Skip to main content

বরিশালে দুই জোটের প্রার্থী নিয়ে তৃণমূলে রশিটানাটানি

খোকন আহম্মেদ হীরা, বরিশাল : একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বরিশালের দুইটি আসনে মহাজোট ও বিএনপির প্রার্থীতা নিয়ে চরম বিভ্রান্তির সৃষ্টি হয়েছে। বরিশাল-২ (বানারীপাড়া-উজিরপুর) এবং বরিশাল-৩ (বাবুগঞ্জ-মুলাদী) আসন দুটির প্রত্যেকটিতে বিএনপির একাধিক এবং আওয়ামী লীগ, জাতীয় পার্টি ও ওয়ার্কার্স পার্টি, জাসদের প্রার্থীরা মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন। ফলে মহাজোট এবং বিএনপির চূড়ান্ত প্রার্থীতা নিয়ে ওই দুই আসনের ভোটাররা বিভ্রান্তির মধ্যে পরেছেন। সূত্রমতে, দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বরিশাল-২ আসনে দলীয় মনোনয়ন পেয়ে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এ্যাডভোকেট তালুকদার মোঃ ইউনুস। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রথমে পরিচ্ছন্ন রাজনীতিবিদ তালুকদার মোঃ ইউনুসকে আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে মনোনয়ন দেয়া হয়। পরে তা পরিবর্তন করে দেয়া হয়েছে ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি মোঃ শাহে আলম তালুকদারকে। অন্যদিকে এ আসনে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন জাতীয় পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য বাংলা চলচ্চিত্রের এক সময়কার জনপ্রিয় নায়ক মাসুদ পারভেজ সোহেল রানাকে। জাতীয় পার্টির দায়িত্বশীল সূত্রে জানা গেছে, বরিশাল-২ আসনটি জাতীয় পার্টিকে ছেড়ে দেবে আওয়ামী লীগ। এ আসনে মহাজোটের অংশীদার জাসদ ও ওয়ার্কার্স পার্টির প্রার্থীসহ মনোনয়ন বঞ্চিত হয়ে পদপদবীবিহীন আওয়ামী লীগের দুই নেতা স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন। এ ব্যাপারে আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থী শাহে আলম তালুকদার বলেন, বরিশাল-২ আসনের ভোটাররা নৌকার প্রার্থী চায়। তাই দলের সভাপতি তাকে মনোনয়ন দিয়েছেন। এখানে জাতীয় পার্টির প্রার্থী কেন মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছে সে সম্পর্কে তিনি কিছুই জানেন না। অপরদিকে মাসুদ পারভেজ সোহেল রানা বলেন, মহাজোটের নীতিনির্ধারণী মহল থেকে সবুজ সংকেত পেয়ে তিনি বরিশাল-২ আসনে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন। নবম ও দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বরিশাল-৩ (বাবুগঞ্জ-মুলাদী) আসন মহাজোটের শরিকদের ছেড়ে দেয় আওয়ামী লীগ। নবম সংসদ নির্বাচনে এ আসনে মহাজোটের প্রার্থী ছিলেন জাতীয় পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির ভাইস চেয়ারম্যান গোলাম কিবরিয়া টিপু। দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তাকেই মহাজোটের প্রার্থী করা হলেও দলীয় প্রতীকে নির্বাচিত হন ওয়ার্কার্স পাটির শেখ মোঃ টিপু সুলতান কিন্তু আসন্ন নির্বাচনে এ আসনটি জাতীয় পার্টিকে আর ছাড়তে চায়না ওয়ার্কার্স পার্টি। আবার জাতীয় পার্টিও এবার অন্য কোন দলকে বরিশাল-৩ আসনটি ছেড়ে দিতে নারাজ। ফলে দুইজনেই মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন। এখানেও মহাজোটের প্রার্থীতা চূড়ান্ত করতে বরিশাল-২ আসনের মতো বড় জটিলতা দেখা দিয়েছে। অন্যদিকে বরিশাল-২ আসনে বিএনপির মনোনীত দুই প্রার্থী সাবেক হুইপ সৈয়দ শহিদুল হক জামাল এবং কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য এস সরফুদ্দিন আহম্মেদ সান্টু দুজনেই মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন। এ দু’জনের মধ্যে প্রার্থী হওয়ার ক্ষেত্রে ছাড় দেয়ার মানসিকতা নেই সরফুদ্দিন আহম্মেদ সান্টুর। তিনি দলীয় প্রাথমিক মনোনয়ন পাওয়ার পর ঘোষণা দিয়েছেন চূড়ান্তভাবে তাকে প্রার্থী করা না হলে তিনি দল থেকে পদত্যাগ করবেন। তবে সৈয়দ শহিদুল হক জামাল বলেছেন, দল আমাকে মনোনয়ন দিয়েছে। শেষপর্যন্ত দলীয় সিদ্ধান্ত যাই হোক আমি তা মেনে নেব। বরিশাল-৩ আসনেও বিএনপির প্রার্থী হিসেবে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন দুই হেভিওয়েট প্রার্থী দলের ভাইস চেয়ারম্যান বেগম সেলিমা রহমান ও চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা সুপ্রিম কোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি এ্যাডভোকেট জয়নুল আবেদীন। প্রার্থীতা প্রশ্নে এ্যাডভোকেট জয়নুল বলেন, এবার বরিশাল-৩ আসনে দলীয় প্রার্থী আমাকেই করা হবে। কারণ আমি প্রার্থী তালিকার এক নম্বরে আছি। অন্যদিকে বেগম সেলিমা রহমান বলেন, তিনি ২০০৮ সালের নির্বাচনে দলীয় মনোনয়ন পেয়ে এই আসনে প্রার্থী হয়েছিলেন। তখন জয়নুল আবেদীন বিদ্রোহী প্রার্থী হওয়ায় ধানের শীষ পরাজিত হয়। তাই দলের শৃঙ্খলাভঙ্গকারীকে আর মনোনয়ন দেয়া হবেনা। ওয়ার্কার্স পার্টির কেন্দ্রীয় সভাপতি ও সমাজকল্যাণমন্ত্রী রাশেদ খান মেনন এমপি জানান, বরিশাল-৩ আসন মহাজোটের শরিক ওয়ার্কার্স পার্টিকে দেয়া হবে, এমন নিশ্চয়তা পাওয়ার পরই দলের প্রার্থী শেখ মোঃ টিপু সুলতান মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন। জাতীয় পার্টির গোলাম কিবরিয়া টিপু কেন মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন তা তিনিই ভালো জানেন। গোলাম কিবরিয়া টিপু বলেন, পার্টির চেয়ারম্যান হুসাইন মোহাম্মদ এরশাদের নির্দেশে তিনি মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন। একইভাবে বরিশাল-১ (গৌরনদী-আগৈলঝাড়া) আসনে বিএনপির মনোনয়ন দেয়া হয়েছে নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দলের মনোনীত প্রার্থী ইঞ্জিনিয়ার আব্দুস সোবহান এবং ওয়ান ইলেভেনের সময় দলের বিরুদ্ধে ঘুরে দাঁড়ানো প্রভাবশালী সংস্কারপন্থি নেতা সাবেক এমপি জহির উদ্দিন স্বপনকে। তারা দুইজনেই মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন। এরমধ্যে ইঞ্জিনিয়ার আব্দুস সোবাহান দলীয় নেতাকর্মী ও সমর্থকদের নিয়ে নির্বাচনী এলাকার গৌরনদী ও আগৈলঝাড়া উপজেলায় তার মনোনয়নপত্র জমা দিলেও অপর মনোনীত প্রার্থী জহির উদ্দিন স্বপন দীর্ঘদিন থেকে নিজ এলাকায় ঢুকতে না পেরে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে তার মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন। আগৈলঝাড়া উপজেলা বিএনপির সভাপতি আব্দুল লতিফ মোল্লা বলেন, যে দলের মনোনয়ন পাওয়ার পরেও নিজ নির্বাচনী এলাকায় এসে মনোনয়নপত্র দাখিল করতে ভয়পায়, যে তৃণমূল পর্যায়ের নেতাকর্মী থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন রয়েছেন তাকে দিয়ে আর যাই হোক দলের ক্লান্তি লগ্নের নির্বাচনী বৈতরনী পার করা সম্ভব নয়। গৌরনদী উপজেলা বিএনপির সহসভাপতি আনোয়ার সাদাত তোতা বলেন, ২০০১ সালে এমপি নির্বাচিত হয়েই দলের দুর্দীনের একাধিক নেতাদের বিরুদ্ধে মামলা দিয়ে এলাকাছাড়া করে একসময়ের বাম নেতা জহির উদ্দিন স্বপন ব্যাপক দুর্নীতি ও লুটপাটের মাধ্যমে বিশাল বিত্ত বৈভবের মালিক হয়েছেন। পরবর্তীতে ওয়ান ইলেভেনের সময় নিজের সকল অপকর্ম আড়াল করতে তিনি (স্বপন) জিয়া পরিবারের বিরুদ্ধে মিথ্যাচারের মাধ্যমে প্রভাবশালী সংস্কারপন্থি নেতা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছেন। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে বিএনপির তৃণমূল পর্যায়ের নেতাকর্মী ও সমর্থকদের কাছ থেকে স্বপন জনবিচ্ছিন্ন হয়ে পরায় একাধিকবার তাকে (স্বপন) নিজ এলাকায় প্রতিহত করা হয়েছে। গৌরনদী উপজেলা যুবদলের সভাপতি সফিকুর রহমান শরীফ স্বপন বলেন, দীর্ঘদিন পর দলের ক্লান্তি লগ্নে জহির উদ্দিন স্বপন দলের সিনিয়র নেতাদের কাছে ক্ষমা চেয়ে একাদশ জাতীয় নির্বাচনে দলীয় মনোনয়ন চাওয়ার পর দুইজন প্রার্থীর মধ্যে স্বপনকে ডামি প্রার্থী হিসেবে মনোনীত করা হয়। এ খবর তৃণমূলে ছড়িয়ে পরলে নেতাকর্মীরা দীর্ঘদিন থেকে এলাকায় ঢুকতে না পারা জহির উদ্দিন স্বপনকে নিজ এলাকায় প্রতিহত করার ঘোষণা দিয়েছে। ফলে নিজ নির্বাচনী এলাকায় তিনি (স্বপন) মনোনয়নপত্র জমা দিতে আসতে পারেননি। এ আসনে আওয়ামী লীগের একক প্রার্থী হচ্ছেন জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও বর্তমান সংসদ সদস্য আবুল হাসানাত আব্দুল্লাহ।

অন্যান্য সংবাদ