প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

প্রার্থিতা নিয়ে অনিশ্চয়তা দণ্ডিত ২০ জনের

অনলাইন ডেস্ক : বিচারিক আদালতে দণ্ডপ্রাপ্ত আওয়ামী লীগ, বিএনপি ও অন্যান্য দলের ২০ জন আসন্ন জাতীয় নির্বাচনে অংশ নিতে মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করেছেন। তবে দেশের সর্বোচ্চ আদালতের রায় অনুযায়ী তাদের নির্বাচনে অংশগ্রহণ অনিশ্চিত। আজ রোববার সম্ভাব্য প্রার্থীদের মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাই সম্পন্ন করা হবে। এ প্রক্রিয়ায় তাদের প্রার্থিতা বাতিল হতে পারে। এ নিয়ে তাদের মধ্যে রয়েছে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা। যাচাই-বাছাইয়ে দণ্ডপ্রাপ্তদের প্রার্থিতা বাতিল হলে তারা অবশ্য নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্তের আইনগত বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে উচ্চ আদালতে যেতে পারবেন।

সংবিধানের ৬৬ (২)(ঘ) ধারা অনুযায়ী, যারা ফৌজদারি মামলায় দণ্ডপ্রাপ্ত আসামি তারা নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন না। এ কারণে ওই ২০ জনের প্রার্থিতা নিয়ে শঙ্কার সৃষ্টি হয়েছে। গত ২৭ নভেম্বর হাইকোর্ট এক পর্যবেক্ষণে বলেন, নৈতিক স্খলনের কারণে দুই বছরের বেশি সাজাপ্রাপ্ত কেউ নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন না। আপিল  বিভাগে বিচারাধীন থাকলেও কেউ নির্বাচন করতে পারবেন না। তবে সাজা স্থগিত হলে নির্বাচনে অংশ নেওয়া যাবে। পরে এ আদেশটি আপিল বিভাগও বহাল রাখেন। নির্বাচন কমিশনের (ইসি) ঘোষণা অনুযায়ী আগামী ৩০ ডিসেম্বর একাদশ জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে।

দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) চেয়ারম্যান ইকবাল মাহমুদ বলেন, আসন্ন নির্বাচনের মধ্য দিয়ে যারা জনপ্রতিনিধি নির্বাচিত হবেন তারা যেন সৎ, নিষ্ঠাবান হন- এটাই দেশের মানুষের প্রত্যাশা। দুর্নীতিবাজদের ভোট না দেওয়ার জন্য তিনি জনগণের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। জনগণ যোগ্য, সৎ প্রার্থীদের ভোট দেবে- এটাই কমিশনেরও প্রত্যাশা।

দুদক সূত্র জানায়, অবৈধ সম্পদ অর্জন, মানি লন্ডারিং, জালিয়াতি, প্রতারণার অভিযোগে দুদকের দায়ের করা মামলায় বিচারিক আদালতে দণ্ডিত হয়েছেন ওই ২০ জন। দণ্ডপ্রাপ্ত হওয়ার পর তারা সাজা খাটেননি। আইন অনুযায়ী সাজা খাটার পাঁচ বছর অতিক্রান্ত হওয়ার পর তারা নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন। এ কারণেই ওই ২০ জনের মনোনয়ন বাতিল হতে যাচ্ছে।

একইসঙ্গে দুর্নীতির অভিযোগে অভিযুক্ত অর্ধ শতাধিক ব্যক্তি নির্বাচনে অংশ নিতে যাচ্ছেন। দুদক তাদের মধ্যে কারও কারও বিরুদ্ধে অভিযোগ অনুসন্ধান করছে, কারও কারও বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। আবার কারও বিরুদ্ধে আদালতে চার্জশিটও পেশ করা হয়েছে। তবে বিচারাধীন এসব মামলার রায় হয়নি।

বিএনপির দণ্ডপ্রাপ্তরা : সাজাপ্রাপ্ত বিএনপির মনোনয়ন নেওয়া সম্ভাব্য ১৫ প্রার্থীর মধ্যে কারাবন্দি সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া বগুড়া-৬, ৭ ও ফেনী-১ থেকে মনোনয়নপত্র নিয়েছেন। সর্বোচ্চ আদালতের নির্দেশে দণ্ডপ্রাপ্ত হওয়ায় নির্বাচনে অংশগ্রহণের পথ আটকে গেছে।

বিএনপির দণ্ডপ্রাপ্ত অন্য আসামিরা হলেন- রাজশাহী-১-এর প্রার্থী সাবেক মন্ত্রী ব্যারিস্টার আমিনুল হক, চট্টগ্রামের সাবেক প্রতিমন্ত্রী মীর মোহাম্মদ নাছির উদ্দিন, ঢাকা-২ -এর প্রার্থী সাবেক প্রতিমন্ত্রী আমান উল্লাহ আমান, সিরাজগঞ্জ-২-এর প্রার্থী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু এবং রুহুল কুদ্দুস তালুকদার নাটোর-২ আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতার জন্য দলের মনোনয়নপত্র নিয়েছেন।

এ ছাড়া নারায়ণগঞ্জ-১-এর প্রার্থী অ্যাডভোকেট তৈমূর আলম খন্দকার, ময়মনসিংহ-৪-এর ডা. এজেডএম জাহিদ হোসেন, সিরাজগঞ্জ-২-এর প্রার্থী রোমানা মাহমুদ, সাবেক প্রতিমন্ত্রী মীর মোহাম্মদ নাছির উদ্দিনের ছেলে ব্যারিস্টার মীর হেলাল উদ্দিন, খাগড়াছড়ি জেলা বিএনপির সভাপতি ও সাবেক সাংসদ ওয়াদুদ ভূঁইয়া, ঝিনাইদহ-২ এর সাবেক সাংসদ ও ঝিনাইদহ বিএনপির সভাপতি মো. মশিউর রহমান, ঝিনাইদহ-১ আসনের সাবেক সাংসদ ও বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মো. আব্দুল ওহাব এবং রাশেদুজ্জামান মিল্লাত মনোনয়নপত্র গ্রহণ করেছেন।

এ ছাড়া অভিযুক্ত যারা : নোয়াখালী-৪ আসনে বিএনপির মনোনয়ন পেয়েছেন সাবেক এমপি মো. শাহজাহান। শুল্ক্কমুক্ত সুবিধায় গাড়ি আমদানি করে পরে সেটা বিক্রি করে শুল্ক্ক বাবদ সরকারের ২ কোটি টাকা ক্ষতির অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। লক্ষ্মীপুর-৩ থেকে বিএনপির মনোনয়ন পেয়েছেন সাবেক এমপি শহীদ উদ্দীন চৌধুরী এ্যানী। তার বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগে মামলার পর ২০১৬ সালের ১৮ জুন চার্জশিটও পেশ করা হয়েছে। ১ কোটি ২২ লাখ ৪২ হাজার ৬৭০ টাকার স্থাবর-অস্থাবর অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। বিএনপির কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক, সাবেক এমপি আসাদুল হাবিব দুলু লালমনিরহাট-৩ আসনে মনোনয়ন পেয়েছেন। তার বিরুদ্ধে লালমনিরহাট ও রংপুর অঞ্চলে টেন্ডারবাজি ও ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে চাঁদা আদায় করে কোটি কোটি টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ রয়েছে। ভোলা-২ থেকে বিএনপির মনোনয়ন পেয়েছেন হাফিজ ইব্রাহিম। তার বিরুদ্ধে অবৈধ সম্পদ অর্জন ও অর্থ পাচার মামলা হয়েছে। মামলার চার্জশিটও আদালতে পেশ করা হয়েছে।

দুর্নীতির অভিযোগে অভিযুক্ত প্রভাবশালী আরও সাত নেতা বিএনপির মনোনয়ন পেয়েছেন। তারা হলেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, মির্জা আব্বাস, আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, নজরুল ইসলাম খান, সহসভাপতি আবদুল আউয়াল মিন্টু, এম মোরশেদ খান ও যুগ্ম মহাসচিব হাবিব-উন-নবী খান সোহেল। তাদের বিরুদ্ধে দেশি-বিদেশি ব্যাংকে সন্দেহজনক লেনদেন ও অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ রয়েছে। এ ছাড়াও এই দলের মনোনয়ন পাওয়া অভিযুক্ত আরও কিছু সংখ্যক প্রার্থী রয়েছেন।

আওয়ামী লীগের দণ্ডপ্রাপ্তরা : আওয়ামী লীগের সম্ভাব্য প্রার্থীদের মধ্যে দণ্ডপ্রাপ্ত পংকজ দেবনাথ বরিশাল-৪, মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া চাঁদপুর-২ ও হাজী সেলিম ঢাকা-৭ আসনে মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করেছেন।

এ ছাড়াও অভিযুক্ত যারা : খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, দুদকে অভিযুক্ত নরসিংদী-২ আসনের বর্তমান এমপি কামরুল আশরাফ খান পোটন আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পেয়েছেন। তার বিরুদ্ধে সরকারের আমদানি করা সার গুদামে না পৌঁছিয়ে খোলা বাজারে বিক্রি করে শত শত কোটি টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয়ভাবে শিক্ষা, ভূমি অফিস, পরিবহনসহ বিভিন্ন খাতে চাঁদাবাজির মাধ্যমে তিনি অবৈধ সম্পদের মালিক হওয়ার অভিযোগে অভিযুক্ত নারায়ণগঞ্জ-২ আসনের আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পেয়েছেন বর্তমান এমপি নজরুল ইসলাম বাবু।

সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী অ্যাডভোকেট শামসুল হক টুকু পাবনা-২ আসনে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পেয়েছেন। তিনি ২০০৯ সালের নির্বাচনের হলফনামার তুলনায় ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের হলফনামায় ২০ গুণ বেশি সম্পদ উল্লেখ করেছেন। তার বিরুদ্ধে নামে বেনামে প্রায় দেড়শ’ কোটি টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ রয়েছে।

কক্সবাজার-৪ আসনের কথিত ইয়াবা সম্রাট ক্ষমতাসীন দলের বর্তমান এমপি আবদুর রহমান বদির দুর্নীতির অভিযোগে মামলা হয়েছে। চার্জশিটও দেওয়া হয়েছে। বদির দুর্নীতির দায় ঢাকতে তার স্ত্রী শাহীন আক্তার চৌধুরীকে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে আওয়ামী লীগ থেকে।

ফারমার্স ব্যাংকের পদত্যাগ করা চেয়ারম্যান মহীউদ্দীন খান আলমগীরকে আওয়ামী লীগ থেকে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে চাঁদপুর-১ আসন থেকে। তার বিরুদ্ধে ব্যাংকে ঋণ জালিয়াতি, ঋণের কমিশন নেওয়া, গ্রাহকের হিসাব থেকে নিজের হিসাবে অর্থ স্থানান্তর ও অনিয়ম, দুর্নীতির মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ অনুসন্ধানাধীন রয়েছে।

জনগণের আস্থাহীন বিগত দুর্নীতি দমন কমিশনের সময়ে দুর্নীতির অভিযোগ থেকে অব্যাহতি দেওয়া তিনজনকে আওয়ামী লীগ থেকে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে। তাদের অব্যাহতির বিষয় নিয়ে তখন কমিশনে বিতর্কও হয়েছে। তাদের মধ্যে সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী অধ্যাপক ডা. আ ফ ম রুহুল হককে সাতক্ষীরা-৩, এনা গ্রুপের কর্ণধার প্রকৌশলী এনামুল হককে রাজশাহী-৪ ও এমপি আসলামুল হককে ঢাকা-১৪ আসনে মনোনয়ন দেওয়া হয়। এই দলের মনোনয়ন পাওয়া আরও কিছু সংখ্যক অভিযুক্ত প্রার্থী রয়েছেন।

জাতীয় পার্টি : জাতীয় পার্টির মহাসচিব এ বি এম রুহুল আমিন হাওলাদার মনোনয়ন নিয়েছেন পটুয়াখালী-১ আসন থেকে। তার বিরুদ্ধে জমি দখল ও অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ রয়েছে। এমপি সালাহ উদ্দিন আহম্মেদ মুক্তিকে ময়মনসিংহ-৫ (মুক্তাগাছা) আসনে জাতীয় পার্টি থেকে মনোনয়ন দেওয়া হতে পারে। জোটের হিসাব-নিকাশে আপাতত তার মনোনয়ন ঝুলে আছে। তার বিরুদ্ধে ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের হলফনামায় ৫৪ লাখ ৫৬ হাজার ৮৭৬ টাকার সম্পদ কম দেখানোর অভিযোগ অনুসন্ধান করা হচ্ছে।

অন্য দণ্ডপ্রাপ্তরা : তৃণমূল বিএনপি ও বিএনএ চেয়ারম্যান ব্যারিস্টার নাজমুল হুদা ঢাকা-১৭, এলডিপি চেয়ারম্যান কর্নেল (অব.) অলি আহমদ চট্টগ্রাম-১৪ এবং জামায়াতের শাহজাহান চৌধুরী স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে চট্টগ্রাম-১০ আসনে মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করেছেন।

খালাস : বিচারিক আদালতে দণ্ডপ্রাপ্ত হয়ে উচ্চ আদালতে খালাস পাওয়া আওয়ামী লীগের সম্ভাব্য প্রার্থীদের মধ্যে ড. মহীউদ্দীন খান আলমগীর চাঁদপুর-১, আবুল হাসানাত আবদুল্লাহ বরিশাল-১, কাজী জাফর উল্লাহ ফরিদপুর-৪, শেখ হেলাল উদ্দীন বাগেরহাট-১, লোটাস কামাল কুমিল্লা-১০ এবং শামীম ওসমান নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতার জন্য মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করেছেন।

যাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগে মামলা হয়েছে, আদালতে চার্জশিট দেওয়া হয়েছে ও অভিযোগ অনুসন্ধানাধীন রয়েছে এমন অর্ধশতাধিক ব্যক্তিও ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জাতীয় পার্টিসহ অন্যান্য রাজনৈতিক দলের মনোনয়নপত্র নিয়েছেন। দুর্নীতির অভিযোগের কালিমা গায়ে মেখে তারা প্রার্থী হতে যাচ্ছেন।

যারা মনোনয়ন পাননি : দুদকে অভিযুক্ত যেসব বর্তমান ও সাবেক এমপি মনোনয়ন পাননি তারা হলেন- খুলনা-২ আসনের আওয়ামী লীগের এমপি মিজানুর রহমান, সাতক্ষীরা-২ আসনের জাতীয় পার্টির সাবেক এমপি এম এ জব্বার, গাইবান্ধা-১ আসনের সাবেক এমপি ডা. কর্নেল (অব.) আবদুল কাদের খান। খুনের মামলায় তিনি বর্তমানে জেলে আছেন।

পটুয়াখালী-৪ আসনে আওয়ামী লীগের সাবেক এমপি ও সাবেক পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী মাহবুবুর রহমান, সাবেক গৃহায়ন ও গণপূর্ত প্রতিমন্ত্রী অ্যাডভোকেট আবদুল মান্নান খান, কক্সবাজার-৪ আসনের বিতর্কিত এমপি আবদুর রহমান বদি প্রমুখ। সূত্র : সমকাল