প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

এক হলে পারি, একা হলে হারি

বিভুরঞ্জন সরকার : বিজয়ের মাস ডিসেম্বর শুরু হয়েছে। ১৯৭১ সালের ডিসেম্বর মাসে আমাদের নয় মাসের রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের বিজয় অর্জিত হয়েছিলো। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী আত্মসমর্পণ করেছিলো ১৬ ডিসেম্বর। ২৫ মার্চ রাত থেকে যে গণহত্যা শুরু হয়েছিলো সেটা চলেছিলো চূড়ান্ত বিজয়ের আগ-মুহূর্ত পর্যন্ত। তিরিশ লক্ষ মানুষের জীবন, দুই লক্ষাধিক নারীর সম্ভ্রম এবং কোটি কোটি মানুষের চরম দুঃখ-দুর্ভোগের বিনিময়ে আমরা পেয়েছিলাম আমাদের স্বাধীনতা, বিজয়। দেশকে শত্রুমুক্ত করার অপার আনন্দে আমরা মাতোয়ারা হয়েছিলাম এই ডিসেম্বর মাসে। আমাদের সমস্যা হলো, আমরা দুঃসময় বা দুর্দিন দূর করার জন্য বারবার সংগ্রাম করি, বিজয় অর্জন করি কিন্তু অর্জিত বিজয় ধরে রাখতে পারি না। লড়াই-সংগ্রামের আমাদের অনেক অভিজ্ঞতা। অনেক সাফল্যের কাহিনী আমরা তৈরি করেছি। আমরা জানি, আমাদের কোনো অতীত সংগ্রামেই ততোক্ষণ সাফল্য আসেনি যতোক্ষণ ঐক্যবদ্ধ না হয়েছি। একা একা লড়া যায় হয়তো কিন্তু বিজয় ছিনিয়ে আনা যায় না। একা মানুষের চেয়ে ঐক্যবদ্ধ মানুষ সব সময়ই শক্তিশালী। বহুল প্রচলিত একটি বাক্য হলো, দশের লাঠি, একের বোঝা। একা যে ভার বহন করা যায় না, সমবেতভাবে তা সহজেই বয়ে নেওয়া যায়।

আমরা যেসব বড় বড় সংগ্রাম করেছি, যেসব সংগ্রামে আমরা কালজয়ী ইতিহাস তৈরি করেছি, তার কোনোটিই একক মানুষের চেষ্টায় হয়নি। বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন, চুয়ান্নর যুক্তফ্রন্টের নির্বাচন, বাষট্টির শিক্ষা ও সামরিক শাসনবিরোধী আন্দোলন, ছেষট্টির ছয় দফার আন্দোলন, ঊনসত্তের গণঅভ্যুত্থান, সত্তরের নির্বাচন এবং একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধÑ সব কিছুই আমাদের বৃহত্তর ঐক্য এ সফলতার কাহিনী। স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়েও আমাদের বড় সাফল্য এরশাদ পতনের আন্দোলন। সেখানেই আমরা একা ছিলাম না। তাই এটা দ্বিধাহীনভাবে বলা যায় যে, আমরা যখনই এক হয়েছি, একতাবদ্ধ হয়েছি তখনই বিজয় হাতের মুঠোয় এনেছি। বিজয়ের পর আমরা একা হয়েছি, বিছিন্ন হয়েছিÑ অর্জিত বিজয় আমাদের হাতছাড়া হয়েছে, ছিনতাই হয়েছে।

প্রত্যেক আন্দোলনেই শত্রুমিত্র থাকে। মিত্রকে সঙ্গে নিয়েই শত্রুকে পরাভূত করতে হয়। তবে শত্রুকে সব সময় চিহ্নিত করা সহজ হয় না। ছদ্মবেশী শত্রুও থাকে। আমরা জাতিগতভাবেই বুঝি কিছুটা বিস্মৃতিপরায়ণ। তাই কখনও কখনও চিহ্নিত শত্রুকেও আমরা ভুলে যাই অথবা তাদের ছলনায় ভুলি। সাফল্য লাভ করা এবং সাফল্য ধরে রাখার জন্য সঠিকভাবে শত্রুমিত্র চেনা খুব জরুরি।

আমাদের ঐতিহাসিক মুক্তিযুদ্ধেও শত্রুমিত্র ছিলো। সেটা দেশের ভেতরে যেমন ছিলো, তেমনি দেশের বাইরেও ছিলো। আমরা শত্রুদের প্রতি অতি বেশি উদারতা-নমনীয়তা দেখিয়েছি। শত্রুরা আমাদের দুর্বলতা-বিভেদ-অনৈক্যের সুযোগ নিয়েছে। সংগঠিত হয়েছে। কখনো প্রকাশ্যে, কখনো গোপনে আঘাত হেনেছে, অস্ত্র শানিয়েছে।

এবার বিজয়ের মাস শুরু হলো একটি দুঃসংবাদ দিয়ে। মুক্তিযুদ্ধের সাহসী সেনানী তারামন বিবি ১ ডিসেম্বর প্রথম প্রহরে কুড়িগ্রামের রাজীবপুর উপজেলার কাচারিপাড়া গ্রামে নিজ বাড়িতে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। এই বীরকন্যা কয়েক বছর থেকেই শ্বাসকষ্ট জনিত রোগে ভুগছিলেন। একাত্তরে সম্মুখ সমরে অংশ নেওয়া এই যোদ্ধার মৃত্যু আমাদের ব্যথিত করে এ জন্য যে, বীরপ্রতীক খেতাব পাওয়া এই তারামন বিবির জীবনের মূল্যবান সময় কেটেছে অবহেলায়, অসম্মানে। তারামন বিবি চলে গেলেন, রেখে গেলেন রক্তমূল্যে কেনা বাংলাদেশ। এই বাংলাদেশ একাত্তরের ধারায় চলবে, নাকি পাকিস্তানি ধারায় চলবে তার একটি পরীক্ষা হতে চলেছে এই ডিসেম্বরেই। আগামী ৩০ ডিসেম্বর একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। এই নির্বাচনে জয়-পরাজয় নিয়ে নানা রকম মত, মতভিন্নতা আছে। একদিকে আওয়ামী লীগ এবং তার মিত্র বাহিনী। অন্যদিকে বিএনপি এবং তার মিত্রশক্তি। বিএনপির মিত্র তালিকায় আছে মুক্তিযুদ্ধের প্রত্যক্ষবিরোধিতাকারী জামায়াতে ইসলামী। জামায়াতকে ধানের শীষ মার্কা দিয়ে আত্মীকরণ করে নিয়েছে বিএনপি। শুধু তাই নয়, বিএনপির মনোনয়ন তালিকায় ঠাঁই পেয়েছেন মানবতাবিরোধী অপরাধে দন্ডিতদের সন্তান-স্বজনরা। ‘এরা তো কোনো অপরাধ করেনি’Ñ এমন কথা বলে যারা বিষয়টিকে হালকা করে দেখছেন, তারা কার্যত মুক্তিযুদ্ধে আত্মদানকারী শহীদদের প্রতি অবজ্ঞা দেখাচ্ছেন। ঘাতক-দালালদের সন্তানরা মুক্তিযুদ্ধের প্রতি অনুগত, তারা তাদের পূর্বসূরিরা যে জাতিবিরোধী ভূমিকা পালন করে ভুল করেছিলেন, তাদের বিচার ও শাস্তি দেওয়া যে যথার্থ হয়েছে, এমন কথা কি কখনও প্রকাশ্যে স্বীকার করেছেন? তারা কি দেশবাসীর কাছে মার্জনা ভিক্ষা করেছেন, নাকি তাদের পূর্বসূরিদের অবস্থানেরই সাফাই গেয়েছেন?

৩০ ডিসেম্বরের ভোট বাহ্যত আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে বলে মনে করা হলেও এটা হবে আসলে একাত্তরের বিজয়ের ধারাবাহিকতা রক্ষার একটি লড়াই। বাঙালির বিজয়ের লড়াইয়ে একাত্তরে নেতৃত্ব দিয়েছে বঙ্গবন্ধু, আওয়ামী লীগ। এবার নেতৃত্ব দিচ্ছেন শেখ হাসিনা এবং আওয়ামী লীগ। বঙ্গবন্ধুর আওয়ামী লীগ এবং আজকের আওয়ামী লীগ এক নয় বলে যারা বিতর্ক সৃষ্টি করতে চান তারা বাস্তবে ওই শক্তিকেই সহায়তা করেন যারা আওয়ামী লীগকে দুর্বল দেখতে চান। একাত্তরে বিজয়ের জন্য পুরো জাতির ইস্পাতদৃঢ় ঐক্য ছিলো, এবারও সেই ঐক্যের বিকল্প নেই। এক থাকলে আমরা জিততে পারবো, একা হলে হারবো। তাই আমাদের অঙ্গীকার হোক :

আমরা ডরাইবো না ঝটিকা-ঝঞ্ঝায়,

অযুত তরঙ্গ বক্ষে সহিবো-হেলায়।

টুটে তো টুটুক এই নশ্বর জীবন,

তবু না ছিঁড়িবে কভু এ দৃঢ় বন্ধন …।

লেখক : গ্রুপ যুগ্ম সম্পাদক, আমাদের নতুন সময়

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ