প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

বঙ্গবন্ধুর আদর্শের সৈনিক লতিফ সিদ্দিকীর চমক!

অসীম সাহা : লতিফ সিদ্দিকী, কাদের সিদ্দিকী, মুরাদ সিদ্দিকী ও আজাদ সিদ্দিকী। টাঙ্গাইলের সিদ্দিকী পরিবারের এই চার সন্তানকে সারা দেশের মানুষ চেনে। তর্কে, বিতর্কে, নিন্দা ও প্রশংসায় এই পরিবারের সদস্যদের নাম কোনো না কোনোভাবে জড়িয়ে থাকেই। লতিফ সিদ্দিকী এবং কাদের সিদ্দিকী জাতীয় পর্যায়ে যতোটা পরিচিত, বাকি দুভাই অতোটা না হলেও তদের কর্মকা-ের জন্য তারা দুজনই টাঙ্গাইলে একনামে পরিচিত। আর এবার একই আসন থেকে ৩ ভাই মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করে নির্বাচনে অংশগ্রহণের ঘোষণা দেয়াতে চারজনই এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে। এর মধ্যে প্রবল বিতর্ক সৃষ্টি করে কাদের সিদ্দিকী বিএনপি-প্রভাবিত জাতীয় ঐক্যফ্রন্টে যোগ দিয়ে ‘ধানের শীষ’ মার্কা নিয়ে নির্বাচনে অংশগ্রহণের ঘোষণা দেয়াতে বাংলাদেশের প্রগতিশীল মানুষ তাকে এখন অনেকটা ঘৃণার চোখেই দেখছে! কিন্তু বিস্ময়ের বিষয় হলেন লতিফ সিদ্দিকী। তুচ্ছ কারণে মন্ত্রিত্ব এবং দলের সাধারণ সদস্যপদ থেকে বহিষ্কার করার পরও তিনি বঙ্গবন্ধুকন্যা কিংবা আওয়ামী লীগ সম্পর্কে কোথাও ন্যূনতম নেতিবাচক কথাও উচ্চারণ করেননি।

তিনি একেবারেই নিজেকে গুটিয়ে নিয়ে অনেক অসুস্থ অবস্থায় নিরবে-নিভৃতে জীবন অতিবাহিত করেছেন। নিজের ভাই বা অন্য ‘ডিগবাজি-নেতাদের’ মতো অন্য কোনো দলের উচ্ছিষ্ট ভোগ করার জন্য লকলকে জিভ বাড়িয়ে এগিয়ে যাননি। বরং এবারের নির্বাচনে টাঙ্গাইল-৪ আসন থেকে মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে অংশগ্রহণের ইচ্ছে ব্যক্ত করেছেন। কিন্তু তিনি সকলকে চমকে দিয়ে “আমার ভাই কাদের সিদ্দিকী জাতীয় ঐক্যফ্রন্টে যোগদান করার জন্য আমাকে চাপ প্রয়োগ করেন। এই ঐক্যফ্রণ্টেরা নেতাদের দেশবাসী চেনেন।

ঐক্যফ্রন্টের বিএনপি রাষ্ট্রক্ষমতায় থেকে কী করেছে, তা সবার জানা। তাদের দ্বারা মানুষের কোনো উপকার হবে না। আমি নির্বাচনে এসেছি ঐক্যফ্রন্টের বিরুদ্ধে, বঙ্গবন্ধুর হত্যাকারী বেনিফিসিয়ারিদের বিরুদ্ধে, অত্যাচারী-শোষকদের বিরুদ্ধে এবং স্বাধীনতার পরাজিত শক্তির বিরুদ্ধে।” বলে যে সাহসী উচ্চারণ করেছেন, আমরা ভেবেছিলাম, তা আমরা শুনতে পাবো লতিফ সিদ্দিকীর ভাই কাদের সিদ্দিকী বীরউত্তমের কণ্ঠে। অথচ তিনি তা না করে ‘ধানের শীষের গামছা’ গলায় দিয়ে এখন তার ভাইয়ের আদর্শেরই বিরুদ্ধে বঙ্গবন্ধুর রক্তের সঙ্গে বেঈমানি করে শুধু শেখ হাসিনাকে ক্ষমতা থেকে নামানোর জন্য প্রতিহিংসাপরায়ণ হয়ে এমনকি নিজ ব্যক্তিগত শত্রুর সঙ্গেও গলাগলি করে নাচছেন! আর সেখানে তারই ভাই লতিফ সিদ্দিকী আওয়ামী লীগের কাছ থেকে সরাসরি অপমানিত হয়েও, আদর্শ থেকে বিচ্যুত না হয়ে নির্বাচনে জয়লাভ করে শেখ হাসিনাকেই আসনটি উপহার দেবেন বলে ঘোষণা দিয়েছেন!

এক এক বিস্ময়কর চমক! এ না হলে বঙ্গবন্ধুর সৈনিক? যিনি শুধু ক্ষমতার মোহে সুযোগ থাকা সত্ত্বেও দাঁত-মুখ চেপে সব অপমান সহ্য করেও বঙ্গবন্ধুর আদর্শ থেকে সরে যাননি, তাঁকে মাথা নত করে প্রণতি জানানো ছাড়া আর কী করা যেতে পারে? যারা মনোনয়ন না পেয়ে কিংবা হালুয়া-রুটির ভাগ না পেয়ে ‘পিতাবদল’ করতে পারেন, তাদেরকে মানুষ্যসন্তান বলে মেনে নিতে যে কারোরই দ্বিধা হবে। এর আগেও বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর যারা আওয়ামী লীগ ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন, তারা এখন কোথায়? ইতিহাসের দূরবিনের একবারে শেষপ্রান্তেও তাদের কোথাও খুঁজে পাওয়া যাবে না। আসলে ইতিহাস কোনো বেঈমানকে বীরের আসনে তো দূরের কথা, এমনকি ইতিহাসের কোনো কিনারায়ও ঠাঁই দেয়া না। মীরজাফর, খোন্দকার মোশতাকরা ইতিহাসের ঘৃণ্য খলনায়ক হিসেবেই বিবেচিত হয়। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের রক্তের সঙ্গে বেঈমানি করে যারা বিশ্বাসঘাতকদের সঙ্গে হাত মিলিয়েছেন, ইতিহাসের অন্ধকার গর্ভে তাদের জন্য স্থান নির্ধারিত হয়ে আছে। আর সৈয়দ নজরুল, তাজউদ্দীন, কামারুজ্জামান ও মনুসর আলী এবং মীরমদন, মোহনলাল কিংবা কর্নেল জামিলদের জন্য নির্ধারিত হয়ে আছে মহানায়কের পাশের ঘরের উজ্জ্বলতম স্থান, মূর্খদের যদি সে-ইতিহাস জানা থাকতো, তা হলে তারা কিছুতেই এই বেঈমানি করতে পারতেন না।

লতিফ সিদ্দিকী আজ শত অবমাননা সত্ত্বেও যে দৃষ্টান্ত স্থাপন করলেন, তা ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে, এ-আমি একজন সাধারণ কবি ও ইতিহাসের পাঠক হিসেবে জোর দিয়ে বলতে পারি। মানুষ ভুল-ত্রুটির উর্ধ্বে নয়। লতিফ সিদ্দিকীও নন। কিন্তু যারা তাঁর ভুল ধরে, তাঁর ‘অন্যায়’কে চিহ্নিত করার নামে বঙ্গবন্ধুর নৌকা থেকে তাঁকে অগাধ সলিলে নিক্ষেপ করেছিলেন, তাদের তিনি দেখিয়ে দিলেন, বঙ্গবন্ধুর সৈনিকরা এমনি হয়! ষড়যন্ত্রকারীরা যাকে নিশ্চিহ্ন করে দিতে চায়, তাঁরা তাঁদের যোগ্যতা ও মহিমায় আলোর দ্যুতি ছড়িয়ে ফের ফিরে আসেন মহাকালের ডুবুরি হয়ে। লতিফ সিদ্দিকী তাই করেছেন। এবার নির্বাচনে জয় ছিনিয়ে এনে নেত্রীকে উপহার দেবার মাধ্যমে তাঁকে দেখিয়ে দিতে হবে, সত্যের শক্তি কতো বেশি দুর্নিবার। যদি তাই হয়, তা হলে জননেত্রী শেখ হাসিনাকেও হাত বাড়িয়ে সসম্মানে লতিফ সিদ্দিকীকে দলে ফিরিয়ে এনে তাঁর নিজের ভুলের সংশোধন করতে হবে এবং মনে রাখতে হবে, বঙ্গবন্ধুর প্রকৃত সৈনিকেরা যেন ষড়যন্ত্রকারী কারো প্ররোচনায় নৌকা থেকে আর ছিটকে না পড়ে। যেন নেত্রীকে আরো একটি বড়ো পাপের দায়ভার কাঁধে নিয়ে বিড়ম্বিত হতে না হয়!

লেখক : কবি, সংযুক্ত সম্পাদক, আমাদের নতুন সময়

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ