প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

সওজের নানা প্রকল্প : ব্যয় আছে, সেবা নেই

ডেস্ক রিপোর্ট : উদ্দেশ্য ছিল আরিচা-নগরবাড়ী ও দৌলতদিয়া-নগরবাড়ী ফেরিপথের দূরত্ব কমানো। এজন্য ২০০৬ সালের জুলাইয়ে পাবনার বেড়া উপজেলার বাঁধেরহাট-খয়েরচর সড়কটির নির্মাণকাজ শুরু করে সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর (সওজ)। শুরুতে প্রকল্পের মেয়াদ ধরা হয় তিন বছর। কিন্তু ১২ কিলোমিটার সড়কটি নির্মাণ শেষ হয় ১০ বছরে। প্রায় শতকোটি টাকা ব্যয় করেও ফেরিঘাট স্থানান্তর না হওয়ায় কাজে আসছে না সড়কটি।

সুন্দরবনের সঙ্গে দেশের অন্যান্য অংশের যোগাযোগ সহজ করতে বাগেরহাটের কচুয়া উপজেলার সাইনবোর্ড বাজার-বগী সড়কটি আঞ্চলিক মানে উন্নীত করার উদ্যোগ নেয়া হয় ২০১০ সালে। প্রায় ৯০ কোটি টাকা ব্যয়ে ২০১৬ সালে প্রকল্পের কাজ শেষ করে সওজ। কিন্তু সড়কটির একটা বড় অংশের প্রস্থ ১৮ ফুটের জায়গায় ১২ ফুট রেখে দেয়ায় আঞ্চলিক সড়কের সুফল মিলছে না। প্রস্থ কম হওয়ায় ওই অংশ দিয়ে একসঙ্গে দুটি বাস চলাচল করতে পারছে না।

বগুড়া শহরের সঙ্গে শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের (জিয়া মেডিকেল) সংযোগ স্থাপনে সাড়ে চার কিলোমিটার সড়ক নির্মাণের উদ্যোগ নেয়া হয় ২০০৩ সালে। যদিও ৮০০ মিটার বানিয়েই শেষ করা হয়েছে কাজ। সড়কটি মিশেছে ধানক্ষেতে গিয়ে। শহর থেকে মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের মধ্যে পুরোপুরি সংযোগ স্থাপন না হওয়ায় কাজে আসছে না এ সড়কও।

প্রকল্প পরিদর্শন করে পরিকল্পনা কমিশনের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) পর্যবেক্ষণ বলছে, সড়ক নির্মাণে দীর্ঘ সময় লাগছে, যা অস্বাভাবিক। নির্মাণ শেষে সড়কের উদ্দেশ্যও অর্জিত হচ্ছে না। এ নিয়ে প্রশ্ন তুলছে তারা।

পরিকল্পনার অভাবকেই এজন্য দায়ী করছেন বিশেষজ্ঞরা। জবাবদিহিতা না থাকাকেও এর আরো একটি কারণ বলে মনে করছেন তারা। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) অধ্যাপক ড. সামছুল হক বলেন, প্রকল্পে বিনিয়োগের আগে সম্ভাব্যতা সমীক্ষা করা হয়। কিন্তু প্রকল্প শেষে উদ্দেশ্য অর্জিত না হলে সম্ভাব্যতা সমীক্ষা করা হয়েছে কিনা, সে প্রশ্ন থেকেই যায়। তাই প্রকল্প গ্রহণের আগে সেটির প্রভাব সম্পর্কে আগেই ভালোভাবে মূল্যায়ন করা উচিত। এছাড়া প্রকল্পসংশ্লিষ্টদের জবাবদিহিতাও নিশ্চিত করতে হবে।

যমুনা সেতু চালু হওয়ার পরও আরিচা-নগরবাড়ী ফেরিপথের গুরুত্ব কমেনি। আগে ফেরিপথটির দৈর্ঘ্য ছিল আট কিলোমিটার। তবে যমুনা নদীতে চর পড়ায় তা কাজিরহাটে সরিয়ে নেয়া হয়। সেখানেও চর পড়ায় প্রায় ২০ কিলোমিটার ঘুরে আরিচা থেকে কাজিরহাটে যেতে হচ্ছে। এ অবস্থায় ফেরিপথের দূরত্ব কমাতে পাবনার কাজিরহাট ফেরিঘাটটি খয়েরচরে সরিয়ে নেয়া ও খয়েরচরে যাতায়াতের জন্য ‘বাঁধেরহাট-খয়েরচর’ সড়ক নির্মাণের উদ্যোগ নেয় সওজ। ৯৩ কোটি টাকা ব্যয়ে সড়কটি নির্মাণও করা হয়। কিন্তু ফেরিঘাট স্থানান্তর না হওয়ায় কাজে আসছে না সড়কটি। ঢাকা-পাবনা ও পাবনা-রাজবাড়ীর মধ্যে চলাচলকারী সব যানবাহন কাজিরহাট দিয়ে চলাচল করছে। বাঁধেরহাট-খয়েরচর সড়কটি অব্যবহূতই থাকছে।

সড়কটি চালুর দুই বছর পার হলেও এখনো ফেরিঘাট স্থানান্তর না হওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে সওজ রাজশাহী জোনের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী হাবিবুর রহমান বলেন, আমি এ জোনে (রাজশাহী) নতুন এসেছি। খোঁজ-খবর নিয়ে ফেরিঘাট স্থানান্তরের ব্যাপারে উদ্যোগ নেয়া হবে।

মাত্র ১২ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের সড়কটি নির্মাণে ১০ বছর সময় নিয়েছে সওজ। তিন বছরের প্রকল্প ১০ বছরে শেষ হওয়া নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে আইএমইডি। তবে সওজের কর্মকর্তারা বলছেন, সড়কটি যে জায়গায় নির্মাণ করা হয়েছে, সেখানে আগে ফসলি জমির মাঠ ছিল। ভূমি অধিগ্রহণ করে মাটির কাজ করতে হয়েছে। তারপর সড়ক বানানো হয়েছে। আনুষ্ঠানিকভাবে ২০০৬-০৭ সালে শুরু হলেও মূল কাজ (সড়ক নির্মাণ) শুরু হয় ২০১১-১২ সালে এসে।

সরেজমিন ঘুরে দেখা যায়, খয়েরচরে যমুনার পাড় থেকে শুরু হয়ে বাঁধেরহাট বাজারে গিয়ে ঠেকেছে আঞ্চলিক মানের (২৪ ফুট প্রশস্ত) সড়কটি। আগে এ জায়গায় কোনো সড়ক ছিল না। স্থানভেদে মাটি থেকে ১৫-২০ ফুট উঁচু সড়কটি ফসলি মাঠের মধ্য দিয়ে নির্মাণ করা হয়েছে। বালি মাটির ওপর নির্মাণ করায় এরই মধ্যে বিভিন্ন স্থানে সড়কের শোল্ডার ও পেভমেন্ট ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কোথাও কোথাও পুরো পেভমেন্ট উঠে একেবারে কাঁচা রাস্তার আদল পেয়েছে।

বগুড়ার জিয়াউর রহমান মেডিকেলের সঙ্গে শহরের যোগাযোগের জন্য সাড়ে চার কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের সড়কটি ৮০০ মিটার নির্মাণ শেষেই সমাপ্ত করা হয়েছে। আইএমইডির মূল্যায়ন বলছে, ৮০০ মিটার সড়কটি নির্মাণে ১৩ বছর সময় নিয়েছে সওজ। শহর থেকে মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের মধ্যে পুরোপুরি যোগাযোগ স্থাপিত না হওয়ায় সড়ক নির্মাণের উদ্দেশ্য অর্জিত হয়নি।

ঢাকা-রংপুর মহাসড়কের পাশে বগুড়া শহর থেকে আড়াই কিলোমিটার দূরে জিয়া মেডিকেলের অবস্থান। শহর থেকে হাসপাতালে যাতায়াতের একমাত্র পথ ব্যস্ততম ঢাকা-রংপুর মহাসড়ক। সেটি দিয়ে গেলে ঘুরতে হয় প্রায় ১০ কিলোমিটার। মহাসড়কে থ্রি-হুইলার চলাচলে নিষেধাজ্ঞা থাকায় ভোগান্তিতে পড়ে রোগীরা। এমন পরিপ্রেক্ষিতে ২০০৩ সালে জিয়া মেডিকেল থেকে বগুড়া-শেরপুর সড়কসংলগ্ন মোহাম্মদ আলী হাসপাতাল পর্যন্ত সংযোগ সড়ক নির্মাণের উদ্যোগ নেয়া হয়। তবে কোনো কাজে আসছে না এ সড়কও। বর্তমানে এটি ব্যবহার হচ্ছে ধান ও খড় শুকানোর কাজে।

জানতে চাইলে সওজ কর্মকর্তারা বলছেন, নানা কারণে কাজ শুরু করতে বিলম্ব হয়েছে। জমির দাম বেড়ে গেলে প্রকল্পটিতে সংস্থান রাখা অর্থ দিয়ে নির্মাণকাজ শেষ করা কঠিন হয়ে পড়ে। এ কারণে যতটুকু সম্ভব, ততটুকুই কাজ হয়েছে। সড়কটির বাকি কাজ শেষ করতে আরেকটি প্রকল্প নেয়া হয়েছে।

সওজ সূত্রে জানা গেছে, প্রকল্পটি নির্মাণের সময় প্রাক্কলিত ব্যয় ধরা হয়েছিল ১৩ কোটি ৭০ লাখ টাকা। ২০১০ সালে এসে দেখা যায়, শুধু অবশিষ্ট জমি অধিগ্রহণ করতেই দরকার পড়বে আরো প্রায় ৪২ কোটি টাকা।

সম্প্রতি সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে, রাস্তাটি ফসলের মাঠের যে জায়গায় গিয়ে শেষ হয়েছে, সেখানে বসতি গড়ে উঠতে শুরু করেছে। ভবিষ্যতে রাস্তা নির্মাণ হতে পারে, এমন সম্ভাবনায় সড়কটির অ্যালাইনমেন্ট বরাবর অবকাঠামো গড়ে তুলছেন স্থানীয়রা। এতে দিন দিন বেড়েই চলেছে এ এলাকার জমির দাম। সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) বগুড়া জেলা শাখার সহসভাপতি মাহমুদ হোসেন পিন্টুর ভাষ্য অনুযায়ী, নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ হলে ১২-১৫ কোটি টাকার মধ্যে রাস্তাটি হয়ে যেত। এখন বানাতে গেলে প্রায় ১০০ কোটি টাকা লেগে যাবে।

২০০৩ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত মোট ২৪ জন কর্মকর্তা সড়কটি নির্মাণে প্রকল্প পরিচালকের দায়িত্ব পালন করেছেন। এর মধ্যে ১৭ জন ছিলেন পূর্ণকালীন দায়িত্বে ও সাতজন খণ্ডকালীন। তার পরও সাড়ে চার কিলোমিটারের বদলে ৮০০ মিটার বানিয়েই শেষ করা হয়েছে। এটুকুতেই সময় লেগেছে ১৩ বছর।

সুন্দরবনের সঙ্গে দেশের অন্যান্য অংশে যোগাযোগের স্বল্পতম পথ বাগেরহাটের কচুয়া উপজেলার সাইনবোর্ড বাজার থেকে শরণখোলা উপজেলার বগী (সুন্দরবন) পর্যন্ত। সড়কটির দৈর্ঘ্য ৫৬ কিলোমিটার, যার মধ্যে প্রায় নয় কিলোমিটার ছিল কাঁচা। এ অঞ্চলের যাতায়াত সহজ করতে ২০১০ সালে সড়কটি আঞ্চলিক মানে উন্নীত করার উদ্যোগ নেয় সওজ। কোথাও ১২ ফুট প্রশস্ত আবার কোথাও ১৮ ফুট প্রশস্ত করে প্রায় ৯০ কোটি টাকা ব্যয়ে ২০১৬ সালের জুলাইয়ে বিভিন্ন অঙ্গ বাদ রেখেই শেষ করা হয় প্রকল্পের কাজ। যদিও প্রকল্পের কাজ শেষ হওয়ার কথা ছিল ২০১২ সালের ডিসেম্বরে। মূল উদ্দেশ্য ছিল সড়কটি আঞ্চলিক মানে রূপান্তর। কিন্তু সড়কটির একটা বড় অংশে প্রস্থ ১২ ফুটে রেখে দেয়ায় সেগুলো দিয়ে এক সঙ্গে দুটি বাস চলাচল করতে পারছে না। যানবাহন চলছে সড়কের শোল্ডার দিয়ে। প্রস্থ কম হওয়ায় বড় অংকের অর্থ ব্যয় করেও আঞ্চলিক মানের হয়নি সড়কটি।

জানতে চাইলে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের অতিরিক্ত সচিব (উন্নয়ন) মোহাম্মদ বেলায়েত হোসেন বলেন, সড়ক নির্মাণ যে উদ্দেশ্যে করা হয়, সেটি অর্জিত না হলে আমাদের জন্য তা অপূরণীয় ক্ষতির কারণ। যদি কোথাও এ ধরনের ঘটনা ঘটে থাকে, তাহলে আমরা তদন্ত করে অবশ্যই প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেব। পাবনার নগরবাড়ীর সড়কটি একেবারে নতুন বানানো হয়েছে। শিগগিরই সড়কটির সঙ্গে ফেরিঘাট স্থানান্তরের উদ্যোগ নেয়া হবে। সূত্র : বণিক বার্তা

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বাধিক পঠিত