প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

বাপেক্সের ৩০৫ কোটি টাকার প্রকল্প কার্যত পরিত্যক্ত

শাহীন চৌধুরী: রাষ্ট্রীয় তেল, গ্যাস ও খনিজ সম্পদ করপোরেশনের (পেট্রোবাংলা) অঙ্গ প্রতিষ্ঠান বাপেক্স দেশের গ্যাস সরবরাহ বাড়াতে ২০১০ সালের জুলাই মাসে নিজস্ব দুটি গ্যাসক্ষেত্রে দুটি করে মোট চারটি উন্নয়ন কূপ খনন প্রকল্প হাতে নেয়। এগুলো হলো ফেঞ্চুগঞ্জ গ্যাসক্ষেত্রের ৪ ও ৫ এবং সালদা গ্যাসক্ষেত্রের ৩ ও ৪ নম্বর কূপ। খনন শেষে ছয় কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ সম্ভব হবে মর্মে এ প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয় ৩০৫ কোটি টাকা। এ ব্যয়ের মধ্যে গ্যাস উন্নয়ন তহবিল থেকে অর্থায়ন ছিল ২৪০ কোটি টাকা। প্রকল্পটি শেষ হয় ২০১৬ সালের জুন মাসে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, কূপ খনন শুরুর আগেই তিন কোটি ঘনফুট ক্ষমতার চারটি স্কিড মাউন্টেড প্রসেস প্লান্ট ক্রয় করেন ওই প্রকল্পের প্রথম পরিচালক বাপেক্সের সাবেক মহাব্যবস্থাপক মো. শাহাবউদ্দিন। কিন্তু চারটি কূপের কোনোটিতেই গ্যাস পায়নি বাপেক্স। ফলে ৩০৫ কোটি টাকার প্রকল্প কার্যত পরিত্যাক্ত হয়ে যায়।

সূত্রমতে, গ্যাসের চাপ, তাপ ও অন্যান্য মান নিয়ন্ত্রণে প্রসেস প্লান্ট নামে একটি বিশেষ যন্ত্র ব্যবহার করে গ্যাস কোম্পানিগুলো। কূপ খননের পর গ্যাস প্রাপ্তি নিশ্চিত হলেই কেবল প্রসেস প্লান্ট কেনা হয়। যদিও বাপেক্স সালদা ও ফেঞ্চুগঞ্জের চারটি কূপ খনন প্রকল্পে ঘটেছে তার উল্টোটা। গ্যাস প্রাপ্তির আগেই কূপ খননের শুরুতে ৫২ কোটি টাকা ব্যয়ে চারটি প্রসেস প্ল্যান্ট কিনেছে প্রতিষ্ঠানটি। তবে গ্যাস না পাওয়ায় আট বছর ধরে ফেলে রাখা হয়েছে প্ল্যান্ট চারটি। এসব কূপের জন্যই প্রসেস প্ল্যান্টগুলো কেনা হয় খননের আগেই। একারনে অব্যবহৃত পড়ে আছে চারটি প্রসেস প্ল্যান্ট।
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে কোন মন্তব্য করতে অসম্মতি জানান বাপেক্সের সদ্য বিদায়ী ব্যবস্থাপনা পরিচালক একেএম রুহুল ইসলাম চৌধুরী। তিনি আর ব্যবস্থাপনা পরিচালকের দায়িত্বে নেই বলে জানান। আর এ কারণেই তিনি কোন মন্তব্য করতে রাজি হননি।

প্রতিষ্ঠানটির একাধিক কর্মকর্তা জানান, তৎকালীন প্রশাসনের মতামত না নিয়েই সাবেক মহাব্যবস্থাপক মো. শাহাবউদ্দিন এসব যন্ত্রাংশ কিনেছেন। বাপেক্সের অন্য কর্মকর্তারা আপত্তি জানালেও ওই কুপে গ্যাস পাবেন বলে তিনি নিশ্চিত করেন। এখন পর্যন্ত ব্যবহার না হলেও নিকট ভবিষ্যতে নতুন কুপে গ্যাস পাওয়া গেলে এসব যন্ত্রাংশের ব্যবহার হবে বলে তারা জানান।

জানা যায়, চারটি প্ল্যান্টের মধ্যে একটি প্ল্যান্ট সোনারগাঁর রূপগঞ্জের গ্যাসক্ষেত্রে কয়েক মাসের জন্য ব্যবহার করা হয়। কিন্তু ২০১৭ সালের মার্চে উৎপাদন শুরু হয়ে নভেম্বরের আগেই তা বন্ধ হয়ে যায়। ফলে ওই প্রসেস প্ল্যান্টটিও অকেজো অবস্থায় পড়ে আছে। চারটি কূপের মধ্যে সালদা ৩ নং কূপ খনন শেষে ২০১১ সালের ডিসেম্বরে ২০ মিলিয়ন ঘনফুট ও ২০১২ সালে ফেঞ্চুগঞ্জ ৪ নম্বর কূপ থেকে ২০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা হয় বলে বাপেক্স সূত্রে জানা যায়। যদিও পেট্রোবাংলার মে মাসের এক প্রতিবেদনে দুটি কূপেই গ্যাস উৎপাদন প্রায় শূন্য দেখানো হয়।
অন্যদিকে ২০১৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে ফেঞ্চুগঞ্জ ৫ নম্বর কূপ খনন শেষে ডিএসটিতে প্রাপ্ত গ্যাসের সঙ্গে অতিরিক্ত পানি ও বালি আসার কারণে কূপটি পরিত্যক্ত রাখা হয়। একইভাবে সালদা ৪ নম্বর কূপটি ২ হাজার ৬৮৪ মিটার খনন করার পর ভূগর্ভে পাইপ আটকে যায়। পরে মেসার্স হ্যালিবার্টন ইন্টারন্যাশনাল নামে মার্কিন একটি কোম্পানিকে দিয়ে ২ হাজার ৭৭৬ মিটার গভীর পর্যন্ত খননকাজ করা হয়। তার পরও গ্যাস পাওয়া যায়নি।

এদিকে নিয়ম ভেঙে প্রসেস প্ল্যান্ট কেনার পাশাপাশি এ প্রকল্পে নানা অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। প্রকল্পের সারঞ্জামাদি কর্মকর্তাদের বাসাবাড়িতে ব্যবহার, ব্যাংক ভাউচার, চেক ও ব্যাংক বিবরণী জালিয়াতির মাধ্যমে অর্থ আত্মসাতের সঙ্গে জড়িত প্রকল্পের কর্মকর্তারা। ২০১৫ সালে বিষয়টি নজরে আসে প্রশাসনের। এরপর ১৩ জন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে পৃথক দুটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। তিন বছর পর তদন্তের ভিত্তিতে গত ১০ অক্টোবর ওই প্রকল্পের পরিচালক, মহাব্যবস্থাপক ও প্রকল্প পরিচালক মো. শাহাবউদ্দিনসহ চারজনকে বহিষ্কার কার হয়।

বহিষ্কৃত বাকিরা হলেন উপব্যবস্থাপক (হিসাব ও অর্থ) মো. হাদিউজ্জামান, উপ-মহাব্যবস্থাপক (খনন) জামাল হোসেন ও উপব্যবস্থাপক (প্রশাসন) মনিরুজ্জামান। এছাড়া রেজাউল করিম নামে আরেক কর্মকর্তার দুটি ইনক্রিমেন্ট বাতিল করে আংশিক শাস্তি দেয়া হয়। তবে এসব কর্মকর্তার মধ্যে রেজাউল করিম ছাড়া বাকিরা বহিষ্কারের সিদ্ধান্তের আগেই অবসরে গেছেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ