প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

তাবলিগের এই বেহুদা সংঘর্ষের দায় কে নেবে?

চিররঞ্জন সরকার : আমাদের দেশে মার্কসীয় দর্শনে উদ্বুদ্ধ নেতারা এক সময় নিয়মিত অভ্যন্তরীণ বিরোধে জড়িয়ে পড়তেন এবং সাইনবোর্ড সর্বস্ব একটি করে দল গড়ে তুলতেন। দুজন মার্কসবাদী তাত্ত্বিক কোনো বিষয়ে কখনও একমত হতে পারতেন না। বিশেষ করে মার্কসীয় তত্ত্বের ব্যাখ্যা ও রণনীতি নিয়ে তাদের বিরোধ নিয়মিত ঘটনায় পরিণত হয়েছিলো। আর তাদের বিরোধ মানেই একজন আরেকজনকে বহিষ্কার এবং একটি করে নতুন দল গড়ে তোলা। মার্কসীয় দর্শনে উদ্বুদ্ধ সেই সব জাঁদরেল তাত্ত্বিক নেতাদের অধিকাংশই শ্রমজীবীদের অধিকার প্রতিষ্ঠায় কোনো রকম ভূমিকা পালন না করেই দুনিয়া থেকে বিদায় নিয়েছেন।

এ কালে মার্কসবাদের জায়গা দখল করেছে ধর্মবাদ। এখনকার ধর্মতাত্ত্বিকরা যে যার নিজের মতো করে ধর্মের ব্যাখ্যা দেন। তাদের মধ্যেও মতের মিল খুব কম দেখা যায়। মার্কসবাদী তাত্ত্বিকদের মতো তারাও কেউ কারো নেতৃত্ব মানতে চান না। তারাও একে অপরের চেয়ে ভালো বোঝেন এবং বেশি বোঝেন। তাইতো আমাদের দেশে তথাকথিত মার্ক্সবাদী দলগুলোর মতো ধর্মবাদী দলগুলোরও অজস্র-অসংখ্য সংগঠন।

গত বছরের মতো এবারও বিশ্ব ইজতেমাকে সামনে রেখে ভারতীয় উপমহাদেশের সুন্নি মুসলমানদের বৃহত্তম সংগঠন তাবলিগ জামাতের মধ্যেও ক্ষমতার দ্বন্দ্ব দেখা গেলো। এতে করে ব্যাপক সংঘর্ষ ও মারামরিতে এক ব্যক্তির প্রাণও গেলো। নিহত ব্যক্তিটির প্রাণের দায় কে নেবে? আর দিনভর যে পুরো বিমানবন্দর এলাকাজুড়ে হাজার হাজার মানুষ সীমাহীন ভোগান্তির শিকার হলেন, এর জন্যই বা কে জবাবদিহি করবে? এ কোন ধর্মের লড়াই?

উল্লেখ্য, উপমহাদেশে সুন্নী মতাবলম্বীদের সবচেয়ে বড় সংঘ তাবলিগ জামাতের মূলকেন্দ্র ভারতের দিল্লিতে। মাওলানা সাদের দাদা ভারতের ইসলামি প-িত ইলিয়াছ কান্ধলভি ১৯২০-এর দশকে তাবলিগ জামাত নামের এই সংস্কারবাদী আন্দোলনের সূচনা করেন। স্বেচ্ছামূলক এ আন্দোলনের উদ্দেশ্য ইসলামের মৌলিক মূল্যবোধের প্রচার। বিতর্ক দূরে রাখতে এ সংগঠনে রাজনীতি ও ফিকাহ নিয়ে আলোচনা হয় না।

মাওলানা ইলিয়াছের মৃত্যুর পর তার ছেলে মাওলানা মোহাম্মদ ইউসুফ এবং তারপর মাওলানা ইনামুল হাসান তাবলিগ জামাতের আমিরের দায়িত্ব পালন করেন। মাওলানা ইনামুলের মৃত্যুর পর একক আমিরের বদলে সাংগঠনিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার ভার দেওয়া হয় একটি শুরা কমিটির ওপর। সেই কমিটির সদস্য মাওলানা জুবায়েরের মৃত্যুর পর মাওলানা সাদ আমিরের দায়িত্ব নেন এবং একক নেতৃত্বের নিয়ম ফিরিয়ে আনেন। কিন্তু দেওবন্দ অনুসারী মাওলানা জুহাইরুল হাসান নেতৃত্বের দাবি নিয়ে সামনে আসেন এবং তার সমর্থকরা নতুন করে শুরা কমিটি গঠনের দাবি জানান। কিন্তু সাদ তা প্রত্যাখ্যান করলে বিরোধ বড় আকার ধারণ করে। বিভিন্ন সময়ে মাওলানা সাদের বক্তব্য নিয়েও আলেমদের মধ্যে বিভক্তি তৈরি হয়।

নেতৃত্ব নিয়ে দিল্লির মারকাজ এবং দেওবন্দ মাদ্রাসার অনুসারীদের মধ্যে এই দ্বন্দ্ব প্রকট আকার ধারণ করে চলতি বছর জানুয়ারিতে ঢাকায় বিশ্ব ইজতেমার সময়। কয়েক বছর ধরে বিশ্ব ইজতেমায় আখেরি মোনাজাত পরিচালনা করে আসা সাদ কান্ধলভিকে বিক্ষোভের মুখে ইজতেমায় অংশ না নিয়েই তাকে ঢাকা ছাড়তে হয়।

এই দ্বন্দ্বের ধারাবাহিকতায় সাদের অনুসারীরা ৩০ নভেম্বর থেকে ৪ ডিসেম্বর টঙ্গীতে জোড় ইজতেমা এবং ১১ থেকে ১৩ জানুয়ারি বিশ্ব ইজতেমার প্রথম পর্ব অনুষ্ঠানের ঘোষণা দেয়। অন্যদিকে দেওবন্দপন্থিরা ৭ থেকে ১১ ডিসেম্বর জোড় ইজতেমা এবং ১৮ থেকে ২০ জানুয়ারি বিশ্ব ইজতেমার প্রথম পর্ব অনুষ্ঠানের কথা জানায়। দুই পক্ষ আলাদাভাবে ইজতেমা করার ঘোষণা দিলে উত্তেজনা নতুন মাত্রা পায়। এই পরিস্থিতিতে গত ১৬ নভেম্বর সচিবালয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর আসাদুজ্জামান খান কামালের সভাপতিত্বে এক বৈঠক থেকে বিশ্ব ইজতেমার প্রথম পর্ব স্থগিত করা হয়।

ওই বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়, উভয় পক্ষের মধ্যে সমাঝোতার মাধ্যমে বিশ্ব ইজতেমার একটি তারিখ নির্ধারণে ছয় সদস্যের একটি প্রতিনিধি দল ভারতের দেওবন্দে যাবে। দুই পক্ষ সমঝোতায় এলে নতুন তারিখ ঘোষণা করা হবে। কিন্তু সাদপন্থিরা ৩০ নভেম্বর থেকে জোড় ইজতেমা করার প্রস্তুতি নিলে অন্যপক্ষ তুরাগ তীরে ইজতেমা মাঠের সব কটি ফটকে পাহারা বসায়। এই পরিস্থিতিতে সাদপন্থীরা গত ২৭ নভেম্বর ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে সংবাদ সম্মেলন করে প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা করেন। অন্যদিকে জুবায়েরপন্থিরা গত ২৪ নভেম্বর ইসিতে চিঠি দিয়ে টঙ্গীর ইজতেমা মাঠে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ‘ভয়াবহ অবনতির শঙ্কা’ প্রকাশ করে দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার আবেদন করেন।

এর ভিত্তিতে ইসির যুগ্মসচিব ফরহাদ আহাম্মদ খান শুক্রবার গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার, জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপারকে চিঠি দিয়ে ৩০ ডিসেম্বর ভোটের আগে টঙ্গীতে তাবলীগ জামাতের যেকোনো ধরনের অনুষ্ঠান না করার নির্দেশনা দেন। কিন্তু সরকারি এই নির্দেশনা উপেক্ষা করে এক পক্ষ পাঁচ দিনের জোড় ইজতেমা করার, অন্যপক্ষ সেটা প্রতিরোধের ঘোষণা দিলে পরিস্থিতি বিস্ফোরণন্মুখ হয়ে ওঠে। বিমানবন্দর সড়কসহ টঙ্গীর পথের বিভিন্ন স্থানে দুই পক্ষের লোকজন বাঁশ ও লাঠিসোঁটা নিয়ে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে। পুরো বিমাবন্দর এলাকা পরিণত হয় রণক্ষেত্রে।

আমাদের একটাই প্রশ্ন, মার্কসবাদী-ধর্মবাদী সবাই যদি কেবল দ্বন্দ্বে লিপ্ত হন, প্রকৃত দর্শন বাদ দিয়ে দর্শনের ব্যাখ্যা ও নেতৃত্ব নিয়ে মারামারিতে লিপ্ত হন, বিভেদের পথে হাঁটেন, তাহলে মানুষকে ঐক্যের পথে আনবে কে? আর ঐক্য ছাড়া মানুষের মুক্তিই বা আসবে কোন পথে?

লেখক : কলামিস্ট

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ