীবন আর্থিক অসচ্ছ্বলতা ও কষ্টের রূপালী ফ্রেমে বাঁধানো থাকে। আনোয়ার হোসেন সেই সত্য যেন আবারো মনে করিয়ে দিলেন। লেখক : চিকিৎসক ও কলামিস্ট

অন্যান্য সংবাদ