প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

বিএনপির হ্যামিলনের বাঁশিওয়ালা কে?

বিভুরঞ্জন সরকার : বিএনপির নেতারা রাজনীতি ছেড়ে জ্যোতিষীর ভূমিকায় নেমেছেন বলে মনে হচ্ছে। দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ভবিষ্যৎবাণী করেছেন যে, সুষ্ঠু নির্বাচন হলে আওয়ামী লীগ ৩০টির বেশি আসন পাবে না। তারা এটাও বলছেন যে, বর্তমানে দেশে সুষ্ঠু নির্বাচনের পরিবেশ নেই। নির্বাচন কমিশন সরকারের বা আওয়ামী লীগের ইচ্ছাপূরণের হাতিয়ার হিসেবে কাজ করছে। যদি তাই হয় তাহলে বিএনপি মহাসচিবের ভবিষ্যৎবাণী সত্য না হওয়ারই কথা। প্রসঙ্গত উল্লেখ করা যায় যে, আওয়ামী লীগ চল্লিশ বছরেও ক্ষমতায় আসতে পারবে না বলে আগে একবার ভবিষ্যৎবাণী করেছিলেন বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। কিন্তু তার ফলাফল কী হয়েছে? আওয়ামী লীগ টানা দুই মেয়াদে ক্ষমতায় আছে। আর বিএনপি ক্ষমতার করিডোর থেকেও ছিটকে পড়েছে। রাজনীতি কল্পনাবিলাসের বিষয় নয়, নানা বাস্তব উপাদান দিয়েই নির্ধারিত হয় রাজনীতির গতি-প্রকৃতি।

আওয়ামী লীগ নির্বাচন করছে জয় লাভের জন্য। বিএনপিও তাই। তবে জয়-পরাজয় নির্ধারিত হবে ভোটের দিন। ভোটাররা কাকে ভোট দেবেন, এখনই তা বলা মুশকিল। ভোটের হাওয়া বলে যে কথা আছে, সেটা এখনো কোথাও বইতে শুরু করেনি। তবে আওয়ামী লীগ যে মাঠ পর্যায়ে এগিয়ে আছে তা নিয়ে যারা সন্দেহ পোষণ করেন তারা কল্পজগতের অধিবাসী। আওয়ামী লীগের প্রার্থীরা মাঠ চষে বেড়াচ্ছেন। ভোটাররা মোটামুটি জানেন, নৌকা মার্কার প্রার্থী কে। কিন্তু বিএনপির বা ধানের শীষের প্রার্থী কে সেটা অনেক জায়গাতেই এখনো স্পষ্ট নয়। কারণ তিনশ আসনে আটশজনকে মনোনয়নের চিঠি দেওয়া হয়েছে। ২০-দলীয় জোট এবং ঐক্যফ্রন্টকে কয়টি আসন ছাড় দেওয়া হবে সেটাও এখনো পরিষ্কার নয়। নয় ডিসেম্বর মনোনয়ন প্রত্যাহারের পর জানা যাবে কারা, কোথায় ধানের শীষ নিয়ে লড়বেন। তারপর সময় হাতে থাকবে তিন সপ্তাহেরও কম। এই অল্প সময়ে ভোটের মাঠে আওয়ামী লীগকে পেছনে ফেলে বিএনপি এগিয়ে যাবে বলে মনে করা যেতে পারে, কিন্তু বাস্তবে তেমন দৌড়বিদ প্রার্থী আছেন কিনা আমরা জানি না।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মওদুদ আহমেদ বলেছেন, বিএনপির পক্ষে নাকি গণজোয়ার তৈরি হবে। কী কী লক্ষণ দেখে তার এটা মনে হয়েছে আমরা তা জানি না। অতীতে মওদুদ আহমদের কোনো রাজনৈতিক পূর্বাভাস কী সত্য হয়েছে? টানা দশ বছর ক্ষমতায় থেকে, ব্যাপক উন্নয়নমূলক কাজ করেও আওয়ামী লীগ যদি অজনপ্রিয় হয়ে থাকে, তাহলে একযুগ ধরে ক্ষমতার বাইরে থেকে বিএনপির পক্ষে কোন যুক্তিতে গণজোয়ার তৈরি হবে সাধারণ বুদ্ধিতে বোঝা মুশকিল। তবে সরকারে থাকলে সবাইকে খুশি করা যায় না। তাই কারো কারো মধ্যে কিছুটা ক্ষোভ-অসন্তোষ তৈরি হয়। কিন্তু এই ক্ষোভ-অসন্তোষ নিজেদের অনুকূলে নেয়ার মতো কোনো সক্ষমতা বিএনপি দেখাতে পেরেছে কি? মানুষ যদি আওয়ামী লীগকে ভোট দিতে না চায়, তাহলে বিএনপিকে ভোট দেবে এটা মনে করার পেছনে কোনো জোরালো যুক্তি আছে কি?

বিএনপির চেয়ারপারসন কারাগারে তিনি নির্বাচনে অংশ নিতে পারছেন না। নির্বাচনী প্রচারেও তার অংশ নেয়ার সম্ভাবনা নেই। তাহলে বিএনপির হয়ে ভোট প্রার্থনা করবেন কে? কার মুখ দেখে বা কাকে ভবিষ্যৎ প্রধানমন্ত্রী ধরে নিয়ে মানুষ বিএনপিকে ভোট দেবে? ড. কামাল হোসেন নির্বাচনে দাঁড়াননি। তিনি প্রধানমন্ত্রীও হতে চান না। তিনি আবার বিএনপির সঙ্গে জোটবদ্ধ হওয়ায় কারো কারো মনে আশা জেগেছিলো যে তাকে দেখিয়েই হয়তো বিএনপি বাজিমাত করতে চায়। এখন সে আশাও ভঙ্গ হয়েছে। কামাল হোসেন নিজেকে বঙ্গবন্ধুর অনুসারী বলে দাবি করেন। তিনি জামায়াত বিরোধী বলেও দাবি করেছিলেন। নির্বাচনে বিএনপি জামায়াতকে কোলে তুলে নিয়েছে। ধানের শীষ মার্কা তাদের দিয়েছে। এখন কামাল হোসেন কি জামায়াতের পক্ষে ভোট চাইবেন?

কোনো পরিস্থিতিই বিএনপি বা সহযোগীদের অনুকূলে নয়। হ্যামিলন শহরে ইঁদুরের উৎপাত থেকে নাগরিকদের রক্ষার জন্য আবির্ভূত হয়েছিলেন এক রহস্যময় বাঁশিওয়ালা। বাঁশির সুরে মোহগ্রস্ত করে ইঁদুর নদীতে নিয়ে ডুবিয়ে মেরেছিলেন সেই বাঁশিওয়ালা। দেশের মানুষকে বিএনপির পক্ষে ভোট দেওয়ার জন্য মোহগ্রস্ত করতে বিএনপিতে কোনো বাঁশিওয়ালা দেখা যাচ্ছে না। বিএনপিতে নেতৃত্ব সঙ্কট দেখা দেওয়া আশঙ্কা রয়েছে। সব বিবেচনাতেই এখন বিএনপির অবস্থান আত্মরক্ষামূলক। এই অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসার একটি সুযোগ তৈরি হয়েছে নির্বাচনের মধ্য দিয়ে। হঠকারী বক্তব্য দিয়ে সরকারকে তথা আওয়ামী লীগকে মারমুখি না করে বিএনপির উচিত হবে নিজেদের অতীত ভুল স্বীকার করে ভবিষ্যতে তারা আওয়ামী লীগের চেয়ে কীভাবে উন্নত শাসন উপহার দেবে সেগুলো স্পষ্ট করে তুলে ধরে মানুষের কাছে বিনীতভাবে ভোট প্রার্থী হওয়া।

লেখক : যুগ্ম সম্পাদক, আমাদের নতুন সময়

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ